আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

টিসিবির পণ্য কিনতে দীর্ঘ লাইন ও বিশৃঙ্খলা

রমজানের শুরুতে চাহিদা বাড়ার প্রভাব নিত্যপণ্যের দামে

সরদার আনিছ

রমজানের শুরুতে চাহিদা বাড়ার প্রভাব নিত্যপণ্যের দামে

রমজানের আগে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের চাহিদা বাড়ার প্রভাব পড়েছে বাজারে। সপ্তাহের ব্যবধানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিশেষ করে ইফতার ও সেহরি পণ্য, পেঁয়াজ, মুরগি, মাংস ও দেশি মাছের দাম বেড়ে গেছে। গড়ে এসব পণ্যের দাম ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তবে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারভেদে পণ্যের দামের ভিন্নতা রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানের কয়েকদিন আগে থেকেই নিত্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে বেচাকেনা বাড়ে, এতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সরবরাহ সংকটের কথা বলে দাম বাড়িয়ে দেয়। তবে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা কঠোর হলে দাম বাড়ানোর সুযোগ পায় না। তারা আরো বলেন, রমজানের প্রথম কয়েকদিন ক্রেতার চাহিদা বেশি থাকলেও ৩-৪ দিনের মধ্যে চাহিদা কিছুটা কমে আসবে, তাতে পণ্যের দামও কমবে।

বিজ্ঞাপন

ক্রেতা আরমান আলী জানান, প্রতিবছর রমজান শুরুর আগে প্রস্তুতি হিসেবে ভোক্তারা অতিরিক্ত পণ্য ক্রয় করেন। বাজারে সংক্রট দেখা দেয়, আর এ সুযোগে ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়ে থাকে। এর যেন কোনো প্রতিকার নেই।

গতকাল বুধবার কারওয়ান বাজার, নয়াবাজার, কেরানীগঞ্জ বৌবাজার ও হাতিরপুল কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপণ্যের বাজারে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়, দোকানিদের কথা বলার মতো সময় নেই। ক্রেতারা সবাই ব্যাগ ভরে বাজার করে বাসায় ফিরছেন।

আকলিমা নামের এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রমজানকে ঘিরে ব্যবসায়ীরা সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। এবার নির্বাচন ও নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে মাহে রমজান চলে আসায় সঠিকভাবে বাজার মনিটরিং হয়নি। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা হঠাৎ নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

কারওয়ান বাজারের পাইকারি পেঁয়াজ বিক্রেতা আশরাফ হোসেন বলেন, সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজ কেজি প্রতি ৫৩ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগে ৪২ থেকে ৪৬ টাকা ছিল। খুচরা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৬০ থেকে ৭০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা।

রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে সব ধরনের মাংসের দামও বাড়তি। মুরগির চাহিদা বেড়ে দাম বেড়েছে। হাতিরপুলের ভুতের গলির বাসিন্দা তাহমিনা আক্তার গতকাল সন্ধ্যায় কারওয়ান বাজার থেকে সোনালি মুরগি কিনেছেন কেজি প্রতি ৩৩০ টাকায়। গত সপ্তাহে যা তিনি কিনেছিলেন ৩০০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগি এক সপ্তাহ আগে ১৮০ টাকা কেজিতে কিনেছিলেন, গতকাল কিনতে হয়েছে ১৯০ টাকা কেজিতে। এই বাজারের মুরগি বিক্রেতা আব্দুস সালাম বলেন, প্রতি বছর রমজানে মুরগির চাহিদা বাড়ে এবং সে অনুযায়ী দামও বাড়ে। আমাদের বেশি দামে কিনে কিছুটা বাড়তি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।

কারওয়ান বাজারের মাংস ব্যবসায়ী আলী হোসেন বলেন, খাসির মাংস এখন কেজি প্রতি ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, এক সপ্তাহ আগে যা ছিল ১ হাজার ২৫০ টাকা। গরুর মাংসের দামও কেজি প্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

