আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের শক্তি ও প্রভাব কি কমছে

বেহরুজ আয়াজ

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের শক্তি ও প্রভাব কি কমছে

দক্ষিণ এশিয়ায় বড় বড় প্রকল্পের মাধ্যমে চীন তার সক্ষমতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেই প্রকল্পগুলো এখন উদীয়মান শক্তি হিসেবে চীনের ইমেজকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। দুই দশক ধরে চীন দক্ষিণ এশিয়ায় অবকাঠামো নির্মাণ এবং স্থিতিশীলতার একটি নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে তার অবস্থান সম্প্রসারিত করেছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে প্রত্যাশা আরো বেড়ে গেছে যে, বেইজিং সেই শূন্যতাও পূরণ করবে।

কিন্তু স্থগিত হয়ে পড়া চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্প থেকে শুরু করে আফগানিস্তানে অব্যাহত নিরাপত্তা হুমকি, তালেবান-পাকিস্তান আলোচনায় অগ্রগতি অর্জনে বেইজিংয়ের অক্ষমতা, চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তবতার মধ্যে বিস্তৃত ব্যবধানেরই চিত্র তুলে ধরে। এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হচ্ছেÑচীনের প্রকল্পগুলোয় ক্রমবর্ধমান ব্যাঘাত সৃষ্টি বেইজিংয়ের আঞ্চলিক নেতৃত্বের দাবির ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে এবং এশিয়ার উদীয়মান শক্তি হিসেবে তার মর্যাদা তা কতটা ক্ষুণ্ণ করে?

বিজ্ঞাপন

২০১৩ সাল থেকে আফগানিস্তান-পাকিস্তান (আফপাক) অঞ্চলটি এমন এক বিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে চীনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব উন্মোচিত হয়েছে। এখানে চীন তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে নিজের ভূরাজনৈতিক প্রভাব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় যে ব্যয় এবং নিরাপত্তা ইস্যুগুলো আছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ না করেই নিজের প্রভাব তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

বেশ কয়েকটি কাঠামোগত এবং নিরাপত্তা কারণ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় চীনের জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। আফপাক অঞ্চলে চীনকে প্রায়ই শুধু বিনিয়োগকারী হিসেবে নয়, বরং স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার গ্যারান্টার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে চীনের বহিরাগত নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতার অভাব রয়েছে এবং তারা কখনোই এ ধরনের কোনো বিদেশি মিশন নিয়ে কাজ করেনি।

সংকট ব্যবস্থাপনার জন্য চীনের ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার এবং প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। বিশেষ করে, যেসব দেশ দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত, সেসব দেশে চীনের এই অভিজ্ঞতার অভাব প্রকট। এটাকে ‘নিরাপত্তা-উন্নয়ন সম্পর্ক’ বলা যেতে পারে। যেখানেই নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে, সেখানেই বিআরআইয়ের বৈধতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সিপিইসির জন্য চীনের প্রতিশ্রুত বরাদ্দ ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি; কিন্তু আফপাক অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে শাসন ক্ষমতায় রূপান্তরিত করার ব্যর্থতা দেশটির অক্ষমতারই ফল। দুয়ের মধ্যে এই ব্যবধান দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক প্রভাবকে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

চীনের এই বিনিয়োগগুলো দ্বৈত উদ্দেশ্য করে; দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতি আনা এবং বেইজিংয়ের কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবকে আরো গভীর করা। প্রকল্পের সফল সমাপ্তি উভয় উদ্দেশ্যকেই এগিয়ে নেবে। কিন্তু তারপরও এই বিনিয়োগগুলো চীনের দুর্বলতারও প্রতিফলন ঘটায়। যখন প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে পড়ে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয় বা সময়সীমা পিছিয়ে যায়, তখন একটি সক্ষম আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে চীনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে, প্রকল্পের ব্যাঘাতগুলো বিভিন্ন উপায়ে দেখা দেয়। বিলম্ব, নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং ক্রমবর্ধমান ব্যয় সরাসরি চীনের পরিচালনা ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলে এর মর্যাদা এবং মিডিয়া ও রাজনৈতিক ইমেজের ওপর স্পষ্ট প্রভাব পড়ে।

উদাহরণস্বরূপ, পাকিস্তানে সিপিইসির বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি যা দিয়ে ৩,০০০ কিলোমিটার সড়ক ও রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

তবে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে এই লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ২৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বা কাজের প্রায় ৪০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পের কাজে ধীরগতির এই চিত্র রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা হুমকির কারণে আংশিকভাবে বিলম্ব উভয়ই প্রতিফলিত করে। এ বিষয়টির গুরুত্ব এটাই যে, বেইজিংয়ের ভূরাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা সিপিইসির সাফল্যের সঙ্গে জড়িত।

বেলুচিস্তানের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, পাকিস্তানের এই প্রদেশে চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো অসমাপ্ত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে গোয়াদর ইস্ট বে এক্সপ্রেসওয়ে, হাব কয়লা-বিদ্যুৎ প্রকল্প (১,৩২০ মেগাওয়াট) এবং নোকুন্ডি-মাশখেল-পাঞ্জগুর রোড, যা বারবার তথাকথিত বেলুচ লিবারেশন আর্মির হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি বেলুচিস্তানে চীনা নাগরিকদের ওপর কমপক্ষে ১৪টি আক্রমণ করেছে, যাতে কমপক্ষে ২০ জন নিহত এবং ৩৪ জন আহত হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে এই গোষ্ঠীটি পাকিস্তানের ৫১টি স্থানে ৭১টি হামলার দায় স্বীকার করেছে।

চীন আশঙ্কা করছে, এ ধরনের হামলা তার প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিএলএর সাফল্য জিনজিয়াংয়ের ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলোর জন্য একটি মডেল হিসেবেও কাজ করতে পারে, যা অন্যান্য সংবেদনশীল অঞ্চলেও একই ধরনের কৌশল গ্রহণের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

আফগানিস্তানে চীনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। মূল প্রকল্পগুলোর মধ্যে আছে লোগার প্রদেশের আইনাক তামাখনিতে বিনিয়োগ, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তামার মজুতের আবাসস্থল। ২০০৮ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি ন্যাটো-তালেবান সংঘাতের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতার কারণে ১৬ বছর বিলম্বিত হয়েছে।

অন্যান্য কৌশলগত উদ্যোগের মধ্যে আছে উত্তর আফগানিস্তানের প্রদেশগুলোয় (ফারিয়াব, সার-ই পোল, জওজান) ২৫ বছরের আমু দরিয়া তেল চুক্তি এবং ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত বাদাখশানে ওয়াখান সীমান্ত করিডোর প্রকল্প, উভয়ই উল্লেখযোগ্য ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। সম্ভবত সবচেয়ে কৌশলগত প্রকল্পটি হলো আফগানিস্তানে লিথিয়ামে চীনের ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ। তবে, অনেক প্রকল্প অস্থিতিশীল অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন। উদাহরণ হিসেবে এখানে আমু দরিয়া তেল চুক্তি এবং ওয়াখান করিডোরের কথা উল্লেখ করা যায়।

পাকিস্তানে সিপিইসির কিছু অংশ আর্থিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, অন্যদিকে আফগানিস্তানে চীনা অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বারবার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা হুমকি এবং সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হওয়ার কারণে প্রভাবিত হয়েছে। ২৬ এবং ৩০ নভেম্বর আফগান-তাজিক সীমান্তে চীনা জনগণের ওপর পরপর দুটি হামলায় যথাক্রমে পাঁচ এবং দুই চীনা নাগরিক নিহত হন। এসব হামলা আফগানিস্তানে চীন এবং তাদের প্রকল্পগুলোর জন্য নিরাপত্তাহীনতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি) আফগানিস্তানে অস্থিতিশীলতা এবং ভঙ্গুর শাসনব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে দেশটিতে চীনা বিনিয়োগের ঝুঁকি তুলে ধরেছে। এই সমস্যাগুলো শুধু স্থানীয় আস্থা হ্রাস করে না; বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রতিযোগীদের চীনের অদক্ষতা সম্পর্কে নেতিবাচক বয়ান প্রচারের সুযোগ করে দেয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে কৌশলগত মর্যাদা গঠনে মিডিয়া এবং প্রতিযোগীদের ভূমিকা। কারণ নেতিবাচক বয়ানগুলো সমস্যা সৃষ্টির আশঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। এ কারণেই চীন তার সরকারি ইমেজ এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার জন্য প্রতিপক্ষের বয়ানকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে থাকে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের মতে, বয়ান নিয়ন্ত্রণ করে চীন তার প্রকল্পগুলোর আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতে চায়, ইঙ্গিত দেয় যে, বেইজিংয়ের উদ্বেগ অর্থনৈতিক স্বার্থের বাইরেও তার বৈশ্বিক মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত। চীন বোঝে যে, তার আধিপত্য শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ এবং প্রযুক্তিগত ক্ষমতার ওপর নয়, বরং কৌশলগত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নীতির ওপরও অনেকটাই নির্ভর করে।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর দেশটির পরিচালনা এবং পাকিস্তান ও আফগানিস্তান উভয় ক্ষেত্রেই প্রকল্প সম্পন্ন করা বেইজিংয়ের কৌশলগত ব্যবস্থাপনা, আধিপত্য এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সুনির্দিষ্ট কৌশল এবং কার্যকর নীতি ছাড়া শুধু অর্থনৈতিক শক্তি টেকসই মর্যাদা বা নেতৃত্বের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। অকার্যকর সংকট ব্যবস্থাপনা অনিবার্যভাবে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক উভয় অবস্থানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সাম্প্রতিক সময়ে তালেবান-পাকিস্তান অমীমাংসিত আলোচনা চীনের সীমিত প্রভাব, অপর্যাপ্ত আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং সক্রিয় সংকট-ব্যবস্থাপনা উদ্যোগের অভাবকে প্রতিফলিত করতে পারে। চীন এখন একটি দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যা তার পরিচালনা ক্ষমতা এবং সফট পাওয়ার বা নরম শক্তি উভয়কেই পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। সংগত কারণেই চীনের সাফল্য বা ব্যর্থতা তার আঞ্চলিক আধিপত্য এবং নেতৃত্বের ভূমিকার ভবিষ্যৎকে রূপ দেবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী একটি দেশ এখন তার দুই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমন এবং অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলো সুরক্ষিত করার জন্য কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। বিআরআইয়ের প্রধান প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত সিপিইসি যদি এত দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা, বিলম্ব এবং অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়, তাহলে এটি অন্য দেশগুলোকেও ভুল বার্তা দেবে।

এশিয়া টাইমস থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...