আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রেফারেন্ডাম ও ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার

ড. এম এল রায়হান

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রেফারেন্ডাম ও ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার
ফাইল ছবি

সাংবাদিক এবং নেত্র নিউজের সম্পাদক তাসনিম খলিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন—অন্তর্বর্তী সরকার কি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে পারে? এই প্রশ্নটি শুধু সমসাময়িক রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়; বরং এটি গণতন্ত্র, রাষ্ট্রনৈতিক বৈধতা এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রূপান্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই বিষয়টি আবেগের পরিবর্তে একাডেমিক ও যুক্তিভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা জরুরি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মৌলিক সন্ধিক্ষণ সৃষ্টি করে। ১৬ বছর ধরে চলমান কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান শুধু একটি সরকারের পতন ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বিকৃত কাঠামো, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত রায়। ফলে এই অভ্যুত্থানের পর জাতির প্রত্যাশা ছিল সুস্পষ্ট—সংস্কার, জবাবদিহি এবং একটি নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালেই একাধিক সংস্কার কমিশন ও কমিটি গঠন করেন। অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে থাকা সব প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক ও গভীর আলোচনা হয়। এসব আলোচনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার বিষয়ে একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে ওঠে। এই ঐকমত্যের গণতান্ত্রিক পরিণতিই হলো প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো জনগণের রায়ের জন্য রেফারেন্ডামে উপস্থাপন করা। এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে—এই রেফারেন্ডামে অন্তর্বর্তী সরকার কি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে? আইনি ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে গণভোট হলো জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার সরাসরি প্রয়োগ। সরকারÑস্থায়ী হোক বা অন্তর্বর্তী যখন জনগণের সামনে কোনো নির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করে, তখন সেই প্রস্তাবের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। এখানে সরকার কোনো দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে না; বরং সর্বদলীয় ঐকমত্যে গৃহীত একটি সংস্কার এজেন্ডা জনগণের সামনে উপস্থাপন করছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এর স্পষ্ট নজির রয়েছে। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় এবং ১৯৯১-৯২ সালে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে রেফারেন্ডামগুলোয় তৎকালীন সরকার তাদের অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচার চালিয়েছিল। ফলে রেফারেন্ডামে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ কোনো নতুন বা অসাংবিধানিক চর্চা নয়। নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকার কোনো নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের সরকার নয়; এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের ফল। সুতরাং এর নৈতিক দায়িত্ব হলো সেই অভ্যুত্থান-উৎপন্ন প্রত্যাশাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। সরকার যখন সর্বদলীয় আলোচনার মাধ্যমে প্রণীত সংস্কার প্রস্তাব জনগণের সামনে উপস্থাপন করে এবং জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানায়, তখন তা নৈতিকভাবে যুক্তিসংগত ও রাজনৈতিকভাবে দায়িত্বশীল আচরণ হিসেবেই বিবেচিত হয়। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরিÑএই প্রচার জবরদস্তিমূলক নয়। সরকার জনগণকে বাধ্য করছে না; বরং যুক্তি, তথ্য এবং সম্ভাব্য সুফল তুলে ধরছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের হাতেই ন্যস্ত। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এই অবস্থানকে সমর্থন করে। দক্ষিণ আফ্রিকায় (১৯৯২) বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের পর ডি ক্লার্ক সরকার রেফারেন্ডামে সংস্কারের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচার চালায়। চিলিতে (১৯৮৮) পিনোশে-পরবর্তী রূপান্তর পর্বে সরকার ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো উভয়ই রেফারেন্ডাম ক্যাম্পেইনে যুক্ত ছিল। তিউনিসিয়া ও নেপালের মতো দেশগুলোতেও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারগুলো সংস্কারমূলক গণভোটে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। এই উদাহরণগুলো দেখায় যে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সময় সরকার নিরপেক্ষ দর্শক হয়ে থাকে না; বরং সংস্কারের পক্ষেই অবস্থান নেয়। অতএব, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক রেফারেন্ডামে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানো কোনো ক্ষমতার অপব্যবহার নয়। এটি গণঅভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট রক্ষা, রাজনৈতিক ঐকমত্য বাস্তবায়ন এবং জনগণের সামনে একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করার দায়িত্বশীল প্রয়াস। এই গণভোট শুধু একটি ভোট নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো নির্ধারণের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এমন মুহূর্তে সরকারের নীরব থাকা নয়, বরং স্পষ্ট ও যুক্তিনির্ভর অবস্থান নেওয়াই গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পরিশেষে, একজন নাগরিক হিসেবেও আমি আমার অবস্থান স্পষ্ট করতে চাই। প্রিয় দেশবাসী, আপনাদের দীর্ঘ প্রত্যাশার নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে আসুন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে বিজয়ী করি।

লেখক : বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পোস্ট ডক্টরাল গবেষক, সোকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

বিজ্ঞাপন
Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন