মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহর আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ বাতিল করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)। একই সঙ্গে ওই পদের বিপরীতে পাওয়া প্রায় দুই বছরের সম্মানী-ভাতা ফেরত দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে চিকিৎসক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। কী কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা, এটি কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিধিবহির্ভূতভাবে দেওয়া নিয়োগ সংশোধনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ। তাদের ভাষ্য, ব্যক্তি যতই সম্মানিত হোন না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।
সমালোচকদের একাংশ মনে করছেন, ডা. আবদুল্লাহ ছিলেন ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক। বিশেষ করে চব্বিশের অভ্যুত্থানের সময় রাজপথে হাসিনা যখন রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিলেন, তখন তার ভূমিকা কী ছিল? তিনি কি এই নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে কখনো কিছু বলেছিলেন কিংবা ব্যক্তিগত চিকিৎসকের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন, অথবা মুখ খুলেছিলেন? তিনি তো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা ছিলেন না। চোখের সামনে এত এত মৃত্যু দেখেও তিনি কীভাবে হাসিনার ব্যক্তিগত ডাক্তারের পদে বহাল রইলেন? ন্যূনতম বিবেকবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি হলে, তিনি তো নিন্দা জানাতে পারতেন। কিন্তু কিছুই করেননি।
অন্যদিকে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে একজন সম্মানিত চিকিৎসকের প্রতি অসম্মান ও প্রতিহিংসামূলক আচরণ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নকে ইমেরিটাস পদ বাতিলের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়। কারণ তিনি এই পদের চেয়েও যোগ্যতম ও সম্মানিত। আর তিনি পেশাদার রাজনীতিক নন, সে হিসেবে বিবেচনা করা উচিত ছিল।
জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন ডা. আবদুল্লাহ। পরে এ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ও ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রথমে ২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পান। এরপর ২০২৪ সালেও দ্বিতীয় দফায় চুক্তিতে সচিব পদমর্যাদায় আবার তাকে একই পদে নিয়োগ দেন শেখ হাসিনা।
স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট হাসিনা যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন টিভিতে কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডা. আবদুল্লাহ বলেছিলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর ভক্ত, শেখ হাসিনা পৃথিবীর সেরা প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া ২০১৭ সালে ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে নয়াদিল্লির প্রেসিডেন্ট ভবনে নৈশভোজে অংশগ্রহণ করেন তিনি। এ সময় এবিএম আবদুল্লাহ তার লেখা চিকিৎসাবিষয়ক সাতটি বই প্রণব মুখার্জির হাতে তুলে দেন। পরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ সংক্রান্ত একটি লেখা পোস্ট করেন।
বিএমইউর ডেন্টাল অনুষদের ডিন ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ গত শুক্রবার তার ফেসবুক স্ট্যাটাস লেখেন, ডা. আবদুল্লাহর ইমেরিটাস অধ্যাপক (আজীবন) নিয়োগ বাতিল ও বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়া নিয়ে বেশ আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। কারণ, তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন চিকিৎসক। কিন্তু যে সমালোচনা হচ্ছে তা দেখে মনে হচ্ছে অনেকেই প্রকৃত ঘটনা না জেনে অথবা বিশেষ উদ্দেশ্যে তা পাশ কাটিয়ে আবেগকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। তাই এটা নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী আমলের ১৭ বছরে তৎকালীন বিএসএমএমইউ থেকে আমিসহ শত শত চিকিৎসকের নিয়োগ বাতিল, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা, প্রাপ্য প্রমোশন থেকে বঞ্চিত করে একাডেমিক জীবন ধ্বংস করা হয়েছে। স্যারের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ কেউ এ বিষয়ে অথরিটির সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করলেও তিনি কোনো ভূমিকা রাখেননি।
