আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

পাতানো নির্বাচনের শঙ্কা ও গণভোটে ঘনঘটা

এম আবদুল্লাহ

পাতানো নির্বাচনের শঙ্কা ও গণভোটে ঘনঘটা
এম আবদুল্লাহ

জুলাই সনদ আলোচনায় নেই অনেক দিন ধরেই। আর সেই সনদে থাকা রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে সাংবিধানিক রূপ দিতে যে গণভোটের আয়োজন চলছে, তার ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ ও হতাশা রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ মহলে। আমার দেশ-এর এক শীর্ষ সংবাদে গণভোট প্রশ্নে রাজনৈতিক নেতৃত্বে নির্লিপ্ততা ও একধরনের উপেক্ষা সরকারকে হতাশ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমে গণভোট নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা তার প্রতিটি বক্তব্যে এ বিষয়ে জোর দিচ্ছেন। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ভবিষ্যতে যারা এ দেশ পরিচালনা করবেন, তারা যেন আর কখনোই ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতেই এবারের গণভোট। নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনকেও গণভোট নিয়ে মাঠে নামতে হবে। তিনি আরো যোগ করে বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট নিয়ে জনগণকে বোঝানোর কাজটি শুধু অন্তর্বর্তী সরকার করতে গেলে অনেক কথা উঠবে।

শুক্রবার দিনাজপুরে এক বক্তব্যে সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক, সেতু ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, আগামী নির্বাচন ৫০ বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। এটি পাঁচ বছরের জন্য নয়। কারণ এ নির্বাচনে একটি গণভোট হচ্ছে। উপদেষ্টা বলেন, ‘গণভোটে চারটি প্রশ্ন আছে। সব কটি প্রশ্ন আমরা একটা প্যাকেজ হিসেবে দিয়েছি। যদি দেশে সংস্কার চান, তাহলে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন। সংস্কার না চাইলে ‘না’ ভোট দেবেন। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে বিভিন্ন সংস্কার বাস্তবায়িত হবে।’

বিজ্ঞাপন

প্রসঙ্গত, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট আয়োজনের উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তী সরকার দুটি আইন ঘোষণা করেছে। একটি রাষ্ট্রপতির নামে আদেশ, আরেকটি অধ্যাদেশ। ১৩ নভেম্বর জারি করা হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’। ২৫ নভেম্বর জারি করা হয় ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’।

গণভোট নিয়ে তৃণমূল বিএনপিতে একধরনের বিভ্রান্তি আছে বলে মনে হচ্ছে। একাধিক ভাইরাল ভিডিও ফুটেজে দলটির মাঠ পর্যায়ের নেতারা গণভোটে ‘না’ সূচক রায় দেওয়ার আহ্বান জানাতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে নানা পোস্ট ও কমেন্টে বিএনপির নেতাকর্মীদের গণভোট প্রশ্নে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে গণভোটের ফলাফল নিয়ে শঙ্কা ও দুশ্চিন্তার ঘনঘটা দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। নিন্দুকেরা বিএনপিকে অভিযুক্ত করে বলছে, ক্ষমতায় গেলে তারা যে কোনো সংস্কারই করবে না, তার প্রমাণ গণভোটে ‘না’ ভোট দিতে তৃণমূল নেতাদের আহ্বান। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে শুক্রবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার কোনো কারণ নেই। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, বিএনপিই সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে চেয়েছে এবং আগে থেকেই বিএনপি সংস্কারের পক্ষে, যা চলমান প্রক্রিয়া। সাম্প্রতিক সময়ে গণভোটের প্রশ্নে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে এটিই সম্ভবত প্রথম বক্তব্য, যাতে দলটির অবস্থান জানানো হয়েছে। তবে সেই অবস্থান অতটা শক্তিশালী নয়। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনার প্রত্যাশা করছেন অনেকে।

সমস্যা হচ্ছে, সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে দেশের প্রান্তিক জনগণের মধ্যে যতটা প্রচার-প্রচারণা চলছে, তার ছিটেফোঁটাও গণভোট প্রশ্নে নেই। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনি প্রচারাভিযানে গণভোটের ইস্যুটি সামনে না আনলে এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের নিস্পৃহ মনোভাবের পরিবর্তন আশা করা যায় না। জামায়াত ইতোমধ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ রায় দেওয়ার জন্য ক্যাম্পেইন শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। জামায়াতের জোটসঙ্গী এনসিপি এবং এবি পার্টিও ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। তবে বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি সর্বোতভাবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জন্য মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা না দিলে ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে শঙ্কা কাটবে না।

অনেকে বলতে চাইছেন, জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে বিএনপি একমত হয়নি সেসব সংস্কারও গণভোটে যুক্ত করায় বিএনপি প্যাকেজে ‘হ্যাঁ’ জানাতে দ্বিধাগ্রস্ত। এ বক্তব্য অজ্ঞতাপ্রসূত। বাস্তবে গণভোটে যে চারটি পয়েন্টে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে বলা হয়েছে, তাতে উল্লেখ আছে—যেসব সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে সেগুলোর বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। ফলে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া ইস্যুগুলো বাস্তবায়নে তাদের ওপর বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে, এমনটা নয়। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান কোনো রাজনৈতিক দল ‘না’ ভোট দিয়েছে বলে প্রমাণিত হলে ক্ষমতায় গিয়েও তাদের জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখভাগে থাকা ছাত্র-জনতার অসন্তোষ ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। ধরা যাক, একটি দল কোনো আসনে তাদের প্রতীকে দুই লাখ ভোট পেয়েছে, কিন্তু সেই আসনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে এক লাখ। তাহলে অনায়াসেই প্রমাণিত হবে ওই দলের ভোটাররা সবাই ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়নি। এতে সংস্কার প্রশ্নে সেই দলের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

এবার আসা যাক, ‘আরেকটি পাতানো নির্বাচন’-এর আশঙ্কা প্রসঙ্গে। ভোটের দায়িত্বে থাকা ‘দলীয়’ ডিসি-এসপিদের অপসারণের দাবি তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী । বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করে জামায়াতের পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়েছে। জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. তাহের সাংবাদিকদের জানান, আরেকটি পাতানো নির্বাচনের পাঁয়তারা দেখছেন তারা। নির্বাচনের প্রার্থিতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য লক্ষ করছেন। প্রশাসনের সিদ্ধান্তেও ভিন্নতা দেখেছেন। দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে একযাত্রায় দুই ফল হতে দেখেছেন। কোথাও নমিনেশন গ্রহণ করা হয়েছে, আবার কোথাও বাতিল করা হয়েছে। ডা. তাহের বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় দলীয় ডিসি নিয়োগ করা হয়েছে। সেই দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁরা দেখেছেন’। এসব ডিসি ও এসপিকে অপসারণ করে নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগের দাবি করে বলেন, ‘আমরা পর্যবেক্ষণ করে তালিকা দেব। প্রমাণ সংগ্রহ করছি’। অন্য এক বক্তব্যে ডা. তাহের নিরাপত্তা ও প্রটোকলের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ করেন।

জামায়াত নেতার বর্ণিত বক্তব্যে দুটি দিক রয়েছে। এক. তারা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনরত জেলা পর্যায়ের মুখ্য দুই কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে অনাস্থা এবং পাতানো নির্বাচনের শঙ্কা জানিয়েছেন এবং বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে তাদের পরিবর্তন চেয়েছেন। দুই. নির্বাচনকালে তারেক রহমানের সমপর্যায়ের নিরাপত্তা চেয়েছেন। তাদের এ দাবির পরদিন মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন চাইলে ডিসি-এসপি পর্যায়ে পরিবর্তনের ব্যবস্থা নেবেন তারা।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে ৬৪৫টি আপিল জমা পড়েছে। এগুলো শুনানি করে নিষ্পত্তি করতে হবে কমিশনকে। রিটার্নিং কর্মকর্তার যাচাই-বাছাই শেষে বিএনপি মনোনীত তিনজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এছাড়া বিএনপি প্রার্থী দাবি করে দাখিল করা আরো ২২ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে দলীয় মনোনয়নের চিঠি যুক্ত না করার কারণে। জামায়াত প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ২৭৬ আসনে। এদের মধ্যে ৯ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। এসব আসনে জামায়াতের বিকল্প প্রার্থীও নেই বলে জানা গেছে। এতে করে জামায়াতের ক্ষোভের মাত্রাটা একটু বেশি।

সবচেয়ে বেশি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে জাতীয় পার্টির। প্রাথমিক তথ্য বলছে, জাতীয় পার্টির ৫৯ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র রিটার্নিং অফিসারের যাচাইয়ে টেকেনি। এর কারণ হচ্ছে, নিবন্ধিত জাতীয় পার্টির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে জিএম কাদেরের হাতে। তাঁর দলের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীর চিঠিসহ যারা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তাদেরটা টিকেছে। বাতিল হয়েছে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মনোনীতদের। দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের। ২৬৬ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল দলটি। এর মধ্যে ৩৯ জনের প্রার্থিতা যাচাইয়ে টেকেনি। আর এনসিপি ৪৪ আসনে প্রার্থী দিয়ে তিনটি টেকাতে পারেনি। জামায়াত ছাড়া নির্বাচনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ তুলেছে এনসিপি। তারা বলছে, নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা একটি দলের পক্ষে কাজ করছে। নাম না বললেও তারা যে বিএনপির দিকে আঙুল তুলছে তা উল্লেখ করা বাহুল্য।

সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের লটারির মাধ্যমে রদবদল করার দাবি জানিয়েছিল জামায়াত। অন্তর্বর্তী সরকার সে পদ্ধতিতেই পুলিশ সুপার (এসপি) নিয়োগ দিয়েছে। তবে জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রচলিত পদ্ধতিতে ফিট লিস্ট তৈরির মাধ্যমে। টানা প্রায় দুই দশক ক্ষমতায় না থাকায় মাঠ প্রশাসনে আওয়ামী লীগের পছন্দের কর্মকর্তার বাইরে ছিল না বললেই চলে। বর্তমান সরকার কয়েক দফায় পদোন্নতি, নেতিবাচক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আটকে থাকাদের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে বিগত সময়ে বঞ্চিত অনেককে দায়িত্ব দিয়েছেন। জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়িতদের বেশিরভাগই ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তা। এ ব্যাচকে বিএনপি-জামায়াতের আস্থাভাজন হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত।

দলীয় আনুগত্যের বিবেচনায় নির্বাচনি প্রশাসন নিয়োগের অভিযোগটি একপক্ষীয় নয়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রশাসন দখলের অভিযোগ তুলে আসছে। সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বিদায়ের আগে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, প্রশাসনের ৬০ শতাংশ বিএনপি, ৩০ শতাংশ জামায়াত দখল করে নিয়েছে। কীসের ভিত্তিতে এ পার্সেন্টেজ করেছেন, তা তিনি ভালো বলতে পারবেন। পদাধিকার বলে তিনি প্রশাসনে বদলি ও পদায়ন সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন।

অবশ্য আওয়মী লীগ আমলে বিতর্কিতভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সবাইকে বাদ দিয়ে নির্বাচনি প্রশাসন সাজানোর মতো কর্মকর্তা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আর নিয়োগ পদায়নের ক্ষেত্রে বিএনপি ও জামায়াত দুদলই যে লবিং-তদবির করেছে, তা ওপেন সিক্রেট। গত ৫৪ বছরে রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি। জামায়াত বিএনপির সরকারে এক মেয়াদে পার্টনার হয়েছিল। স্বভাবতই তিন দলের প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মকর্তার সংখ্যাই বেশি। আওয়ামী লীগের অনুগত আমলাদের বিকল্প খুঁজতে গেলেই বিএনপি আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত বা আস্থাভাজনদের বিবেচনায় নিতে হয়। জামায়াতও কৌশলে তাদের কিছু জনশক্তিকে প্রশাসনে নিয়োগের সুযোগ নিয়েছে বিভিন্ন সরকারের আমলে। সে সংখ্যা বিএনপির সমান, এমনকি কাছাকাছি হওয়ারও কথা নয়। আর পেশাদার ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তার সংখ্যা হাতেগোনা। কারণ দলীয় আশীর্বাদ না থাকলে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে পদায়িত হওয়া খুবই কঠিন।

প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারাও ভোটার। তারা জাতীয় নির্বাচনে কোনো না কোনো মার্কায় ভোট দেন। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো একটির মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়েই এ ভোট দিয়ে থাকেন। অতএব মতাদর্শগত দিক থেকে কেউই নিরপেক্ষ নন। কিন্তু চাকরি সূত্রে তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার কথা। ব্যক্তি বা দলের প্রতি অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের পক্ষে কাজ করার জন্যে তারা শপথ বা অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় তা তারা করেন না বা করতে পারেন না। বিগত ১৫ বছরে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আওয়ামী লীগের সরকারি শাখার নেতা-কর্মীতে পরিণত করা হয়েছিল। এটা আওয়ামী লীগের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার নীলনকশার অংশ হিসেবেই করা হয়েছিল।

বিসিএস পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দিয়ে, মৌখিক পরীক্ষায় দলীয় বিবেচনায় নম্বর দিয়ে এবং গোয়েন্দা তদন্তের নামে চৌদ্দ পুরুষের রক্ত পরীক্ষা করে ছাত্রলীগ-যুবলীগের ক্যাডারদের চাকরি দেওয়া হয়েছে। একসময় মরহুম এইচটি ইমাম এক্ষেত্রে মূল সমন্বকের ভূমিকা পালন করেন। তিনি তালিকা চূড়ান্ত করে যেভাবে পাঠাতেন, সেভাবেই নিয়োগ হতো। এটা দু-একবার মুখ ফসকে তিনি প্রকাশ্যে বলেও ফেলেছিলেন। শেষ জীবনে বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা ধ্বংসে তার ভূমিকা অনবদ্য। ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে তার ‘সৃজনশীল প্রতিভা’ দিয়ে জনগণের ভোটাধিকার হরণের অভিনব সব পদ্ধতি উপহার দিয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে আগে থেকে ফলাফল তৈরি করে রাখার ব্যবস্থাও হয়েছিল।

শেখ হাসিনার খায়েশ মেটাতে হেন নির্বাচনি অপকর্ম নেই, যা এইচটি ইমামের তত্ত্বাবধানে হয়নি। জয়পরাজয় নিশ্চিত হতো তার টেবিলে। অনেক হেভিওয়েট আওয়ামী লীগারও তাকে তুষ্ট করে নির্বাচনি বৈতরণী পার হয়েছে। ২০২৪ সালে এইচটি ইমামের ‘নির্বাচনি মডেল’কে ঈষৎ পরিবর্তন করে কুখ্যাত ‘আমি-ডামি’র নির্বাচনে প্রশাসনকে ন্যক্কারজনকভাবে ব্যবহারে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন তারই যোগ্য শিষ্য দলবাজ মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার। অর্থাৎ চারটি নির্বাচনই আগে থেকে ফলাফল নির্ধারিত বা পাতানো ছিল। এবারের নির্বাচন সে ধরনের পাতানো হওয়ার আশঙ্কা কীভাবে দেখছে জামায়াত তা আরো সুনির্দিষ্ট ও খোলাসা করলে ভালো হয়।

অতীতের দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের মতোই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনি প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে। আরপিও সংশোধন করে নির্বাচনি দায়িত্বে গাফিলতি, শৈথল্য বা অনিয়মে যুক্ত হলে কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করেছে। সরকার ‘ইতিহাস সেরা’ নির্বাচন উপহারের অঙ্গীকার করেছে। অতএব নির্বাচনি কর্মকর্তারা একেবারে কোনো দলের পক্ষে প্রকাশ্যে ঝুঁকে পড়লে তাকে অবশ্য শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। তবে ভবিষ্যতে পুরস্কৃত হওয়ার নেশায় বা প্রলোভনে কেউ অতিউৎসাহী হলে তা ভিন্নকথা। অতীতে অতিউৎসাহী বহু দুর্বিনীত কর্মকর্তার দেখা মিলেছে। শেষ পর্যন্ত তাদের অনেককে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। নতুন বাংলাদেশে জনপ্রশাসন দেশের স্থিতিশীলতা ও টেকসই গণতন্ত্রকে প্রাধান্য দিয়ে অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে থেকে সততা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখবে, সেটাই কাম্য।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...