ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উত্থানে রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ভারতীয় গণমাধ্যমে। দেশটির গণমাধ্যমগুলো অব্যাহতভাবে জামায়াতের উত্থান নিয়ে তাদের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রচার করে চলেছে। এসব প্রতিবেদনে জামায়াতের উত্থানকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
ভারতীয় মিডিয়াগুলো বলছে, ভারতবিরোধী এ ইসলামপন্থি দলটি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জামায়াতের ভালো ফল ভারতের জন্য অশনিসংকেত। জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতবিরোধী নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ৭৭টি আসন নিয়ে বিরোধী দলের আসনে বসছে জামায়াত-এনসিপি জোট। বাংলাদেশের আগামী দিনের ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে আস্থায় রেখে জামায়াতের ওপর চাপ বাড়াতে ভারত সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে দেশটির গণমাধ্যমগুলো।
বাংলাদেশের নির্বাচনে ‘জামায়াত-এনসিপির উত্থান ভারতের জন্য নিরাপত্তা উদ্বেগ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, ভারতবিরোধী জামায়াত ও এনসিপি আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তে তাদের দখল আরো জোরদার করেছে, যা ভারতের নিরাপত্তা হিসাবকে অস্থির করে তুলেছে। বাংলাদেশের রাজনীতির এ মেরুকরণ ধীরে ধীরে সীমান্ত অঞ্চলে কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও সীমান্ত অঞ্চলে ভালো ফল করেছে জামায়াত-এনসিপি জোট। এ জোটের নির্বাচনি ফল ভারতের সেভেন সিস্টারের নিরাপত্তার জন্য আগামী দিনগুলোতে নিরাপত্তা হুমকি বাড়াবে।
ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ইস্টার্ন কমান্ডের সাবেক জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল রানাপ্রতাপ কলিতা ইন্ডিয়া টুডেকে বলেছেন, গ্রামীণ ও সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সুপ্ত ভারতবিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে জামায়াত শক্তিশালী ফলাফল অর্জন করেছে। এটা আমাদের জন্য নিশ্চিতভাবে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে কট্টরপন্থি ইসলামি দল জামায়াত ৬৮টি আসন জিতেছে, যার অধিকাংশেই সীমান্ত অঞ্চলে। গত ২৫ বছরের মধ্যে এটা তাদের বড় ধরনের উত্থান। জামায়াত ঐতিহাসিক ও আদর্শগতভাবে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ, যা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। জামায়াত কখনো গণতান্ত্রিক দল হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, আমাদের প্রত্যাশা বাংলাদেশের নতুন সরকার সীমান্ত অঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
নিউজ১৮-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সীমান্ত জেলাগুলোতে জামায়াতের বিজয় ভারতের নিরাপত্তার জন্য এক বড় ধরনের হুমকি। নির্বাচনের ফলাফলে জামায়াত যে দাপট দেখিয়েছে তাকে ভারতীয় বিশ্লেষকরা সিঁদুরে মেঘ হিসেবেই দেখছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াত ও তার সঙ্গীরা প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছে, যা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। লালমনিরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, মেহেরপুর, সাতক্ষীরাসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জামায়াত অভাবনীয় ফল করেছে। এসব অঞ্চলে বিশেষ করে লালমনিরহাটে চীনের উপস্থিতি রয়েছে, যা ভারতের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি। এখন বাংলাদেশ থেকে ভারতের অভ্যন্তরে হামলার আশঙ্কা বেড়ে গেল।
এতে বলা হয়, ১৯৯১ সালে ১৮টি, ২০০১ সালে ১৭টি, ২০০৮ সালে ২ ও ২০২৬ সালে একলাফে ৬৮টি আসন পেয়েছে জামায়াত। জামায়াতের উত্থান মানেই ভারতবিরোধী অস্ত্রে শান। এখন বিএনপিকে আস্থায় রেখে জামায়াতের ওপর চাপ বাড়াতে হবে।
নিউজ পোর্টাল অপইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে জামায়াতের উত্থানকে ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, ২০২৬ সালের বাংলাদেশের নির্বাচনে হিন্দুবিরোধী ভোটের ধরন দেখা গেছে। ঐতিহাসিকভাবে জামায়াত পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল। তাই পাকিস্তানপন্থি ও ভারতবিরোধী বলে বিবেচিত জামায়াত এবারের নির্বাচনে ৬০টির বেশি আসনে জয়লাভ করে ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। জামায়াত মূলত, সীমান্তবর্তী এলাকায় বেশিরভাগ আসন পেয়েছে, যেখানে হিন্দু জনসংখ্যা ১০ থেকে ১৩ ভাগ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী একা ৬৮টি আসনে জিতেছে এবং জোটগতভাবে তার আসন সংখ্যা ৭৭টি। জামায়াতের ইতিহাসে এটা সবচেয়ে বড় সাফল্য। এর আগে জামায়াত কখনো ১২ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি।
দ্য হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াত অতীতে সব নির্বাচনে সংকটের মধ্যেই ছিল। কিন্তু এবার নির্বাচনের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আধিপত্য দেখিয়েছে জামায়াত। এ বিষয়টি ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হবে।
এএনআইয়ের এক প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সংসদীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর পারফরম্যান্স ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভারতের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জামায়াতের শক্তিশালী উপস্থিতি নয়াদিল্লির জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াত নেতৃত্বের ১১ দলীয় জোটের ৬৮টি আসনের মধ্যে ৫১টি আসন ভারতের সীমান্তসংলগ্ন জেলাগুলোতে দখল করা হয়েছে। এ প্রবণতাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোতে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতির ওপর প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশে কর্মরত একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াত বছরের পর বছর ধরে এ জেলাগুলোতে নীরবে কাজ করে আসছে। আওয়ামী লীগের বিপথগামী নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে এ ইসলামি শক্তির পুনরুত্থান ঘটেছে। জামায়াতের এ উত্থান সীমান্তের বাইরে আদর্শিক প্রভাব সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ইন্ডিয়া টিভির জামায়াতের উত্থান বিষয়ে এক প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ সমর্থন করে। তবে সীমান্তবর্তী এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর জয়ে উদ্বিগ্ন ভারত। জামায়াত ও তার মিত্ররা ৭৭টি আসনে জিতেছে। দলটি ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য সুপরিচিত এবং এর শীর্ষ নেতৃত্ব পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে। এটি ভারতের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

