আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভাষা ও ভাবের লেনা-দেনা

জগলুল আসাদ

ভাষা ও ভাবের লেনা-দেনা

​ভাষার কোনো পবিত্রতা-অপবিত্রতা নেই। বাংলা ভাষায় মিশ্রণ আছে বহু ভাষার শব্দের। বাংলার ঋণ আছে ইংরেজি ও সংস্কৃত ছাড়াও নানা ভাষার কাছে। আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ রচনায় সাহায্য পাওয়া গেছে ভিন ভাষার ব্যাকরণ থেকেও; বিশেষত ইংরেজি ভাষার কিছু ছাঁচ বাংলা ভাষায় প্রায় স্থায়ী রূপ পেয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসন ও পরবর্তীকালে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ সূত্রে বাংলার সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছে যেমন ইংরেজির, তেমনি ধর্মীয় সূত্রে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে আরবির। আকাশ সংস্কৃতির অবাধ বিস্তারে সংযুক্ত হচ্ছে হিন্দি। জীবিকার প্রয়োজনে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে ও হবে কোরিয়ান, সিঙ্গাপুরি, চাইনিজ, জাপানি ইত্যাদি নানা ভাষার সঙ্গে। ভাষা শিক্ষার সামর্থ্য মানুষের জৈবিক বাস্তবতা, চমস্কি যেটাকে ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকুইজিশন ডিভাইস’ (LAD) বলেন। আর মনোপরিস্থিতিও সহায়ক হয় বা বিঘ্ন হয় ভাষা অর্জনে। জীবিকা বা জ্ঞানগত প্রয়োজনে কারও মনে তীব্রভাবে কোনো বিশেষ ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধ হলে সে কাঙ্ক্ষিত ভাষাটি বেশ সহজেই শিখে ফেলতে পারে বলে মনোভাষাবিজ্ঞানী স্টিফেন ক্রাশেন জানিয়েছেন তাঁর ‘মনিটর মডেল’-এর ‘এফেক্টিভ ফিল্টার হাইপোথিসিস’-এ। ‘ভাষা সাম্রাজ্যবাদ’ বলেও একটা কথা প্রচলিত আছে। রবার্ট ফিলিপসন নব্বই দশকে এ নামে একটি বই বের করেন। পোস্টকলোনিয়াল শাস্ত্রে অবশ্য ‘ডিসেন্টার’ ও ‘ডিফ্যামিলিয়ারাইজ’ বলে দুটো শব্দ আছে, যেটি দ্বারা কোনো ভাষাকে নিজ গোত্রের ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে ফেলা বা অপরিচিত করে ফেলা, অথবা শাসকের ভাষাকেই শোষিত তার নিজের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বাস্তবতার কথা বলা হয়।

​যাহোক, আমরা এক বহুভাষিক পরিস্থিতিতে অবস্থান করছি। তাই আমাদের জবানে প্রতিনিয়ত ‘কোড মিক্সিং’ হয়। ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’—এক পরিচিত উদাহরণ। সমাজভাষাবিজ্ঞান সমাজের ভেতরের ভাষিক পরিবর্তন ও পরিস্থিতি এবং ভাষার বহুবিচিত্র ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করে। আমরা যাকে বাংলা ভাষা বলে চিনি তারও রয়েছে আঞ্চলিক নানা রূপ, প্রমিতঘেঁষা আঞ্চলিক চেহারাও আছে! সবই বাংলা ভাষার বৃহত্তর ক্যাটেগরির (ফার্দিনান্দ দ্য সোস্যুরের ভাষায় ‘লাং’) অন্তর্ভুক্ত। একটা ভাষার বৈচিত্র্য সেই ভাষার শক্তি। নানা অঞ্চলের কথ্যভাষার উপযুক্ত ব্যবহার ভাষাকে আরো বেশি প্রকাশক্ষম করে তোলে। সামাজিক মাধ্যমের আবির্ভাবে আমাদের ভাষার বর্তমান চেহারা পরিবর্তিত হচ্ছে, বাংলা ভাষা ভিন্নমাত্রা পাচ্ছে; আঞ্চলিক, লিঙ্গীয় ও পেশাগত বহুস্বর প্রতিফলিত হচ্ছে ভাষার শরীরে। এতে শুদ্ধতাবাদীরা যদিও ক্ষয় ও ক্ষতির আশঙ্কা কম দেখছেন না; কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে, একটি ভাষার স্থিতিস্থাপকতা তার সামর্থ্যের পরিচায়ক।

বিজ্ঞাপন

​লেখক তাঁর ব্যক্তিপ্রতিভা ও বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর করে সমাজের মানুষের মুখের ভাষা তুলে আনেন তাঁর লেখায়; কথক তাঁর ব্যক্তিত্বের গড়ন ভেদে সমাজ বা গোত্রের ভাষাকে ব্যবহার করেন নিজ বিশিষ্টতায়। সোস্যুর একে ‘প্যারোল’ বলেন; অর্থাৎ সমাজের ভাষার ভাণ্ডার থেকে ব্যক্তির ব্যক্তিগত ভঙ্গিতে ভাষাচয়ন ও ব্যবহারকে প্যারোল বলা হয়। মনে রাখতে হবে, সমাজ যেমন ব্যক্তিকে ভাষা দেয়, তেমনি ব্যক্তিপ্রতিভাও সমাজকে ভাবপ্রকাশে উপযুক্ত ভাষা সরবরাহ করে।

এ তথ্য অজানা নয় যে, ইংরেজি ভাষায় শেক্সপিয়ার ও মিলটন প্রায় হাজারখানেক শব্দ যোগ করেছেন। যাহোক, একুশের চাওয়া হচ্ছে, আমাদের মধ্যে যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষারুচি ও চেতনা গড়ে ওঠে। ভাষায়-ভাষায়, মানুষে-মানুষে, জাতিতে-জাতিতে লেনা-দেনের বাস্তবতা আমরা যেন না ভুলি; কেননা ভাষিক মৌলবাদের খপ্পরে পড়া আখেরে বিপজ্জনক হতে পারে।

ফেব্রুয়ারি, ভাষাপ্রেম আর রাষ্ট্রীয় নাটক

‘ফেব্রুয়ারি’ মাস আমাদের ভাষাপ্রেমের মাস! জরিমানা ও হেনস্তার মাধ্যমে সাইনবোর্ডে বাংলা ‘প্রতিষ্ঠার’ উদ্যোগ নিয়ে ‘রাষ্ট্র’ বা প্রশাসন ভাষাপ্রেমের পরিচয় দেয়! এই প্রেম কতটা ফান্ড স্ফীতিকরণের লক্ষ্যে, কতটা ক্ষমতা প্রদর্শন বা ক্ষমতাসংহতকরণের উদ্দেশ্যে নাকি তা নিরেট জনস্বার্থলগ্ন ভাষাপ্রেম, তা অবশ্য জানা যায়নি। ভাষাপ্রেম হইলে উদ্যোগ ও আয়োজনের চেহারা ভিন্ন ও ব্যাপক হইতো বলেই ধারণা করি।

ফেব্রুয়ারি এলেই নানা কিসিমের ‘অপর’ তৈরির কোশেশ চলে! কথার মধ্যে ‘বাংলা’ ছাড়া আর কিছুই ব্যবহার করা উচিত হইবো না বলে জনমনে একটা ভাব ধরাইয়া দেবার চেষ্টা চলে। ইংরেজি শব্দ ইউজ কইরাই সতর্ক করা হয় যেন বাংলা ভাষার শব্দ ছাড়া অন্য ভাষার শব্দ মুখে বা কলমে না আসে! অথচ, একাধিক ভাষার মিশ্রণ, যাকে কোড মিক্সিং বলে সমাজভাষাবিজ্ঞানে, এইটা আজকালকার দুনিয়ার অনিবার্য বাস্তবতা। কথায় বা লেখায় বাংলা, ইংরেজি, আরবি, উর্দু, প্রমিত-অপ্রমিত শব্দাবলি যে আসবেই এইটা স্বাভাবিক! এই স্বাভাবিকতা মাইনা নেয়াই ভাষাপ্রেম! শব্দের ভেতরেও দেশি-বিদেশি ভাগ কইরা একটা কৃত্রিম আত্মপ্রসাদ লাভ করি! অথচ, ‘লোন ওয়ার্ড’ বা ঋণ করা শব্দ একটা ভাষার নিজস্ব শব্দই, উহা আর ভিনদেশি শব্দ নয়—ভাষাবিজ্ঞানের এই প্রাথমিক কথাও আমরা মনে রাখি না! আবুল মনসুর আহমদের শরণ নিতে পারি ব্যাপারটা বুঝতে। যে শব্দ সকলে বুঝে ও বলে, সেটাই বাংলা শব্দ। যে ভাষায় আমরা রোজ কথা কই, যে ভাষায় ছাত্র-শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করেন, সেটাই বাংলা ভাষা। সে ভাষার কোনটা ইংরেজি, কোনটা সংস্কৃত, কোনটা আরবি, কোনটা ফারসি সেইটা জনসাধারণের বিবেচ্য নয়। একটা রিকশাচালকও বলে, ‘ইনসাফ করে ভাড়া দিয়েন।’ এ শব্দ বোঝে না এমন বাঙালি নাই। সুতরাং, এই শব্দ বাংলা না তো কী!

বঙ্গে সংস্কৃত শব্দের প্রেম ও বিদ্বেষ দুইটাই দেখা যায়! অথচ সংস্কৃত ব্যাকরণের কিছু নিয়ম ছাড়া নতুন শব্দগঠনই আমাদের জন্যে অনেক ক্ষেত্রে দুষ্কর। আবার, সংস্কৃতবাদীরা ভাষাকে আরবি-ফারসি নামক বিধর্মী ভাষা থেইকা পূতপবিত্র রাখবার ধারাতেই এখনো সগর্বে আছেন! ভাষার ক্ষেত্রে এই বাতিলবাদিতা বড্ড ছোটলোকি! আবার আঞ্চলিক ভাষা দিয়ে গদ্য রচনার অতি নিরীক্ষাপ্রবণতা, ভাষাকে এমন দুরূহতায় নিয়ে যায় যে বক্তব্যকে বুঝে উঠতে পারাই হিমালয়ে উঠার সমান! সম্ভবত প্রমিতগন্ধী অপ্রমিত বা অপ্রমিতগন্ধী প্রমিতই আমাদের নিয়তি!

বানান, বুদ্ধিজীবিতা আর মধ্যপথ

অনেকের চিন্তাশীলতার দৌড় বানানের দুয়ার পর্যন্ত! ভাষা জানা মানে যেন বানান জানা! আবার, অন্যদিকে, অনেকের বিপ্লব বানান ভাঙাতেই! চোখের অভ্যস্ততাকে চমকে দিয়ে তারা চিন্তার বিপ্লব সম্পাদন করেন! এই দুই গ্রুপের মাঝামাঝি অবস্থাই মধ্যপন্থা।

লক্ষ্য করেছি, ইসলামপন্থি লেখকগণ ও কিছু তরুণ এই মধ্যপথে থাকেন। বানান নিয়া অযথা বিপ্লবীপনা তাঁদের মধ্যে তেমন নাই। প্রকাশের সহজতা, বোধগম্যতা ও বিষয়বস্তুতেই তাঁদের নজর! খায়েশি চিন্তা ও অনুভবের সংস্কার তাঁদের লক্ষ্য! বাংলা, আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইংরেজির সুমিত মিশ্রণ তাঁদের গদ্যকে করে গতিময় ও সংবেদী!

বানানের ব্যাপারে বেশ কয়েকটা ঘরানা আছে। একটা ঘরানাকে বলা যায় প্রসঙ্গবাদী ঘরানা, যারা বিভিন্ন বিষয়কে বোঝাতে একই বানানে লেখা শব্দের পার্থক্যকরণ করতে চান প্রসঙ্গ দেখে। যেমন, বর্ণ অর্থ অক্ষর, আর বর্ণ অর্থ গায়ের রঙ; কোনটা কখন কোন অর্থে বসবে, এটা সবাই কনটেক্সট দেখেই বুঝি। এই ঘরানা মানুষের সহজাত ভাষাবোধ বা Competence এর উপর গুরুত্ব দেন।

আরেকটা ঘরানা, উচ্চারণবাদী ঘরানা। তাঁরা বেশিরভাগ বানানকেই উচ্চারণ অনুযায়ী লিখতে চান, বিশেষত ‘বিদেশি’ শব্দগুলোকে । লোন ওয়ার্ডগুলো যদি কোন দেশজরূপ না পেয়ে থাকে তবে মূলভাষার উচ্চারণ অনুযায়ীই তাঁরা বানান লিখতে চান বা বলতে চান। আবার, বিদেশি শব্দ চিরকাল ভিনদেশিও থাকে না, সেগুলোকে ‘দেশীয়’ করে নেওয়া যায়; সেক্ষেত্রে তাদেরকে আলাদা বানানবিধির অধীন করার দরকার পড়ে না । তবে, এই ঘরানা এটাও অবগত যে, সব বানানকে উচ্চারণ অনুযায়ী লেখা যায় না বা দরকার পড়ে না। লেখা গেলেও চোখের অনভ্যস্ততাহেতু তাতে বিরাগ তৈরি হয়!

নির্দেশবাদী ঘরানা, যেমন বাংলা একাডেমি। এদের ভেতরে প্রথম দুই ঘরানার কিছুটা যুগ্মতা দেখা যাবে । এরা বানানকে শৃঙ্খলায় আনতে চান ও সবাই অভিন্ন বানানে লিখুক এই ইচ্ছে পোষণ করেন৷ জাতিবোধ ও রাষ্ট্রসংহতি নির্মাণের ব্যাপারকে তারা গুরুত্ব দেন। একাডেমিক লেখালেখির বেশির ভাগই এই ঘরানার বানান ও ভাষাপদ্ধতি অনুযায়ী চলে।

ঐতিহ্যপ্রেমী ঘরানাও আছে৷ আমরা জানি, বানান ধ্বনির দৃষ্টিগ্রাহ্যরূপ; এ-ও জানি, প্রতিটি ‘শব্দ’ই সিম্বোলিক ও আর্বিট্রারি। তাই, ‘বৌ’ বানান আমাদের বধূদের ঘোমটার সদৃশতা প্রকাশ করে বলে এই বানানে অনেকের আগ্রহ; আবার, দুঃখ বানানে বিসর্গ অশ্রুর মতো পড়ন্ত থাকে বলে বিসর্গ বাদ দিতে মন চায় না। দীর্ঘদিন ধরে যে-বানানে অভ্যস্ত, যেটার মধ্যে লিখন-জটিলতাও তেমন নাই, সেটাকে পুরোনো বানানেই অনেকে রাখতে চান। এই ঘরানাকে আইডিওলোজিকাল ঘরানাও বলা যাবে। নিজের একটা বিশেষ ব্যাখ্যা হাজির করে তারা কোনো কোনো বানান লিখতে ইচ্ছুক৷ যেমন, ‘হুঁশ’ শব্দটার ইশারা বোঝাতে কেউ লিখতে পারে ‘মানুশ’, আবার, কেউ উষ বা উষা শব্দটার ব্যঞ্জনা টিকিয়ে রাখতে ‘মানুষ’ লিখতে পারে। আর, কেউ হয়তো স্রেফ অভ্যাসবশতই লেখে। বানান বিষয়ক বাদ-বিসম্বাদ তাঁরা এড়িয়ে চলেন, এবং বলতে চান, আমাদের চিন্তাশীলতার চর্চা বাড়ানো উচিত, বানান নিয়ে চিন্তা কোন উল্লেখযোগ্য চিন্তা না; বানান বিষয়ক তর্কাতর্কিতে শ্রমের অহেতু অপচয়, তাঁদের কাছে, নিন্দার্হ। শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্দেশ করে যাঁরা বানান নির্ধারণ করতে চান, তাঁদেরকেও এই ঘরানায় ফেলা যাবে, বা ‘ব্যুৎপত্তি-বিচার ঘরানা’ নামে এদেরকে আলাদা স্কুলেও ফেলা যায়।

আরেকটাকে কইতে পারেন নৈরাজ্যবাদী ঘরানা, যারা প্রচলিত-প্রতিষ্ঠিত সব বানানকেই প্রশ্নবোধক করে ও নিজের মতো করে বানান লেখে। এটা বেশ শক্তিশালী ঘরানা৷ তবে, এই ঘরানাও কোনো একশীলা বা মনোলিথিক ঘরানা নয়। কেউ মজা করে বলতে পারেন, অনেকে বানানের নিয়মকানুন শেখা ও মনে রাখার জটিলতা এড়াতে নৈরাজ্যবাদী হন ৷ আসলে, ধ্বনি, দৃশ্য, অর্থ ও কর্তৃত্বের নানা অনুষঙ্গ কাউকে কাউকে বানান-নৈরাজ্যে আস্থাশীল করতে পারে ৷ সাধু-চলিত, প্রমিত-অপ্রমিত নানা কিছুর মিশ্রণ তাদের গদ্যে দৃশ্যমান; নানা বানানও।

তবে, নির্দেশবাদী বা হুকুমদার প্রতিষ্ঠান প্রবর্তিত বানান যদি পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহার করা হয়, তাহলে ওই প্রজন্মের ছেলেমেয়েগুলো পাঠ্যপুস্তকের বানানেই অভ্যস্ত হবে। সেক্ষেত্রে, যেকোনো যুক্তির চেয়ে অভ্যস্ততাই প্রাধান্য পেয়ে যায়। যেমন, আমরা যারা কিছুটা আগের যুগের মানুষ তারা ‘আরবি’, ‘নবী’ এভাবেই লিখতাম, কিন্তু এখন আরবি, নবী এভাবেই বেশিরভাগ মানুষ লেখে, আমরাও লিখি। তার মানে, বানানের ক্ষেত্রে শেষবিচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, ‘পাঠ্যপুস্তক’সহ ভাষা একাডেমি বা দাপুটে প্রতিষ্ঠানের পৌরোহিত্যে প্রবর্তিত বানান ও তাতে অভ্যস্ততা। কিন্তু, একটা ধারা সবসময়ই থাকবে যারা এই প্রবলধারার বিরোধী থাকবে। এটা স্বাভাবিক ও উপকারী।

এই বিভাজন আবার জল-অচল বিভাজন নয়, জল-অচল বিভাজন সম্ভবও নয়, বাস্তবও নয় । কেউ এক ক্ষেত্রে উচ্চারণবাদী, অন্যক্ষেত্রে হতে পারে প্রসঙ্গবাদী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রথাবাদী, মাঝে মাঝে নৈরাজ্যবাদী!

আরেকটা ব্যাপার, পৃথিবীর কোন ভাষাতেই সম্ভবত পুরোপুরি উচ্চারণ অনুযায়ী বানান লেখা হয় না। বরং অনেক সময়ই বানান এক রকম, উচ্চারণ হয় ভিন্ন রকম৷ তবে, উচ্চারণ অনুযায়ী বানান লিখবার বাসনা মরে যায় না। আর, প্রায় সব ভাষাতেই বানানকে সহজতর করবার প্রচেষ্টা থাকে। ইংরেজি বানানের পরিবর্তনের ইতিহাসেও আমরা এমন দেখি। ষোড়শ শতকের বানান, আর বিংশ শতকের বানান এক নয়।

অপ্রমিতের শক্তি : যা প্রমিতে মরিয়া যায়

কিছু কথা আছে যা অপ্রমিতে বললে যতটা তীব্র ও জোরালো হয়, প্রমিতে বললে তার সিকি আনাও হয় না। একটা গানের বিখ্যাত লাইন হইলো—

বন্ধু যখন বউ লইয়া

আমার বাড়ির সামনে দিয়া

রঙ্গ কইরা হাইট্টা যায়,

ফাইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা যায়।

এখন যদি প্রমিত বাংলায় বলা হয়:

বন্ধু যখন বউ নিয়ে

আমার বাড়ির সামনে দিয়ে

রঙ্গ করে হেঁটে যায়

ফেটে যায়, বুকটা ফেটে যায়।

এভাবে বললে এটা হবে কিছু? আগের পঙ্‌ক্তিমালার তীব্রতার কিয়দংশও এইখানে ফুটে উঠলো না। ‘হাইট্টা’ শব্দটা জুতা ও পায়ের যুগপৎ আঘাতের শব্দকে দুটো ‘ট’ ধ্বনির আঘাতে যেভাবে পরিস্ফুট করে, ‘হেঁটে’ শব্দটা ততটা পারে না। একই কথা প্রযোজ্য, ‘ফাইট্টা’ যায় শব্দটার ক্ষেত্রেও। চৌচির হতে থাকা হৃদয়ের শব্দ ‘ফাইট্টা’ শব্দের ‘ট’ ধ্বনির দ্বিত্বে যেভাবে তীব্র হয়, ‘ফেটে’ শব্দের কোমলতায় বুকের ভাঙন ততটা শোনা যায় না, ধরাও পরে না। বন্ধু খড়ম পায় দিয়া ঠক ঠক আওয়াজ কইরা প্রাক্তন প্রেয়সীর বুককে চিড়তে চিড়তে হেঁটে যায়! বন্ধুর হাঁইটা যাওয়ার শব্দ আর প্রাক্তনের বুক চেড়ার যুগপৎ শব্দ যেন এক সুতীব্র হাহাকারের জন্ম দেয় এই অপ্রমিত প্রয়োগে।

অনেক কথাই আছে যা প্রমিতে বললে বাক্য ও ভাব তাদের শক্তি হারায়। তাই, অপ্রমিতের শক্তিকে কাজে লাগাতে যেন দ্বিধা না করি!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...