রাজধানীর বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিনের দাম না বাড়লেও ডিলার বা সরবরাহকারী পর্যায়ে কৌশলে দাম বাড়ানো হয়েছে। বেড়েছে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও। কিন্তু বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বাজারে ভোজ্যতেলের কোনো সংকট নেই, পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে; দাম বাড়বে না।
সোমবার রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। কয়েকটি দোকান ঘুরেও এক বা দুই লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল কিনতে পাচ্ছেন না ক্রেতারা। বিক্রেতারা জানান, বেশ কিছুদিন ধরেই বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ তুলনামূলক কম। গত তিন-চার দিনে এ সংকট আরো বেড়েছে। একদিকে তেল কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পরিমাণে কম তেল বাজারে আসছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আতঙ্ক থেকে অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন। সব মিলিয়ে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে।
সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বেশির ভাগ মুদি দোকানে খোঁজ নিয়ে পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেল পাওয়া গেলেও পরিমাণে কম লক্ষ করা গেছে। আর এক বা দুই লিটারের বোতল হাতেগোনা দু-তিনটি দোকানে পাওয়া গেছে। পুষ্টি, রূপচাঁদা, বসুন্ধরা ও ফ্রেশ ব্র্যান্ডের বাইরে অন্যান্য ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল খুব একটা দেখা যায়নি। এতে ক্রেতারা হন্যে হয়ে খোঁজ করেও এক বা দুই লিটার তেলের বোতল কিনতে পারছেন না।
এ প্রসঙ্গে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের মায়ের দোয়া স্টোরের ইমাম উদ্দিন বাবলু বলেন, কয়েকদিন থেকে চাহিদার তুলনায় সয়াবিন তেলের সরবরাহ কম। ডিলাররা বলছেন, কোম্পানিগুলো থেকেই সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ২৫ কার্টন চাইলে পাঁচ কার্টন দেওয়া হচ্ছে। দাম না বাড়ালেও বোতলের গায়ের দামে আমাদের নিতে হচ্ছে। এতে সয়াবিন তেল বিক্রি করে দোকানদের কোনো লাভ হচ্ছে না। দোকানের অন্যান্য পণ্য বিক্রি করতে হবে তাই আমরা গায়ের দামে নিয়ে একই দামে বিক্রি করছি।
রাজধানীর মগবাজার এলাকার বাসিন্দা আরিফা বেগম সোমবার দুই লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল কিনতে প্রথমে মহল্লার কয়েকটি মুদি দোকানে খোঁজ করে না পেয়ে কাওয়ান বাজারে আসেন। এখানেও কয়েকটি দোকান ঘুরে না পেয়ে বাধ্য হয়ে পাঁচ লিটারের বোতলজাত তেল কিনে বাসায় ফিরেন। তিনি বলেন, দুই লিটারের বোতল কিনতে গিয়ে কোনো দোকানেই পাইনি। বাধ্য হয়ে পাঁচ লিটারের জার কিনেছি। সরকার বলছে, ভোজ্যতেলের কোনো সংকট নেই; কিন্তু বাজারে গিয়ে তো আমরা পাচ্ছি না। সমস্যা কোথায় বুঝতে পারছি না।
এদিকে ভোজ্যতেলের সার্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে; দাম বাড়বে না ।
মন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি বাজারে যে সংকটের কথা শোনা যাচ্ছে, তার মূল কারণ কিছু ভোক্তার আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনাকাটা করা। এতে সাময়িকভাবে কিছু এলাকায় সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, গত কয়েক দিনে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কোথাও কোথাও ভোজ্যতেলের সংকট বা প্রতি লিটারে দুই টাকা বেশি দামে বিক্রির খবর প্রকাশিত হওয়ায় পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য এই বৈঠক করা হয়। বৈঠকে আমদানিকারক ও রিফাইনারি মালিকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কোথাও কোথাও ভোক্তারা আতঙ্কিত হয়ে বেশি পরিমাণে তেল কিনে নেওয়ায় কিছু দোকানে সাময়িকভাবে মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে। তবে সার্বিকভাবে বাজারে সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই।
নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজধানীর একটি বাজারে গিয়ে তিনি দেখেছেন রাস্তার পাশের বড় দোকানগুলোতে পর্যাপ্ত ভোজ্যতেল রয়েছে এবং বোতলের গায়ে নির্ধারিত দামই লেখা আছে। তবে বাজারের ভেতরের একটি দোকানে সীমিত মজুত রেখে প্রতি লিটারে দুই থেকে তিন টাকা বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছিল।
ভোক্তাদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনাকাটার কোনো প্রয়োজন নেই। বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় অযথা প্রতিযোগিতা তৈরি করলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিতে পারে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মতো ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও কোনো সংকট নেই। জ্বালানি তেল, গ্যাস বা ভোজ্যতেল—কোনোটিতেই ঘাটতি নেই। তাই এসব পণ্যের সঙ্গে ‘সংকট’ শব্দটি যুক্ত করে অযথা বিভ্রান্তি তৈরি না করার আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রী আরো বলেন, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তদারকি কার্যক্রম আরো জোরদার করা হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত বাজার তদারকি করছে। জেলা প্রশাসনও প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান চালাবে।
তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কোনো আশঙ্কা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তেলের দাম একফোঁটাও বাড়বে না। ভোক্তারা নিশ্চিন্তে বাজার করতে পারেন।
এর আগে গত বছরের ৭ ডিসেম্বরে সর্বশেষ বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছিল। তখন প্রতি লিটারে ছয় টাকা বাড়ানো হলে এক লিটারের বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) হয় ১৯৫ টাকা এবং পাঁচ লিটারের মূল্য হয় ৯৫৫ টাকা। এরপর কোম্পানিগুলো আর মূল্য বাড়ায়নি। তবে সম্প্রতি ডিলার বা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা যে দরে তেল কেনেন, সেটি বেড়েছে। তাতে খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফা কমেছে।
বিক্রেতারা জানান, পাঁচ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলের গায়ের দাম ৯৫৫ টাকা। ডিলারের কাছ থেকে আগে তারা এই তেল ৯৩০ টাকায় কিনতেন, বিক্রি করতেন ৯৪০ টাকায়। ১০ টাকা লাভ থাকত। কিন্তু তিন–চার দিন ধরে তারা পাঁচ লিটারের বোতল কিনছেন ৯৫০ টাকায়, বিক্রি করেন ৯৫৫ টাকায়। অর্থাৎ ডিলার পর্যায়ে দাম বেড়েছে ১০ টাকা। তাতে খুচরা বিক্রেতাদের পাঁচ টাকা লাভ কমেছে। অন্যদিকে ভোক্তাদেরও আগের তুলনায় ৫-১০ টাকা বেশি দামে সয়াবিন তেল কিনতে হচ্ছে।
নয়াবাজারের আলী হোসেন নামের এক বিক্রেতা জানান, এক ও দুই লিটারের সয়াবিনের বোতল খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে কোনো কোনো বিক্রেতা এক লিটারের বোতল ২২০ থেকে ২৩০ টাকা দরেও বিক্রি করছেন।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ-সংকটের মধ্যে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বেড়েছে। পাইকারি বাজারে খোলা সয়াবিন তেল কেজি আকারে বিক্রি হয়। গত চার দিনের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়েছে।
গতকাল কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১৯৮-২০০ টাকায়। চারদিন আগে এ দাম ছিল ১৯৩-১৯৫ টাকা। গতকাল প্রতি কেজি খোলা পাম তেল বিক্রি হয়েছে ১৭০ টাকায়, যা চারদিন আগে ছিল ১৬৫ টাকা।
ভোজ্যতেলের সরবরাহ-সংকটের বিষয়ে কারওয়ান বাজারে সয়াবিন তেলের ডিলার ইয়াসিন বলেন, ‘ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলো থেকে তেলের সরবরাহ কমেছে। কোম্পানি যে তেল ছাড়ছে, আমরা তার পুরোটাই বিক্রি করছি। কোনো মজুতের ঘটনা নেই। কোম্পানিগুলো সরবরাহ বাড়ালে আমরাও বেশি করে বিক্রি করতে পারব।’
তবে দেশের ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলো বাজারে তেলের সরবরাহ-সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ভোজ্যতেলের উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এক কর্মকর্তা নাম ও পদবি প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মিল গেট থেকে সরবরাহ কমেনি। খুচরা বাজারে কেন সংকট হয়েছে তা বলতে পারব না।
এছাড়া গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে ভোজ্যতেল উৎপাদন ও সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। দাম বাড়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

