আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও বিষাক্ত চিংড়িতত্ত্ব

আমীর খসরু

বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও বিষাক্ত চিংড়িতত্ত্ব

খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬-এর দিকে মহামতি আলেকজান্ডার ভারতে আসেন আক্রমণ এবং রাজ্যগুলো নিজের করায়ত্ত করার উদ্দেশ্যে। ঝিলাম নদীর তীরে ছোট্ট অর্থাৎ ক্ষুদ্র এক রাজ্যের রাজার সঙ্গে তার যুদ্ধ হয়। স্বাভাবিক কারণেই ওই যুদ্ধ অর্থাৎ যাকে হাইডাস্পেসের যুদ্ধ বলা হয়, তাতে রাজা পুরু পরাজিত হন। তাকে আটক করে আলেকজান্ডারের সামনে নেওয়া হয়Ñএকজন যুদ্ধবন্দি হিসেবে। যুদ্ধবন্দিদের প্রতি আচরণ সাধারণত কখনোই ভালো হয় না, তা সবারই জানা। রাজা পুরু একই আচরণের জন্য যে তীব্র প্রতিবাদ করেন, তা আলেকাজান্ডারের কানে পর্যন্ত পৌঁছায়। আলেকজান্ডার একপর্যায়ে রাজা পুরুকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কেমন আচরণ আশা করেন। চটজলদি রাজা পুরু জবাব দেন, ‘একজন রাজার সঙ্গে আরেকজন রাজার যেমন আচরণ করা উচিত, তিনিও তেমনটি আশা করেন।’

আলেকজান্ডার ভারতের অনেক রাজ্য, অঞ্চল দখল করেছিলেন। তার হিসাব বা ইতিহাস কেউই হয়তো জানেন না। জানার কথাও নয়। তবে আলেকজান্ডার এবং রাজা পুরুর এই ঘটনাটি এখনো ইতিহাসের অংশ। মহামতি আলেকজান্ডার শুধু বিস্মিতই হননি, এতে শিক্ষাও নিয়েছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ রাজা পুরুকে তো মুক্তি দেনই, সঙ্গে তার রাজ্য তাকে ফেরত দেন। ঝিলাম নদীর পাড়ের কয়েক হাজার বছর আগের ঘটনার স্থান হচ্ছে বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাবের পাহাড়ি এলাকা। রাজা পুরু এখনো সম্মানিত এই কারণে যে, তিনি ছোট রাজ্যের রাজা হলেও স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং রাজ্য হিসেবে টিকে থাকার নৈতিক গভীর উপলব্ধিতে বলীয়ান ছিলেন। এ কারণে এখনো তিনি অনন্যসাধারণ হিসেবেই ইতিহাসে টিকে আছেন।

বিজ্ঞাপন

আধুনিক পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার যে নীতি, তা যদি এ রকম হতো, তাহলে ক্ষুদ্ররাষ্ট্রের নিরাপত্তার ধারণা এবং তাত্ত্বিক ভিত্তিভূমি ভিন্ন হতে পারত। এই লেখায় এ কথাটি বলতে চাই যে, আসলে প্রকৃত বিচারে ক্ষুদ্ররাষ্ট্র বলতে কিছু থাকে না, যদি রাজা হন ওই নৈতিক মনোভাবে বলীয়ান এবং জাতীয় ঐক্য থাকে। রাষ্ট্র হচ্ছেÑস্বাধীন, সার্বভৌম এবং তার নিজস্ব এলাকা ও অবস্থান রয়েছে। দার্শনিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ সম্পর্কে বইটি না পড়ে অধিকাংশই অনেক বিরূপ মন্তব্য করেন। তাদের উদ্দেশে বলা প্রয়োজন যে, কোনো বই না পড়ে, না বুঝে মন্তব্য করা কোনোক্রমেই উচিত নয়। তেমনি খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭০ থেকে ২৮৩ পর্যন্ত চাণক্য সেন (চাণক্য), অপরনাম বিষ্ণগুপ্ত সম্পর্কেও কোনো কিছু বলা সমীচীন নয়Ñতার নীতিকৌশল ও জ্ঞানকে অপছন্দ করলেও।

ম্যাকিয়াভেলির মতে, রাষ্ট্র কখনোই ক্ষুদ্র থাকে না, যদি কিছু বিষয়ের বিদ্যমানতা অটুট থাকে। তিনি বলেন, ‘যদি কোনো দেশের জনগণের মধ্যে জাতিগত ঐক্য আছে কি না এবং জনগণ একই ভাষায় কথা বলে কি নাÑবিশেষ করে তারা স্বাধীনচেতা কি নাÑতা দেখেই কোনো রাজার রাজ্য দখলের বাসনা করা উচিত। অর্থাৎ ম্যাকিয়াভেলির মতে, নাগরিকদের জাতীয় ঐক্য, একই ভাষাভাষী ও স্বাধীনচেতা হওয়াটা জরুরি। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন তুরস্কের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ম্যাকিয়াভেলি বলেন, তুরস্ক দখল করা কঠিন এ কারণে যে, এখানে দখলকারীকে আমন্ত্রণ জানানোর মতো কোনো অভিজাত গোষ্ঠী নেই। কোনো আক্রমণকারী এমন উদ্যোগ নিলেও এখানে প্রবেশ করা তাদের জন্য অসম্ভব। কারণ রাজ্যের সব প্রজা এবং নির্ভরশীল ব্যক্তিদের বিপথগামী করা খুবই কঠিন কাজ। যদি কেউই বিপথগামী হয়েও থাকে, তাহলে তারা বেশিদূর এগোতে পারবে না। কারণ তারা অধিকৃত রাজ্যের জনগণকে সঙ্গে পাবে না। সুতরাং তুরস্ক আক্রমণ করতে চাইলে তাকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজ ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়েই করতে হবে। কোনো ধরনের অন্তর্কলহের সুযোগ তারা নিতে পারবে না। যদি দখল করা হয়, তাহলে প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে হবে। বিতাড়ন করতে হবে পুরো বাহিনীকে।

অর্থাৎ জনগণের জাতীয় ঐক্যই আসলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অন্যথা নয়। আর ‘অভিজাত শ্রেণিই’ রাজ্যকে ভঙ্গুর করে। এ সম্পর্কে তুলনামূলক আলোচনায় ম্যাকিয়াভেলি বলেন, ‘ফ্রান্সের মতো শাসনব্যবস্থায় অভিজাত শ্রেণিকে প্রলোভন দেখানো সহজ এবং এভাবেই শত্রুশক্তি রাজ্য প্রবেশ করতে পারে সহজেই। কারণ এমন শাসনব্যবস্থায় অসন্তোষ লেগেই থাকে। ফলে পরিবর্তন চায়। [তথ্য সূত্র : নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, দ্য প্রিন্স (বাংলা অনুবাদ), মুক্তচিন্তা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা : ১৬-২৪]

এখানে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো স্বাধীন নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের ঐক্য, যার ভিত্তি দেশপ্রেম হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন ও কঠোর ভিত্তি এবং মূল সূত্র। দ্বিতীয়ত, একই ভাষা অর্থাৎ ভাষাগত ঐক্য। তৃতীয়ত, সাধারণ জনগণ দেশপ্রেমের বিষয়ে বিশ্বাসঘাতক, প্রতারক অথবা বিপথে পরিচালিত নন। চতুর্থত, এসব গুণাবলি যে রাষ্ট্রের থাকে, তারা সর্বোচ্চ বিবেচনায় ক্ষুদ্ররাষ্ট্র হলেও সেই দেশকে কোনো বহিঃশক্তি পরাজিত করতে পারে না।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজনÑদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষাকে অরক্ষিত, দুর্বল করার জন্য অভিজাত শ্রেণিকেই দায়ী করা যায়। দ্য প্রিন্স-এ ম্যাকিয়াভেলি লিখেছেন, ‘১৫১৩ সালে নির্বাসনে থাকা অবস্থায়। অথচ কী আশ্চর্য! মনে হয় এখনকারই প্রতিচ্ছবি।

একইভাবে চাণক্য তার ‘আব্লিয়স অধিকরণে’ বলছেন, কপট উপায়ে বিজয় লাভ এবং কপট আক্রমণ দ্বারা বিজয়োপলব্ধি হচ্ছে দুর্বল শাসকের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা। চাণক্য সূত্রমতে দুটোর উল্লেখ করা প্রয়োজন (বাংলা অনুবাদ) ‘নিকট রাজ্য স্বাভাবিকভাবেই শত্রু হয়ে যায় এবং কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই শত্রু বন্ধু হতে চায়।’ (তথ্য সূত্র : চাণক্য নীতি ও কৌটিল্য অর্থশাস্ত্র, পৃষ্ঠা : ১১৫ এবং ২০৬)

আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, শত্রুর শত্রু হচ্ছে মিত্র চাণক্যেরই একটি বচনÑঅর্থাৎ তার তত্ত্ব।

কিন্তু ঔপনিবেশিকতা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের সব ধারণাকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। ঔপনিবেশিকতার কারণে দেশ, অঞ্চল দখলই শুধু নয়, এর প্রভাব সুদূঢ়প্রসারী হয়ে দাঁড়ায়। ঔপনিবেশিকতার অপর অর্থ ‘অধীনতা’। অর্থাৎ কোনো ভূখণ্ড দখলই শুধু নয়, তার সম্পদ লুণ্ঠনই একমাত্র বিষয় নয়, পুরো জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে যে সমাজ, সংস্কৃতি হাজার বছর ধরে গড়ে উঠেছে, তাকে ধ্বংস করাও ঔপনিবেশিকতার উদ্দেশ্য। ঔপনিবেশিকতার কুফল সম্পর্কে ইতঃপূর্বেকার লেখাগুলোতে বিস্তর লেখালেখি করেছি। এই লেখায় এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন থাকলেও ভবিষ্যতে আরো লেখার ইচ্ছে রইল।

জনগণের ঐক্য হচ্ছেÑ‘যেকোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা সার্বভৌম ও স্বাধীনভাবে টিকে থাকার গ্যারান্টি’।

এই গ্যারান্টি টিকে থাকলেও উপনিবেশ-উত্তর বিশ্বব্যবস্থায় এখন এককালের উপনিবেশবাদের পরিবর্তে বিকল্প হিসেবে জন্ম নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদ অথবা নয়া উপনিবেশবাদ। আর এর ধরন-ধারণেও পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। ইউরোপের ফ্রান্স, ব্রিটেন, রাশিয়া, জার্মানি, তুরস্কের অটোম্যান সাম্রাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ কয়েকটি দেশের মধ্যে এই যুদ্ধ সীমিত ছিল। বিশ্বরাজনীতিক এবং রণকৌশলবিদরা তখন বলেছিলেন, ‘কিছু যুদ্ধ নিজেই তার নামকরণ করে। এটির নাম বিশ্বযুদ্ধ।’ এই যুদ্ধ ও সহিংসতা চিরতরে বন্ধে ১৯২০ সালের ১০ জানুয়ারি গঠিত হয়েছিল ‘লিগ অব ন্যাশনস’। আর এই সংস্থার তখন সদস্য সংখ্যা ছিল ৪১। উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ বন্ধ এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও ব্যবহার হ্রাস।

কিন্তু লিগ অব ন্যাশনস যুদ্ধ বা অস্ত্র প্রতিযোগিতা হ্রাস তো করতে পারেনি, উল্টো বিশ্বব্যবস্থা বা ওয়ার্ল্ড অর্ডারের ধারও কেউ ধারেনি। সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের বিস্তার যেমন ঘটেছে, তেমনি বেড়েছে অস্ত্র তৈরি এবং বিক্রির ঘটনা। বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনে আবার ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যায় ইতিহাসের ভয়াবহ ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’। যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া দেশের সংখ্যা বেড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে এই ভয়াবহতা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে এশিয়ায় ছোটখাটো কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তবে ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নতুন করে এক সংকটের সূচনা হয়, যার নাম শরণার্থী। যার ফলে তৎকালীন সময়ে একমাত্র ইউরোপীয় দেশগুলোতেই শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় চার কোটিরও বেশি। সব মিলিয়ে ইউরোপের বাইরেও প্রায় ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে না পড়লেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। ১৯৪৩ সালে ঔপনিবেশিকতার কুফল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুযোগসন্ধানী নীতির কারণে বাংলায় যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়, তাতে সরকারি হিসাবেই কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে।

এরপরই ১৯৪৫ সালে গঠিত হয় ইউনাইটেড ন্যাশনস বা জাতিসংঘ। এসব সংস্থা গঠিত হলেও যুদ্ধ কমে না, থামে না অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং বিক্রিও থেমে থাকে না। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য করা হচ্ছেÑজাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষার জন্য অস্ত্র ক্রয় প্রতিযোগিতায় Stockholm International Peace Research Institute (SIPIR)-এর এক হিসেবে দেখিয়েছে, ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়েই দুনিয়ার ১০০ প্রভাবশালী অস্ত্র বিক্রেতা কোম্পানি ৬৭৯ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে ওই সময়কালে। মাত্র এক বছরে অর্থাৎ ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অস্ত্র বিক্রি বেড়েছে বিশ্বব্যাপী ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১৫ থেকে ২০২৪-২৫ সময়ে অর্থাৎ মাত্র এক দশকে অস্ত্র বিক্রি বেড়েছে ২৬ শতাংশের বেশি। আর এই দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির হার বিশ্ব অস্ত্রবাজারের ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ মার্কিনিরাই প্রায় অর্ধেক অস্ত্রের বিক্রেতা দেশ। দুনিয়ার ১৬২টি দেশের মধ্যে মাত্র ছয়টি দেশ অর্থাৎ ইউক্রেন, ভারত, কাতার, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানই কিনেছে ৩৫ শতাংশ অস্ত্র। ভারতের হিসাবেই ১৯৯০ থেকে ২০২৪-২৫ সময়ে অস্ত্র ক্রয় বেড়েছে ১০ থেকে বেড়ে ৮১ বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তানও সাম্প্রতিককালে অস্ত্র ক্রয় বাড়িয়েছে।

রমরমা অস্ত্র ব্যবসাকে একটি ‘আন্তর্জাতিক চক্রান্ত’ ছাড়া কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। কারণ একদিকে অস্ত্র ক্রয় বাড়ছে এবং একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দারিদ্র্যের সংখ্যা ও হার। ভারতের কথাই যদি ধরা যায়, তাহলে দেখা যাবে, খাতাপত্রের হিসাবেই মাত্র সোয়া ২ ডলার দৈনিক আয়ের জনসংখ্যা, অর্থাৎ যাদের হতদরিদ্র বা চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেÑএমন কমপক্ষে ২০ কোটি মানুষের বসবাস ভারতে।

অথচ বিশ্বে এমন একটি দিন বাদ যাবে না যেদিন বিশ্বের কোথাও না কোথাও যুদ্ধ হচ্ছে না, মানুষ নিহত হচ্ছে না। শুধু গাজায় ২০২৩-এর ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের একই সময় পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা কম করে হলেও ২ লাখ ৩৬ হাজার। এটি গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব, যার মধ্যে সব মৃত্যুর হিসাব ইসরাইলি বাধার মুখে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। আরো হিসাব বলছে, ১৯৬০ থেকে এ পর্যন্ত গড়ে বছরে তিন লাখ করে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে যুদ্ধের কারণে। এ যেন যুদ্ধ নয়Ñমানুষ হত্যার কৌশল।

তথাকথিত ‘ওয়ার অন টেরর’-এর সন্ত্রাসী নিধনের নামে ২০০১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ৯৪ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষের তাৎক্ষণিক মৃত্যু হয়েছেÑইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া এবং পাকিস্তানে। আর এর প্রভাবে মৃত্যু এবং আহত ও পঙ্গু হওয়ার কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। এ ক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন, বর্তমানের যা পরিস্থিতি তাতে কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য স্যামুয়েল পি হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাস অব সিভিলাইজেশন’ বা ‘সভ্যতার সংকট’-এর মতো ভুয়াতত্ত্ব বা বয়ান তৈরির প্রয়োজন এখন আর পড়ে না। ক্ষুদ্রসহ যেকোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য এ এক নয়া সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

আর এ কারণেই নতুন এক প্রেক্ষাপট এবং দৃশ্যপট হাজির হয়েছে বিশ্বজুড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুধু তেল সম্পদ লুটের বাসনায় প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে উত্তর আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে ‘অপহরণ’ করতে পারেন, হুমকি দিতে পারেন ইরানকে। কিংবা গ্রিনল্যান্ড দখলের ঘোষণাও দিয়ে দেন বিনা বাধায়। এ জন্য কোনো তত্ত্ব বা বয়ান লাগে না। শক্তিমান বলেই এটা পারেন। আর এটাই নয়া উপনিবেশবাদ বা সাম্রাজ্যবাদ। এখানে বিশ্ব জনমত বা জাতিসংঘ অসহায়। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকাকে বলেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামরিক কার্যক্রম প্রতিটি দেশকেই অনেক বেশি নিরাপত্তাহীন করেছে। প্রতিক্রিয়া ব্যস এ পর্যন্তই শেষ। নিউ ইয়র্ক টাইমস ৩ জানুয়ারি ২০২৬ বিশেষ সম্পাদকীয়তে বলেছে, ‘ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ অবৈধ এবং অপরিণামদর্শী।’ ওয়াশিংটন পোস্টও এক সম্পাদকীয়তে ট্রাম্পের সমালোচনা করে। এ সম্পর্কে সংবাদমাধ্যম মনিটর করে এমন মার্কিন সংস্থা ‘ফেয়ার’ বলেছে, আশ্চর্যের বিষয়, আন্তর্জাতিক আইনকানুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অকার্যকর বলেই সংবাদমাধ্যমের সংবাদ প্রকাশে মনে হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, একইভাবে পানামার সাবেক শাসক নরিয়েগাকেও ১৯৯০-এর ৩ জানুয়ারি আটক করা হয়েছিল। ১৯৮৩ সালে প্রেসিডেন্ট রিগ্যান গ্রানাডা দখল করেছিলেন।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমেরিকার ট্রাম্পনীতি তাদের ঐতিহাসিক মনরো ডকট্রিনকেও হার মানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ১৮২৩ সালে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আমেরিকা আমেরিকানদের জন্য অর্থাৎ কোনো ইউরোপীয় শক্তি ওইদিকে হাত বাড়াতে পারবে না। এই নীতির অর্থাৎ ডকট্রিনের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে লাতিন এবং পুরো আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলোর ওপরে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদকে প্রতিষ্ঠার কথাই বলা হয়েছিল। ট্রাম্প যদিও ঘোষণাটুকু বাকি রেখে পুরো বিশ্বব্যবস্থার ওপর তার কর্তৃত্ব স্থাপনের নীতি মনরো ডকট্রিনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পুলিশি ব্যবস্থা আবার দেখা দিয়েছে।

কাজেই নয়া বিশ্বব্যবস্থার (New World Order)-এর যে কথা এতদিন পশ্চিমা দুনিয়া আমাদের বয়ান হিসেবে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে, সেই তারাই এখন অনিবার্য এক পরিণতি অর্থাৎ নিজেরাই সুগভীর এক সংকটে পড়েছে। তাদের বিশ্বব্যবস্থার কর্তৃত্ব নিয়েই নিজেরা পরস্পরের এখন মুখোমুখি। গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে পুরো ইউরোপ।

এই অবস্থায় আসলে ক্ষুদ্ররাষ্ট্র বলে পশ্চিমা নয়া উপনিবেশবাদী অর্থাৎ সাম্রাজ্য বিস্তারে লোভীরা যে ‘হীনম্মন্যতার তত্ত্ব’ ফেরি করছিল, সে ব্যবস্থাও আসলে ভেঙে পড়েছে।

বাস্তবে বর্তমান দিনগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ক্ষুদ্ররাষ্ট্র বলে কিছুই নেই। যে রাষ্ট্র তার নিজস্ব সার্বভৌমত্ব যথাযথভাবে রক্ষার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষাকে জন অংশীদারত্বমূলক বন্দোবস্তের আওতায় নিয়ে আসতে পারছে; সে রাষ্ট্র কোনোভাবেই আসলে ক্ষুদ্ররাষ্ট্র নয়। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে, দেশের সার্বভৌমত্বের প্রধান অঙ্গ প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, নীতিকৌশল নেই অথবা খুবই অস্পষ্ট। এ ক্ষেত্রে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কর্মসূচি থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। এখানেও ওই হীনম্মন্যতার অনুভূতি এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির পরিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। অথচ আমরা পেরেছি এবং পারবÑএমন কর্মপরিকল্পনা এবং বয়ান তৈরির কাজটি করতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সুশীল সমাজ, কথিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি বরাবরই পুরোপুরি নেতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে এবং এখনো করছে। অথচ আমাদেরই ইতিহাসে আমাদের জন্য ১৯৭১ এবং ২০২৪-এর ভিন্ন শিক্ষা দেয় যে, সাধারণ মানুষই পারে এবং পেরেছে। আর জনবিচ্ছিন্ন ওই শ্রেণিগুলো সাধারণ মানুষকে বিপথগামী এবং বিপদগামী করছে ও করেছে। তারা ‘এক বন্ধু’ নীতিতে নতজানু। অথচ প্রকৃত স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবেÑবন্ধুত্ব হতে হবে সমতার ভিত্তিতে সমমনোভাবাপন্ন এক বা একাধিক দেশের সঙ্গে। এ কারণে পছন্দমতো জোটবদ্ধতা অথবা দ্বিপক্ষীয়-ত্রিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং প্রতিরক্ষাবলয় গড়ে উঠছে, নতুন মডেল হিসেবে।

বাংলাদেশকে হতে হবে যাকে হেনরি কিসিঞ্জার বলেছেন, ‘ভিয়েতনাম সিনড্রোমের’ অনুসারী। ভিয়েতনাম সিনড্রোমের অর্থ হচ্ছে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের পর এর নীতিনির্ধারকরা ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরাজয় থেকে সৃষ্ট ভয়, দ্বিধা এবং পরাজয়ের প্রাপ্ত যে শিক্ষা পেয়েছিলেন, তা তারা সারাজীবন মনে রাখবেন। এছাড়া বাংলাদেশ বর্তমান বাস্তবতায় সিঙ্গাপুরের ‘Poisonous Shrimp Doctrine’ বা বিষাক্ত চিংড়ি নীতিকৌশল গ্রহণ করতে পারে। বিষাক্ত চিংড়ি হচ্ছে সাগরে খুব ছোট সাইজের এক ধরনের চিংড়ি রয়েছে, যার পুরোটাই বিষাক্ত। সব বড় বড় মাছ ওই বিশেষ প্রজাতির চিংড়িকে ভয় পেয়ে ভুলেও খায় না, খেলেই মৃত্যু।

বাংলাদেশের জন্য ভিয়েতনাম সিনড্রোম অথবা বিষাক্ত চিংড়ি ডকট্রিন অনুসরণ করার মতো অথবা আরো উন্নতর পরিকল্পনা গ্রহণ করার নতুন প্রতিরক্ষা বন্দোবস্ত, অর্থাৎ স্বাধীন-সার্বভৌম নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের এখনই সময়।

লেখক : গবেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন