আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

গণভোট ২০২৬: সংস্কারের পথে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন

আমার দেশ অনলাইন

গণভোট ২০২৬: সংস্কারের পথে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন
প্রতীকী ছবি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের এককেন্দ্রিক শাসনের অবসান ঘটেছে। ফ্যাসিবাদী শাসন, দমন-পীড়ন, গুম-খুন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণ ক্ষোভ ফেটে পড়ে। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সংস্কার কমিশন গঠন করে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফসল ‘জুলাই জাতীয় সনদ’।

এই সনদের বাস্তবায়নের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সাংবিধানিক গণভোট, যা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একসঙ্গে হবে। ভোটাররা দুটি ব্যালট পাবেন—একটি সাংসদ নির্বাচনে, অন্যটি সনদ বাস্তবায়নের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে।

বিজ্ঞাপন

কেন এই গণভোট প্রয়োজন হলো?

হাসিনা আমলে সংবিধানের একাধিক সংশোধনী করে ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত করা হয়। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন দলীয়করণের শিকার হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল, একতরফা নির্বাচন—এসব জনগণের অধিকার কেড়ে নেয়। জুলাই সনদ এই ব্যবস্থা ভাঙতে চায়। সংসদ, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা, নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ—এগুলোর মূল লক্ষ্য। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ ও রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিু্র্রতে ৩০টি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, যা বিজয়ী দলগুলোর জন্য বাস্তবায়ন হবে বাধ্যতামূলক।

গণভোটের প্রধান বিষয়গুলো কী?

জুলাই সনদের মূল সংস্কারগুলো হলো: দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ: নিম্নকক্ষের পাশাপাশি ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন, যা দলগুলোর জাতীয় নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে হবে। সংবিধান সংশোধনের জন্য উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুমোদন বাধ্যতামূলক। সরকার এককভাবে সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা: কোনো ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না।

নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন: সনদের প্রক্রিয়ায় গঠন, সরকার ও বিরোধী দলের সম্মিলিত ভূমিকা।

বিরোধীদলের অধিকার: ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি বিরোধীদল থেকে নির্বাচিত হবে।

নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা: দণ্ডিত অপরাধীদের ক্ষমা প্রদানে সীমাবদ্ধতা (ভুক্তভোগী পরিবারের সম্মতি প্রয়োজন), ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধ।

ভাষা স্বীকৃতি: বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, জাতিগত ভাষাগুলোরও সুরক্ষা।

‘হ্যাