আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রাষ্ট্রপতির বক্তব্য : নৈতিকতা এবং রাজনৈতিক দৃশ্যপট

আমীর খসরু

রাষ্ট্রপতির বক্তব্য : নৈতিকতা এবং রাজনৈতিক দৃশ্যপট

বাংলাদেশের রাজনীতি এমনই যে, ঝামেলা একটি নিত্যদিনের ঘটনা। এখানে ঝামেলা এবং সংকটের মধ্যে পার্থক্যটা বুঝতে হবে। কারণ ঝামেলা এবং সংকটের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, তা অধিকাংশ মানুষই বুঝতে পারেন না।

তবে ঝামেলা অতিদ্রুত সংকটে রূপান্তরিত হয়। কাজেই এই ঝামেলাকে অতিদ্রুত সমাধান, প্রয়োজনে কঠিনভাবে মোকাবিলা করতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে। ঝামেলা আপাত নিরীহ মনে হলেও এখন এটি সম্ভাব্য সংকটে রূপান্তরের ‘বিষবৃক্ষ’ হতে পারে। রাজনীতিতে ঝামেলা এবং সংকটের পার্থক্য হচ্ছে, হুমকির মাত্রা পরিস্থিতির জরুরি অবস্থান এবং রাজনৈতিক স্বাভাবিক কাজকর্মের নিম্ন ও উচ্চঝুঁকির মাত্রার ক্ষেত্রে। ঝামেলা, আপাত নিরীহ এবং পরিচালনক্ষম আর সংকট, তীব্র, নীতিকৌশলে প্রচণ্ড আঘাত সৃষ্টিকারী এবং বড় হুমকিস্বরূপ।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সাম্প্রতিক সংবাদপত্রের সাক্ষাৎকার এবং বক্তব্যগুলো আপাত ঝামেলাপূর্ণ মনে হলেও ভবিষ্যতে এটি সংকটের বড় আলামত কি নাÑতার দায়দায়িত্ব ক্ষমতাসীনদের হাতে ছেড়ে দেওয়া ভালো।

তবে মনে রাখতে হবে, ‘রাষ্ট্রপতি’ ‍শুধু একজন ব্যক্তি নন, এটি একটি প্রতিষ্ঠান। যে মুহূর্তে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেবেন, সেই মুহূর্ত থেকে ব্যক্তি ‘মো. সাহাবুদ্দিন’ নামের সত্তাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা অটোমেটিক বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ কারণেই ‘সংবিধান’ নামক পুস্তকটির এত গুরুত্ব। মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের তৃতীয় তফসিলের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যে শপথ পাঠ করেন তাতে বলা হয়েছে, ‘আমি সংবিধানের রক্ষক, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধান করিব; এবং আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহীত আচরণ করিব।’

এছাড়া রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসহ সবাইকে শপথ ও ‘গোপনীয়তার শর্ত’ প্রতিপালন করতে হয়।

আগেই বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি হলে ব্যক্তি সত্তাটি বিলুপ্ত হয়। তাছাড়া তিনি ‘কারো প্রতি অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হবেন না।’

রাষ্ট্রকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নীতিশাস্ত্র বা Ethics and moral Philosophy— অর্থাৎ নৈতিকতা এবং নীতিশাস্ত্রীয় দর্শন। এ বিষয়ে পরে আলোচনায় আসব।

রাষ্ট্রপতি ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সংবাদপত্রে যে সাক্ষাৎকার দেন, আশা করি অনেকেই তা জানেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে ওই সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টির অনেক পাঁয়তারা হয়েছে।... তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, এই কঠিন সময়ে ও বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিল। বিশেষ করে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো গোর্ডিয়াল। আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।

এ গেল বিএনপি সম্পর্কে কথা। সশস্ত্র বা তিন বাহিনীর সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তারা বিভিন্ন সময় আমার কাছে এসে আমাকে মনোবল দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে আরেকবার আমাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে শুনেছি। তখনো তিন বাহিনীর প্রধান আমার পক্ষে অবস্থান নেন।’

এই সাক্ষাৎকারটি পড়ার পর একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে যে প্রশ্নটি জাগে প্রথমেই, তা হলোÑএই সাক্ষাৎকারটি ‍‘শপথ গ্রহণকারী রাষ্ট্রপতির’ না ব্যক্তি মো. সাহাবুদ্দিনের? যদি সংবিধান মোতাবেক শপথ গ্রহণকারী রাষ্ট্রপতির হয়, তাহলে যেকোনো বিচারে, বিশেষ করে সংবিধান অনুযায়ী তার ‘রাষ্ট্রপতি সত্তার’ বিলুপ্তি হয়ে গেছে। কারণ ‘অনুরাগ বা বিরাগের’ বিষয়টি তিনি বাদেও এর সঙ্গে রাষ্ট্রের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। আর যদি ব্যক্তি মো. সাহাবুদ্দিনের হয়, তাহলে তিনি ন্যায়-নীতি, সংবিধান বিসর্জন দিয়ে ‘রাষ্ট্রপতি’ পদের অপসুযোগ ও অপব্যবহারের সুযোগ গ্রহণ করেছেন। যাকে ইংরেজিতে বলা হয় Misuse, Abuse of Power.

