আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বাংলাদেশপন্থা ধারণার দরকার হলো কেন

ফারুক ওয়াসিফ

বাংলাদেশপন্থা ধারণার দরকার হলো কেন

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের জনগণের নজরকাড়া একটা বৈশিষ্ট্য আছে। এখানকার যত জাতি, ভাষা, ধর্ম ও পরিচয় আছে; তাদের সবার একটা গড় বৈশিষ্ট্য আছে। যে ধর্মের বা জাতির বা ভাষার মানুষই হন না কেন, সন্তান ঘিরে পারিবারিক গঠন, মূল্যবোধ, খাদ্যরুচি, জীবনের স্বপ্ন, পোশাক-আশাক, ঘরবাড়ি-প্রতিবেশিতা, বিয়ে-শাদি মোটামুটি এক। সবার সঙ্গে সবার কিছু কমন বা এজমালি মিল আছে, কমন ইন্টারসেকশন আছে। এমনকি বাংলাদেশিদের মধ্যে বর্ণবাদের আছর উপমহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে কম। বাংলাদেশি হিন্দুরা ভারতীয় হিন্দুদের চেয়ে উদার। এখানে বর্ণাশ্রম প্রথা ঠিকমতো শেকড় গাড়তে পারেনি বলে এখনো নিম্নবর্গীয় হিন্দুরাই বেশি। বাংলাদেশের বৌদ্ধরা মিয়ানমারের বৌদ্ধদের মতো জাতিবাদী কিংবা থেরাভেদা বুদ্ধিজমের মতো উগ্র না।

বিজ্ঞাপন

আমরা সবাই-ই মোটামুটি একই ধরনের ভাত-সালুন খাই। খাদ্যের দু-একটি পদ বাদে বাকিসবেতেও বেজায় মিল। এই মিল গড়ে উঠেছে হাজার বছর ধরে, বিশেষ করে সুলতানি আমলে কৃষি ও বাণিজ্য বিপ্লবের মধ্য দিয়ে, নয়া আবাদ প্রতিষ্ঠায় হরেক জাতিধর্মের মিলনে। আমাদের সীমান্তের ওপার থেকেই শুরু হয়েছে গমের রাজত্ব-এটাও একটা ঘটনা কিন্তু।

এই মিলনের দুই রূপ : লাল সালু প্যাঁচানো ডেকচি আর কাঁধে কাঁধে কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ ও পূজা, মেলা ও মিছিল। পীরের দরবারে বা মাজারে এক ডেকচিতে সবার জন্য শিন্নি বা খিচুড়ি রান্না হতো, সেই খাবার উঁচা-নিচা সবাই খাইত। এর মধ্যে সমতার আদল ও আকল কায়েম হতো। তারই জের দেখা যাবে এখনকার মেজবান, ওরস ও জিয়াফতের খানায়। এলাকায় এলাকায় এজমালি জমি ও প্রতিষ্ঠান ছিল।

কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে না দাঁড়ালে নাকি দুজনের ফাঁকে শয়তান ঢুকে পড়ে, সে জন্য নামাজে ও জানাজায় সবাই সবাইকে ছোঁয়াছুঁয়ির মধ্যে থাকে। এ ঘটনা আস্পৃশ্যকে, অশুচিতার ধারণাকে নড়বড়ে করে দেয়। তেমনি বানের টানে ভাঙা বাঁধ মেরামতেও সবাই কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে নেমে পড়ে। ডাকাত তাড়ায় একসঙ্গে। গ্রামে এজমালি কাজে যৌথ শ্রমের রেওয়াজ এখনো আছে। জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচি সফল হয়েছে এই এজমালি শ্রমদানের উৎসবের খাতিরেই। পশ্চিম বাংলার এক আমলা স্মৃতিকথায় বলেছিলেন, সে সময় তারা সীমান্তের ওপার থেকে এই দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখতেন।

সত্যিই যদি আস্পৃশ্য থাকত, তাহলে এই যে শ্রমঘন পোশাকশিল্প দাঁড়াতে পারতে? এমনকি গণঅভ্যুত্থানে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে লড়াই জমত? একজনের লাশ আরেকজনে বহন করত? মুগ্ধের হাতের পানি কি আরেক জাত-বর্ণের তরুণ-তরুণী খেত?

আমাদের যে ফোকলোর ও লোকগানের জগৎ, সেটাও কিন্তু মধ্যযুগেই তৈরি হয়েছে। তাতেও গরিব ও সতলোকের বিজয় দেখানো হয়েছে, বলা হয়েছে মিলনের কথা। আমাদের তাঁতি বা জোলাদের মধ্য থেকে এসেছেন অজস্র মহাপুরুষ। সিরাজ সাঁই ও লালন সাঁইয়ের জাত না থাকলেও তারা কিন্তু তাঁতি-সমাজেরই নায়ক। ফকিরি ধারা, পীর-দরবেশের ধারা বস্তুবাদী নয়, মরমিবাদী। এই মরমিয়া মনের প্রধান শক্তি হলো ‘মায়া’। সংস্কৃত ভাষায় এবং বৈদিক জগতে মায়া হলো বিভ্রম। আর বাংলাদেশের কৃষ্টির গোড়া যেই কৃষি জগতে, সেখান থেকে উঠে আসা মায়া মানে মরমের টান, ভালোবাসা, মাটি ও মানুষের জন্য মন পোড়ানো আবেগ।

আমাদের দেশবোধ বীররসে গড়া নয়, মায়ার ভিয়েনে ভেজানো। জাতীয় সংগীত সে কারণেই সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এ জন্যই মায়াবাস্তবতার মধ্য থেকে উঠে আসেন একজন জীবনানন্দ দাশ। যার কবিতা ওপার বাংলার কবিতা থেকে আলাদা স্বরের। যেমন লালনের অচিন পাখিই জীবনানন্দ দাশে ফিরে আসে প্রকৃত সারস হয়ে, সন্ধ্যার হাঁস হয়ে। দারুণ মজার ব্যাপার আসলে। জীবনানন্দের ভাষা ও জগৎ পঞ্চ কবিদের তুলনায় বেশিটা পূর্ববাঙালীয়। পশ্চিমের দেবজ্ঞানে পূজিত ঠাকুর পুবে হয়ে যান ভালোবাসার রবি। দেশ এখানে দেবী নয়, আদরের কন্যার মতো মায়াবী।

বাঙালি কথাটাই ধরেন। বাঙালিত্ব থেকে মুসলমানকে বাদ দিলে থাকে নিরেট হিন্দুত্ব। বাঙালি—মুসলমান=হিন্দু। উনিশ শতকের ভুল চিন্তকেরা বাঙালি-মুসলমান দ্বন্দ্ব সমাস কল্পনা করেছেন। আসলে বাঙালি মুসলমান হলো হিন্দু ও মুসলিম বাঙালির মিলনাত্বক সমাস। মুসলমান বিনা তাই বাঙালি নেই। এই বাংলা ভাষা ও বাঙাল পরিচয় সুলতানি বাংলার সৃষ্টি। বাংলাদেশপন্থার মধ্যে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মধ্যে, জুলাইয়ের আত্মদান ও শহীদানের মধ্যেও এই মিলনবাদিতা আছে বা ছিল।

এ এক অদ্ভুত দেশ। এখানে অনেকে একই সঙ্গে সেক্যুলার হতেও ভয় পায় আবার সাম্প্রদায়িক হতেও আপত্তি। এ এমন এক দেশ, যেখানে একজন দাড়ি-টুপিওয়ালা মওলানা ভাসানী হয়ে ওঠেন হিন্দু-মুসলিম সবার আইকন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য আর মুসলমানি পুঁথির মিলনে গড়া এই ভাষায় সব ধর্মের ছাপ আছে। ভাষা তাই সেক্যুলার হয় না, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক হয়। এখানে ভাষা আন্দোলনের মহিমার নাম দেওয়া হয় আরবি-ফারসি শব্দের ‘শহীদ মিনার’।

এ আরেক অদ্ভুত দেশ, যেখানে কন্যা জননী জয়িতা হলো দেশ কিন্তু নারীর সবল ভূমিকার ইতিহাস সংস্কৃতিতে উপেক্ষিত, কিন্তু কৃষ্টি-কালচারে তা হাজির। খালেদা জিয়ার জন্য নীরব জনতার শোকের গণঅভ্যুত্থান তা আমাদের জানিয়ে গেল। খনা আর রোকেয়া দুই বোন যেখানে, সেখানে তসলিমা নাসরীন এক হিংসুটে সেক্সিস্ট দালাল। এখানে ফেলানীর জন্য সবাই এক, তবু কন্যাসন্তান বৈষম্যের শিকার। কাজলরেখা আর সুয়ো রানির গল্প এই জনতা তবু বিশ্বাস করে। স্ববিযোধিতা যেকোনো রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়ক রসায়ন। সেই রূপায়ণে প্রধান জাতীয় উপাদানটা নারীমুখী।

বাংলাদেশের মুসলমানদের বড় অংশের মধ্যে সেক্যুলারিজম নিয়ে সংশয় কিংবা ভয় আছে। কিন্তু ভাষার প্রশ্নে, জাতিবোধের প্রশ্নে এই মানুষ কিন্তু খাঁটি বাঙাল। আমাদের ইতিহাসে ধর্মনিপীড়ক ছিল না পশ্চিম ইউরোপের মতো, ছিল মুক্তির সহযোগী। তিতুমীর থেকে ফরায়েজি আন্দোলন হয়ে জমিদারবিরোধী পাকিস্তান মুভমেন্টের কর্মীদের থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে ধর্ম ভালোভাবেই গাঁথা ছিল। খুবই অদ্ভুত যে, নাস্তিক জিন্নাহ আর রব্বুনিয়াতবাদী আবুল হাশিম একই পার্টিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যেমনটা ছিলেন বাঙালি মুসলিম মুজিব এবং কমিউনিস্ট ধারার তাজউদ্দীন।

মুক্তিযুদ্ধকে ধর্মের বিপক্ষে দেখানোটা যে ভুল, সেটা আমরা অনেক আগেই দেখিয়ে দিয়েছি। সে সময়ের দলিল-চিঠিপত্র, দল বেঁধে নামাজ পড়ার দৃশ্যে এর প্রমাণ আছে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের রণধ্বনিতে ‘আল্লাহু আকবর’ও শোনা যায়। এই মানুষ ধর্মভীরু কিন্তু সাম্প্রদায়িক নয়। জিজ্ঞেস করলে সে যা বলবে, তাতে দেখবেন, আপন সম্প্রদায়ের প্রতি ভালোবাসা আছে, কিন্তু অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা কম (সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশের ভূমিকার কারণে কিছুটা ঘৃণা-বিদ্বেষ যদিও বেড়েছে বলে আমার ধারণা)। সাঁথিয়ায় হিন্দুপাড়ায় রাজনৈতিক সহিংসতার পর সেখানকার এক মুসলমান কৃষক চায়ের দোকানে বসে আমাকে বলেছিলেন, ‘৩৬ জাতি ছাড়া দ্যাশ হয়’? বাঙালি হিন্দু সমাজের ছত্রিশ জাতির ধারণা এভাবেই তিনি হাসিল করে নিয়েছেন।

আমাদের ষাটের দশকের আন্দোলনের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল না, ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। ৭২-এর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে অসাম্প্রদায়িকতা থাকলে আর রাষ্ট্রধর্ম প্রকল্প হয়তো সফল হতো না। এখানে কোনো নেতা সাম্প্রদায়িক স্লোগান দিয়ে ভোটে জিতবেন না। বরং জনসমাজ তাকে লজ্জা দেবে।

বাংলাদেশপন্থা কথাটার মধ্যে জাতীয়তাবাদের যে সামান্য ঝোঁক, সেটা আমাদের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার জন্যই থেকে যাবে। কারণ তিনদিকে ‘খেয়ে ফেলবে’ বলা ওনারা আর ওইদিকে মিয়ানমারের নেতাদের হুমকি। এসব হুমকি অপসারিত হলে আমরাও একদিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো স্বার্থ বজায় রাখার মিতালি পাতাব।

বাংলাদেশপন্থা কথাটার দরকার আরেকটা কারণে। আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থকে বৈদেশবিরোধিতার রূপ থেকে সরাতে চাই। অ্যান্টি-ইন/ডিয়ান, অ্যান্টি-পাকিস্তানি বা অ্যান্টি-আমেরিকান কোনো রাজনীতির পরিচয় হতে পারে না। এসবই বরং সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিবাদকে উসকে দেয়। আমাদের রাজনীতি হোক প্রো—মানে ইতিবাচক। নেগেটিভিটি কখনো জয়ী হয় না। এ কারণে আমরা ইতিহাসের এই পর্বটা বাংলাদেশপন্থায় থাকতে চাই, এর আগের দুটি পর্বে যেমন বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ডমিন্যান্ট ছিল।

বাংলাদেশপন্থা হলো সংস্কৃতি ও রাজনীতির মিলনবিন্দু। যেমন : বাংলাদেশটাও এক বহুজাতির মেল্টিং পট বা সত্যিকার গাজরের হালুয়া। আমেরিকা-ইউরোপে বুহুত্ববাদ দরকার, কারণ সেখানে জাতিবর্ণে সত্যিকার মিলন হয়নি। তাদেরটা হালুয়া না, বারোমিশালি সবজি খিচুড়ি, যেখানে প্রত্যেকটা উপাদান আলাদা আলাদা করে চ্যালচেলায়া চায়া থাকে। আমাদেরটার নাম তাই বহুত্ববাদ না বলাই ভালো। তাছাড়া বহুত্ববাদ বললে অনেকে আবার ধর্মীয় একত্ববাদ নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান। তাই মাল্টিকালচারালিজমের বাংলা বহুত্ববাদ করা ঠিক হয় না, একে বরং বলা যায় এজমালি বা সমবায়ী বা যৌথ সংস্কৃতি।

বাংলাদেশপন্থা ১৭৫৭, ১৮৫৭, ১৯৩৫-৩৬, ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯১ এবং ২০২৪ সবাইকেই ধারণ করে। সুতরাং এর দাবি আপনি কীভাবে অস্বীকার করবেন।

এই যে চাল-চলন ও আচার-ব্যবহারে এজমালি মিলের সমাজ। এটাই বাংলাদেশি সমাজের শক্তি। এই মিলনের মোহনায় শামিল হওয়াকেই আমরা বলতে চাইছি বাংলাদেশপন্থা।

লেখক: মহাপরিচালক, পিআইবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...