তিনি লিখেন, বিশিষ্ট লিভার বিশেষজ্ঞ (প্রয়াত) অধ্যাপক ডা. মবিন খান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যাকে পেনশন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি শুধু বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসক হওয়ার অপরাধে! সে কথা হয়তো অনেকেই জানেন না। জুলাই অভ্যুত্থানের ভয়াবহ দিনগুলোয় হাসপাতালে আগত আহত, গুলিবিদ্ধ নির্যাতিত মানুষকে চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বা পুলিশের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আবদুল্লাহ স্যার তার কোনো প্রতিবাদ করেছেন বলে শোনা যায়নি। এমনকি গণহত্যা চালিয়ে শেখ হাসিনা এই যে দেড় হাজারের বেশি নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করল, এত মানুষকে আহত করল, চোখসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হারালো কত মানুষ! তার কোনো ধরনের নিন্দা কখনো আবদুল্লাহ স্যার করেছেন বলেও শোনা যায়নি।
এ নিয়োগ বাতিলের বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চিকিৎসক আমার দেশকে বলেন, ডা. আবদুল্লাহ স্যার বাংলাদেশের সর্বজনবিদিত একজন খ্যাতনামা ডাক্তার। তিনি কোনো পেশাদার রাজনীতিক নন এবং তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কি না সেটা বিবেচ্য। আর ইমেরিটাস পদটি সম্মানজনক এবং অলাভজনক তাই বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
এ ব্যাপারে বিএমইউর রেজিস্ট্রার ডা. মো. মোস্তফা কামাল আমার দেশকে বলেন, আইন ও নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় চলে। কেউ তো আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। কিন্তু ডা. এবিএম আবদুল্লাহর নিয়োগ ছিল ‘বিধিবহির্ভূত’। তাই বাতিল করা হয়েছে। এখানে তার সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতিহিংসামূলক আচরণ করা হয়নি বা এ সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়নি। আর এ বিষয়গুলো না জেনে-বুঝেই মানুষ নানা ধরনের সমালোচনা করছে যা ঠিক নয়।
শনিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ বলেছে, নথিপত্র পর্যালোচনায় অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহর আজীবন ‘প্রফেসর ইমেরিটাস’ নিয়োগকে ঘিরে একাধিক প্রক্রিয়াগত, প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রশ্ন উঠে এসেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই বর্তমান সিন্ডিকেট নিয়োগটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এ সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়নি; বরং আইন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতেই এটি গ্রহণ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ৬৬তম একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ এবং ৮৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অধ্যাপক আবদুল্লাহকে তিন বছরের জন্য প্রফেসর ইমেরিটাস পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়োগ বিধি অনুযায়ী হওয়ায় সে সময় এ নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল না। তবে ৯২তম সিন্ডিকেটের বাজেট অধিবেশনে মূল এজেন্ডার বাইরে প্রফেসর ইমেরিটাস অধ্যাদেশ সংশোধন করে আজীবন নিয়োগের বিধান যুক্ত করা হয়। একই সভায় সংশোধিত বিধান অনুযায়ী অধ্যাপক আবদুল্লাহকে আজীবনের জন্য প্রফেসর ইমেরিটাস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিএমইউ জানায়, প্রফেসর ইমেরিটাস নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের প্রস্তাব, ডিনের মাধ্যমে উপাচার্যের কাছে উপস্থাপন, মূল্যায়ন কমিটি গঠন এবং সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার বিধান থাকলেও অধ্যাপক আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। কেবল সিন্ডিকেটের একজন সদস্যের প্রস্তাবের ভিত্তিতেই তাকে আজীবনের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। আর নিয়োগের পর গত প্রায় দুই বছরে তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত হননি, শিক্ষাদান করেননি এবং গবেষণায় সম্পৃক্ততার বিষয়েও প্রশাসনকে অবহিত করেননি। তবে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন। দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ইমেরিটাস নিয়োগের নজির থাকলেও আজীবন পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সমপরিমাণ বেতন ও এ ধরনের বিস্তৃত আর্থিক-প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়ার নজির পাওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, এ পর্যন্ত তিনি এ খাতে আনুমানিক সাড়ে ১৪ লাখ টাকার বেশি অর্থ গ্রহণ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ বক্তব্যে পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আমার দেশকে বলেন, আমি ৫০ বছর চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত এবং প্রায় সমান সময় চিকিৎসা শিক্ষায় নিয়োজিত। আমাকে যে ইমেরিটাস অধ্যাপক করা হয়েছিল, তা আমার যোগ্যতার ভিত্তিতেই করা হয়েছিল। কিন্তু আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। যেভাবে এটি বাতিল করা হলো, সেটি নীতিবহির্ভূত। কারণ ২০২৪ সালের পর এতদিন কেন বাতিল করা হলো না। এখন কেন করল, প্রশ্ন রাখেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