এখন রাষ্ট্রপতিকে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে, অতি অবশ্যই।

এছাড়া বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারেÑএক. এটা কী নালিশ জানানো? দুই. বিএনপি ক্ষমতাসীন হওয়ায়, তারই সুযোগ গ্রহণ করা হয়েছে? তিন. এর মাধ্যমে কি তিনি বিএনপির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিতে পরিণত হতে চাচ্ছেন? চার. সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে প্রকাশ্যে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা কি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষার জন্য বিপজ্জনক নয়? পাঁচ. অন্তর্বর্তী সময়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়, তিনি কেন ওই সরকারের প্রধানের সঙ্গে বিরোধ মীমাংসা করেননি বা মিটিয়ে নেননি? ছয়. তাহলে কি ধরে নেওয়া যাবে, আরো কিছু বিষয় আছে, যা তিনি বলছেন না এবং যা বলছেন তা এডিট করা? সাত. অনেক ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করা স্বাভাবিক, যাতে তিনি একটি পক্ষ নিয়ে কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেছেন? আট. সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে প্রকাশ্যে বলে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছাকৃত ক্ষতি করতে চেয়েছেন?—এ ধরনের বহু প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়।

সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি করা যায়, নৈতিক এবং ন্যায্যতা বা ন্যায়পরায়ণতা (Ethics and Morality) মানদণ্ডে রাষ্ট্রপতি এটা পারেন কি না?

অতীত অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে বাধ্য করা হয়েছিল পদত্যাগ করতে। ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর তাজউদ্দীন আহমদ পদত্যাগ করেন। কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ তো কখনোই ‘কী ঘটেছিল’ এ সম্পর্কে কোনো বক্তব্য দেননি, সাক্ষাৎকার দেননি অথবা বইও লেখেননি। কারণ নীতিনৈতিকার এবং শপথের বিষয়ে একনিষ্ঠ ছিলেন।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে পদত্যাগ করতে বলা হয় কোনো অভিশংসন ছাড়াই। তিনি পদত্যাগ করলেও কারণ হিসেবে কোনো সাক্ষাৎকার বা বই লেখা অথবা বক্তব্য দেননি শপথ ও নৈতিকতার কারণে। অথচ এই আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে উপাচার্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ২০০২ সালের ২১ জুন পদত্যাগে বাধ্য হন। যতদূর জানি, তিনিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সাক্ষাৎকার, বই লেখা বা বক্তব্য দেননি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এ রকম আরো অনেক ঘটনা আছে। কিন্তু এবারের মতো বা এ রকমটা আর দেখা যায়নি।

বর্তমান বাস্তবতা

এ সম্পর্কে বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রিপর্যায়ের ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাকে বলেন, এই সাক্ষাৎকার এবং বক্তব্য সংবিধান এবং নৈতিকতাবিরোধী। তবে তিনি এ ব্যাপারে আর বিস্তারিত কিছু বলেননি।

এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, যে অন্তর্বর্তী সরকার সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের এত ক্ষোভ, তাদের যে কেউই যদি পাল্টা বক্তব্য দেন এবং তাদের সপক্ষে আরো তথ্য ফাঁস করেন, তাহলে পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। আমি জানি না এ ব্যাপারে আসল পরিস্থিতি কী? তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে জটিল এবং সংকটাপন্ন হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামী ‘শপথভঙ্গের’ অভিযোগ করেছে। আর এনসিপি রাষ্ট্রপতির অভিশংসন দাবি করেছে।

এখন শোনা যাচ্ছে এবং সংবাদমাধ্যম খবর দিয়েছে, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে শেখ হাসিনার আমলের ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং মানবতাবিরোধী অপরাধÑঅর্থাৎ গণহত্যার বর্ণনা দিয়ে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। যদিও এই ভাষণ তিনি বা তার দপ্তর প্রস্তুত বা লেখেন না। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, এটা কি এত দিন যা বলেছেন, তার সঙ্গে কাটাকুটি খেলা। মোটেই নয়। এখানেই রয়েছে আসল রহস্য। বোধ করি, পাঠক অচিরেই সবকিছু বুঝতে পারবেন।

নৈতিকতার মানদণ্ড

শপথ গ্রহণ হচ্ছে, নৈতিকতা এবং নীতিশাস্ত্র বা ন্যায়নুগভাবে ক্ষমতাকে বৈধতা দান করা। নৈতিকতা ব্যক্তির অন্তর্গত বিশ্বাস এবং নীতিশাস্ত্র হলো বাহ্যিক, কাঠামোগত বিষয় এবং ন্যায়ানুগ আচরণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকারী।

নৈতিকতা এবং নীতিশাস্ত্রের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পৃক্ততা রয়েছে। Bertrand Russell তার পাওয়ার এ নিউ সোশ্যাল অ্যানালাইসিস বইয়ে ক্ষমতাকে সমাজ এবং মানুষের প্রাকৃতিক মৌলিক ও অনিবার্য চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাসেল বলছেন, নৈতিকতার নিয়ন্ত্রকহীন পরিস্থিতি নিপীড়কের দিকে যাত্রা করে। অর্থনীতিবিদ এবং দার্শনিক জন কেনেথ গলব্রেথ ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে এ ক্ষেত্রে নীতিনৈতিকতার কথা বলেছেন।

কাজেই এটা কোনো ব্যক্তির বিষয় নয়। এটা প্রতিষ্ঠানের এবং সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র জনগণের। জ্যাঁ জ্যা রুশোর দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্টে তিনি বলেছেন, ‘স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার; কিন্তু তবু সে শৃঙ্খলিত।’ কারণ নৈতিকতা ও ন্যায্যতার মানদণ্ড, তাকে মানতে হয়।

লেখক : গবেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন