বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আওতাধীন স্থাবর সম্পত্তির ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে ‘বেবিচকের আওতাধীন স্থাবর সম্পত্তি ইজারা বিধিমালা, ২০২৬’ শীর্ষক একটি খসড়া বিধিমালা প্রণয়ন করে মতামতের জন্য বেবিচকের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে এমন জটিল ও সংবেদনশীল একটি বিধিমালার বিষয়ে মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে মতামত চাওয়াকে অবাস্তব ও তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করে মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তিপত্র পাঠিয়েছে বেবিচক। এছাড়া জনসাধারণের মতামত চেয়েও মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে খসড়া বিধিমালা প্রকাশ করা হয়েছে।
গত ২১ জানুয়ারি বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকের স্বাক্ষর করা চিঠিতে মন্ত্রণালয়ের সচিবকে জানানো হয়—প্রস্তাবিত বিধিমালাটি সম্পূর্ণ নতুন ও বিস্তৃত, যা বিমানবন্দর পরিচালনা, এয়ারসাইড ও ল্যান্ডসাইড কার্যক্রম, যাত্রীসেবা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রচলিত প্রশাসনিক অনুশীলন অনুযায়ী, এ ধরনের বিধিমালা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট কারিগরি শাখা, ইউনিট ও অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রয়োজন, যা তিন কার্যদিবসের মধ্যে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
চিঠিতে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) সঙ্গে বাংলাদেশের দায়বদ্ধতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। শিকাগো কনভেনশন, ১৯৪৪-এর পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আইকাও নির্ধারিত নিরাপত্তা ও নিরাপত্তা-তদারকি কাঠামো অনুসরণে বাধ্য। আইকাওর ইউনিভার্সাল সেফটি ওভারসাইট অডিট প্রোগ্রাম এবং ইউনিভার্সাল সিকিউরিটি অডিট প্রোগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সামগ্রিক বিমান চলাচল নিরাপত্তাব্যবস্থা মূল্যায়ন করা হয়।
বেবিচকের মতে, বিমানবন্দর পরিচালনা কিংবা সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কোনো বিধিমালা যদি আইকাওর আন্তর্জাতিক মান ও সংশ্লিষ্ট এনেক্সের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক অডিটে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। প্রস্তাবিত ইজারা বিধিমালার কয়েকটি ধারা সে ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও বেবিচকের চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
আইনগত দিক থেকেও খসড়া বিধিমালাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে বেবিচক। সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অ্যাক্ট, ২০১৭ অনুযায়ী বিমানবন্দর ও বিমানঘাঁটির সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব বেবিচকের ওপর ন্যস্ত। অথচ প্রস্তাবিত বিধিমালায় সেই এখতিয়ারে সরাসরি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত রয়েছে, যা একদিকে বেবিচক আইন, ২০১৭ এবং অপরদিকে সংশোধিত বেসামরিক বিমান চলাচল অধ্যাদেশ ২০২৬-এর মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে। এতে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং অপারেশনাল কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে বেবিচক তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ সালের আগে উন্মুক্ত দরপত্রভিত্তিক ইজারা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং অপারেশনালভাবে অকার্যকর। ওই সময় একাধিক প্রশাসনিক সংকট ও অডিট আপত্তির মুখে পড়তে হয়েছিল। পরবর্তীকালে যাত্রীসেবা সহজকরণ ও বিমানবন্দর পরিচালনা গতিশীল করতে ইজারা নীতিমালার সংস্কার করা হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালার কিছু ধারা সেই পুরোনো জটিল ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে, যা আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব বিমান চলাচল ব্যবস্থার পরিপন্থি বলে মত দিয়েছে বেবিচক।
খসড়া বিধিমালায় ইজারা প্রদান ও মনিটরিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি। চিঠিতে বলা হয়েছে— এয়ারসাইড ও ল্যান্ডসাইড কার্যক্রম সরাসরি আইকাওর নিরাপত্তা মান ও অপারেশনাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। পর্যাপ্ত কারিগরি ও অপারেশনাল জ্ঞান ছাড়া গঠিত কোনো কমিটি কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না, যার প্রভাব পড়তে পারে যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মান রক্ষার ওপর। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় এয়ারসাইড এলাকায় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা প্রদান অনুচিত বলেও মত দিয়েছে বেবিচক। এতে সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দেওয়ার প্রবণতা বাড়বে, যার শেষ পর্যন্ত আর্থিক চাপ বহন করতে হবে যাত্রীদের এবং তা আইকাও এনেক্স-৯-এর মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
চিঠিতে বেবিচক আরো জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় সময় প্রদান করা হলে তারা সংশ্লিষ্ট সব শাখা, ইউনিট ও অংশীজনের মতামত নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ, সুসঙ্গত ও তথ্যভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক মতামত মন্ত্রণালয়ে দিতে সক্ষম হবে। অন্যথায়, তাড়াহুড়ো করে বিধিমালা প্রণয়ন করা হলে তার নেতিবাচক প্রভাব আন্তর্জাতিক অডিট ও মূল্যায়নে প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে জনসাধারণের মতামত চেয়ে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খসড়া বিধিমালার সময়সীমা নিয়েও আপত্তি উঠেছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাজিন আহমেদ ২২ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে দেওয়া এক চিঠিতে জনমত আহ্বানের সময়সীমা ন্যূনতম তিন সপ্তাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন।
তিনি জানান, এ বিষয়ে পাঁচ শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে, যা খসড়া বিধিমালার গুরুত্ব এবং নাগরিক ও অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রত্যাশা স্পষ্ট করে।
চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, সংবিধানের রুলস অব বিজনেসের অনুচ্ছেদ ৩১ এবং সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪-এর অনুচ্ছেদ ২৪০ অনুযায়ী জনমত আহ্বান কোনো আনুষ্ঠানিক বা দায়সারা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়—বরং এটি একটি বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়াগত শর্ত। অত্যন্ত স্বল্প সময়সীমা, পৃথক ও সুস্পষ্ট নোটিশের অভাব এবং মতামত দাখিলের স্পষ্ট প্রক্রিয়া না থাকলে জনমত গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি সতর্ক করেছ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


৭ লাখ ৬৬ হাজার প্রবাসীর কাছে পৌঁছাল পোস্টাল ব্যালট