একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি গণদাবিতে পরিণত হয়েছে, ঠিক তখনই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তে ঢাকা সফরে এসেছেন জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী বিশেষ দূত ড. অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন এবং গত দেড় দশকের বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী করণীয় কী, তা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন আমার দেশ-এর সঙ্গে। র্যাবের ভবিষ্যৎ থেকে শুরু করে জুলাই গণহত্যার বিচার এবং নির্যাতিতদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতের মতো সংবেদনশীল ও জোরালো ইস্যুগুলো উঠে এসেছে একান্ত এ আলাপচারিতায়।
অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত ড. অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘের ‘নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ’ বিষয়ক সপ্তম স্পেশাল র্যাপোর্টার এবং এ পদে নিযুক্ত প্রথম নারী। দীর্ঘ ২৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি পুলিশিং, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা এবং কারাগার সংস্কার নিয়ে কাজ করেছেন। বিশেষ করে ‘ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে নির্যাতনের একটি রূপ’ হিসেবে বিশ্বব্যাপী আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। এর আগে তিনি ‘কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রধান এবং ইউএনএইচসিআরের নীতি ও আইনি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মানবাধিকার নিশ্চিতের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই ড. অ্যালিস বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা কনসিকুয়েন্সিয়াল মুহূর্তে উপস্থিত হয়েছি। এখানে সাধারণ মানুষের যেমন উচ্চ প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও গভীর আগ্রহ আছে। তবে গত কয়েক দিনে আমি যা পর্যবেক্ষণ করেছি— তাতে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে সহিংসতার শিকড় অনেক গভীরে। এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা।’
তিনি সরকারের ‘সংসদীয় মানবাধিকার কমিশন’ গঠনের চিন্তাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘মানবাধিকারকে কখনো রাজনীতির চশমা দিয়ে দেখা উচিত নয়। এটি সর্বজনীন অধিকার। যদি সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে একটি ক্রস-পার্টি কমিটি গঠন করা যায়, তবে মানবাধিকার নিয়ে রাজনীতিকরণের সংস্কৃতি বন্ধ হবে।’
পুলিশে আমূল পরিবর্তনের ডাক
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের ধরন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে দীর্ঘ ও বিস্তারিত উত্তর দেন ড. অ্যালিস। তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদের সময় যখন আপনি বলপ্রয়োগ বা সহিংসতা করেন, তখন তা মস্তিষ্কের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এতে সাক্ষী বা অভিযুক্ত ব্যক্তি সঠিকভাবে তথ্য মনে করতে পারেন না। ভয়ের মুখে তারা এমন নথিতে সই করতে বাধ্য হন, যা তারা আসলে করেননি। এটি সরাসরি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।’
তিনি বাংলাদেশ পুলিশকে আন্তর্জাতিক ‘মেন্ডেস প্রিন্সিপালস’ অনুসরণের পরামর্শ দেন। ড. অ্যালিস বলেন, “আমি চাই বাংলাদেশের পুলিশ সেক্টরে একটি ‘রুটস অ্যান্ড ব্রাঞ্চ রিফর্ম’ বা আমূল সংস্কার আসুক। এটি কেবল উপরে উপরে পরিবর্তন নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক জঞ্জাল পরিষ্কার করার একটি প্রক্রিয়া। জিজ্ঞাসাবাদের সময় অডিও বা ভিডিও রেকর্ডিং করা উচিত, যা পুলিশ বা তদন্তকারী কর্মকর্তারা কোনো জবরদস্তি করছেন না, তা নিশ্চিত করবে। এটি পরে আদালতেও প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।”
তিনি আরো যোগ করেন, ‘পুলিশকে জনগণের সেবক হতে হবে, জনগণের বিরুদ্ধে কোনো শক্তি নয়। আমাদের মৌলিক তদন্ত কৌশলগুলোয় ফিরে যেতে হবে, যেমন সঠিক পরিচয় যাচাই বা অ্যালিবাই চেক করা। এর জন্য খুব উচ্চতর প্রযুক্তির দরকার নেই, শুধু আন্তর্জাতিক আইন এবং সংবিধান মেনে চলাই যথেষ্ট।’
র্যাবের রিব্র্যান্ডিং নাকি আমূল পরিবর্তন?
বাংলাদেশের বিতর্কিত বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) নিয়ে ড. অ্যালিসের অবস্থান ছিল অত্যন্ত জোরালো। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘যেকোনো বাহিনীর পরিবর্তন যেন শুধু নাম পরিবর্তন বা কেবল একটি রিব্র্যান্ডিং না হয়। শুধু নাম বদলে দিলে বাহিনীর চরিত্র বদলায় না। তাদের কাজের পদ্ধতি, প্রক্রিয়া, এমনকি তাদের হাতে কী ধরনের অস্ত্র বা সরঞ্জাম দেওয়া হচ্ছে, সেসব ক্ষেত্রেও আমূল প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আসতে হবে।’
তিনি মনে করেন, বাহিনীগুলোর মধ্যে এ মানসিকতা তৈরি হওয়া জরুরি যে, তারা জনগণের অংশ; প্রতিপক্ষ নয়।
জুলাই গণহত্যার বিচার ও সত্য অনুসন্ধান
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সময় সংঘটিত নৃশংসতা এবং শেখ হাসিনার বিচার প্রসঙ্গে ড. অ্যালিস সরাসরি মন্তব্য না করলেও একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “যেকোনো ভুক্তভোগী বা সারভাইভারের জন্য এমন একটি পদ্ধতি থাকতে হবে, যেখানে তারা নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে তাদের অভিযোগ জানাতে পারে। এখানে একটি ‘ট্রুথ টেলিং’ বা সত্য প্রকাশ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পুনর্মিলন প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন।”
তিনি আরো বলেন, ‘পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে আছে, যাতে এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে গড়ে তোলা যায় এবং জনগণের আস্থা ফিরে আসে। আর এ আস্থার ভিত্তি হতে হবে শক্তিশালী মানবাধিকারের সংস্কৃতি।’ তিনি জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিতের আহ্বান জানান।
নির্যাতিতদের ক্ষতিপূরণ : আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা
জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ড. অ্যালিস বলেন, ‘বাংলাদেশ অনেক বছর আগেই এ সনদে অনুস্বাক্ষর করেছে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার এ অনুচ্ছেদের ওপর থেকে আগের সব আপত্তি বা রিজার্ভেশন তুলে নিয়েছে, যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন সরকারের দায়িত্ব হলো একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া তৈরি করা, যার মাধ্যমে নির্যাতিতরা নিরাপদভাবে রিপোর্ট করতে পারে। কেবল জুলাই অভ্যুত্থান নয়, গত অনেক বছর ধরে যারা পুলিশ হেফাজতে, রাস্তায় বা কারাগারে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় তহবিল গঠন করে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা উচিত।’
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও জবাবদিহিতা
গাজা বা লেবাননের মতো সংঘাতময় অঞ্চলে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক প্রসঙ্গে ড. অ্যালিস বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন মূলত রাষ্ট্রগুলোর সম্মতির ওপর নির্ভর করে। রাষ্ট্রগুলো ১৯৪৫ সাল থেকেই এ নিয়মগুলোয় একমত হয়েছে। যদিও আমি একটি জাতিসংঘ সংস্থার প্রতিনিধি, তবুও আমি বলব মানবাধিকার আসলে মানুষ প্রতিদিন তার নিজের দেশে কী অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, তার ওপর নির্ভর করে। জাতীয় সরকারগুলোকেই মানবাধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা ছাড়া জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
সাক্ষাৎকারে ড. অ্যালিস বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় ইতিহাসের প্রশংসা করেন। তিনি বারবার একটি বিষয়েই জোর দিয়েছেনÑমানবাধিকার কোনো বিলাসিতা নয়; বরং একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার প্রধান স্তম্ভ। পুলিশ বা র্যাবের মতো বাহিনীগুলোকে যখন কেবল ক্ষমতার লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখনই প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