খেজুর, লেবু, কলা, কাঁচামরিচ, টমেটো, শসা ও ধনেপাতার মতো ইফতারসামগ্রীর দামও বেড়েছে। এক হালি লেবু এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকায়, গত সপ্তাহে যা ছিল ৬০ থেকে ১০০ টাকা। কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায়, আগে যা ছিল ১২০ থেকে ১৪০ টাকা। টমেটো বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৫০ থেকে ৮০ টাকায়, গত সপ্তাহে যা ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা। বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে, এক সপ্তাহ আগে যা ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকা। শসা ও ধনেপাতার দামও কেজি প্রতি ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। শসা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খেজুরের দাম। গত বছর জাহিদি খেজুর প্রতি কেজি ১৮০ টাকায় বিক্রি হলেও তা এবার ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ফলের দামও কিছুটা চড়া লক্ষ্য করা গেছে। আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, আনার প্রায় সব ধরনের আমদানি করা ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দেশি ফলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ব্যবসায়ীরা চাহিদা বাড়ার কথা বললেও ভোক্তারা বলছেন, রমজানকে সামনে রেখে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে।

তবে গত বছরের তুলনায় ছোলা, চিনি, লুজ সয়াবিন তেলের দাম কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। মুদি ব্যবসায়ী বাবলু বলেন, হাতেগোনা কয়েকটি পণ্যের দাম হঠাৎ বাড়লেও গত রমজানের তুলনায় অধিকাংশ পণ্যের দাম কমেছে। এছাড়া রমজান মাসের শুরুতে সব সময় পণ্যের চাহিদা বেড়ে দাম কিছুটা বেড়ে যায়। কয়েকদিন গেলে তা কমে আসবে।

এদিকে রমজান উপলক্ষে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রির দ্বিতীয় দিনেও রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা গেছে। টিসিবির ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের পেছনে হুড়াহুড়ি করে পণ্য কিনেছেন ক্রেতারা। অনেকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও পণ্য না পেয়ে খালি হাতেই ফিরে গেছেন।

গতকাল বিকাল ৫টার দিকে কারওয়ান বাজার টিসিবি ভবনের সামনে দেখা গেছে, টিসিবির ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের পেছনে শতাধিক নারী-পুরুষ ভিড় করছেন। একটু পর পর নারী-পুরুষের লাইনে হুড়াহুড়ি করতে দেখা যায়।

গ্রিনরোড এলাকার বাসিন্দা হেলেনা আমার দেশকে বলেন, লাইনে কোনো শৃঙ্খলা নেই; একজন বারবার কিনছেন। কিন্তু আমরা দুই ঘণ্টা আগে এসেও পণ্য কিনতে পারিনি। একই ধরনের অভিযোগ করেন নাখালপাড়ার জোসনা, ট্রাক ড্রাইভার ফয়সাল ও কাজীপাড়ার শামসুন্নাহার। তারা বলেন, পণ্য বিক্রির কোনো নিয়মনীতি না থাকায় পুরো সময়ই চলছে বিশৃঙ্খলা। সাধারণ মানুষ পণ্য কিনতে পারছেন না। শৃঙ্খলা ফেরাতে এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।

এদিকে গতকাল বিকাল ৪টার দিকে সচিবালয়ের উল্টো দিকে তোপখানা রোডে গিয়ে দেখা গেছে, খাদ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে ভর্তুকি মূল্যে ওএমএসের ট্রাকের সামনেও ক্রেতাদের ভিড়। নিম্ন আয়ের মানুষ এখান থেকে প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকা ও খোলা আটা ২৪ টাকায় সর্বোচ্চ ৫ কেজি ও প্যাকেট আটা ৫৫ টাকায় সর্বোচ্চ ২ প্যাকেট কিনছেন।

এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক আব্দুর রহিম খান বলেন, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে দেশে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে এবারের রমজানে এসব পণ্যের মূল্য বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে চাঁদাবাজি রোধ করতে কর্তৃপক্ষকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান । পাশাপাশি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য ক্রয় করে বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করতে সাধারণ ভোক্তাদের প্রতি অনুরোধ জানান।

এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন আমার দেশকে বলেন, চলতি বছর নির্বাচনের কারণে সরকারি নজরদারির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। নতুন সরকার কী ধরনের ভূমিকা রাখে তা দেখতে আমাদের আরো কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন