ডেঙ্গু উপসর্গ নিয়ে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ভিড় বাড়ছে রোগীদের। রাজধানীসহ সারা দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিনিয়ত জ্বর, শরীর ব্যথাসহ নানা জটিলতা নিয়ে আসছেন রোগীরা। যাদের সাধারণ পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত না হলেও অ্যান্টিবডি পরীক্ষায় উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে ভাইরাসটির। কিন্তু কিট-সংকটে অনেক হাসপাতালে বন্ধ হয়ে গেছে অ্যান্টিবডির দুটি পরীক্ষা আইজিজি ও আইজিএম।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মে মাসের মাঝামাঝি থেকে এই কিটের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে সেখানে সাধারণ পরীক্ষা এনএস১ এখন মূল ভরসা। তবে কিট-সংকটের দায় নিতে নারাজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর আমার দেশকে বলেন, ‘কিটের সংকট যাতে না হয় সেই নির্দেশনা আগেই দেওয়া হয়েছে। তারপরও কেন এমন হলো সেটি সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলতে পারবে।’
রাজধানীর যে কটি হাসপাতালে ডেঙ্গু সংক্রমণ নিয়ে রোগীদের ভিড় তীব্র আকার ধারণ করেছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল তার মধ্যে একটি। গত তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটিতে সাড়ে সাত হাজারের বেশি ডেঙ্গু পরীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে এনএস১ দ্বারা হয়েছে ছয় হাজারের মতো। আর প্রায় দেড় হাজার হয়েছে আইজিজি ও আইজিএমের মাধ্যমে। এসব পরীক্ষায় এক হাজার ৬৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
পরীক্ষার সংখ্যায় এনএস১ বেশি হলেও শনাক্ত বেশি হয়েছে আইজিজি ও আইজিএমের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটির প্যাথলজি বিভাগের তথ্যমতে, আক্রান্তদের ২৪০ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে এনএস১ পরীক্ষায়। আর দেড় হাজার পরীক্ষা করে ৮২৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষায়। এ দুই পরীক্ষায় শনাক্তের হার ৭৭ শতাংশ। কিন্তু গত ১৫ জুন এসব পরীক্ষার কিট শেষ হলেও নতুন কিটের যোগান এখন পর্যন্ত মেলেনি।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ডা. শামীম আরা কেয়া বলেন, ‘গত বছর কিটের সংকট হয়নি, এবার প্রকোপ শুরুর প্রথম দিকেই তা শেষ হয়েছে। অধিকাংশ রোগী পরীক্ষা এনএস-১ এ হলেও আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় এনএস১ শনাক্ত হয় না, তখন আমাদের এ দুটি (আইজিজি ও আইজিএম) করতে হয়। কিন্তু কিটের অভাবে প্রায় ২০ দিন ধরে অ্যান্টিবডি টেস্টগুলো করা যাচ্ছে না। ফলে এনএস-১ আপাতত ভরসা।’
হাসপাতালটির উপ-পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল আমার দেশকে বলেন, ‘অর্থবছর শেষ হওয়ায় মূলত আর্থিক জটিলতা দেখা দেয়। যেখান থেকে ব্যয় করার কথা সেটি আর হয়নি। নতুন অর্থ-বছর শুরু হয়েছে। আগামী সপ্তাহে কিট পাওয়া সম্ভব হবে।’
চলতি বছর ডেঙ্গুর এক-তৃতীয়াংশ রোগী দক্ষিণের জেলা বরগুনায়। প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে উপসর্গ নিয়ে শত শত রোগী যাচ্ছে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে। কিন্তু গত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে এ হাসপাতালেও বন্ধ রয়েছে আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষা। ফলে পাঁচগুণ বেশি খরচে এসব পরীক্ষা বাইরে করতে হচ্ছে রোগীদের।
বরগুনা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. তাজকিয়া সিদ্দিকী বলেন, পরীক্ষা বাড়ায় মে মাসের মাঝামাঝিতে আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষার কিট শেষ হয়ে গেছে।
এদিকে ঢাকার বাইরে থেকে আসা ডেঙ্গু রোগীরা সবচেয়ে বেশি আসেন মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতাল। চলতি বছর এখন পর্যন্ত আড়াই শতাধিক রোগী এ হাসপাতালটিতে ভর্তি হয়েছেন। যাদের সিংহভাগই বরগুনাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা। ডেঙ্গু আক্রান্ত সন্দেহে প্রতিদিন কয়েকশ’ রোগী পরীক্ষা করাতে আসছেন। কিন্তু ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হলেও প্রতিষ্ঠানটিতে এখন পর্যন্ত সাধারণ রোগীদের জন্য আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষা চালু হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও মুখপাত্র ডা. আসিফ হায়দার পরীক্ষা দুটি চালু রয়েছে দাবি করলেও ল্যাবে কাজ করা একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে সেগুলো বন্ধ রয়েছে। এমনকি কেবল হাসপাতালের পরিচালক কারও জন্য তদবির করলেই আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষা হচ্ছে। বাকি ভর্তি রোগীদের পাশের বেসরকারি হাসপাতাল আইসিডিডিআরে করা হচ্ছে।
ওপরের তিন হাসপাতালের মতো দীর্ঘদিন বন্ধ না থাকলেও প্রায় সময় কিটের সংকট দেখা দিচ্ছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। প্যাথলজি বিভাগের একজন টেকনোলজিস্ট জানান, ‘এখন পর্যন্ত বড় আকারে সংকট দেখা না দিলেও প্রায় সময় কিট শেষ হয়ে যায়। পরিচালককে জানালে দ্রুত ব্যবস্থা করে দেয়। সরকারের ওপি বন্ধ হওয়ায় আর্থিক সংকটের কারণে মূলত এমনটা হচ্ছে।’
সাধারণত, উপসর্গ দেখা দেওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে হাসপাতালে এলে র্যাপিড অ্যান্টিজেন পরীক্ষা এনএস১ করা হয়। এক সপ্তাহ পর এলে করা হয় আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষা। সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা দুটির কিটের এমন সংকটে বিপাকে পড়েছেন রোগীরা।
গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সরকারি হাসপাতালে এনএস১, আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষার ফি ৫০ টাকা নির্ধারণ করেছে। একই পরীক্ষা বেসরকারি হাসপাতালে করতে হলে গুনতে হবে ৩০০ টাকা।
কিটের সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগী নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশীদ আমার দেশকে বলেন, ‘গত এপ্রিল মাসে হাসপাতালগুলোকে নিজস্ব পরিচালন ব্যয় থেকে কিট কিনতে বলা হয়েছে। কেন তারা কেনেনি বিষয়টি বোধগম্য নয়। অধিদপ্তর সময়মতো তাদের চিঠি দিয়ে নির্দেশনা দিয়েছে, তারপরও কেন সংকটÑ সেটি বোধগম্য নয়।’
এদিকে গতকালও সারা দেশে ৪১৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নতুন করে মারা গেছেন একজন। ফলে এ বছর ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে ১১ হাজার ৯৮ জনে দাঁড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা বেড়ে ঠেকেছে ৪৪ জনে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

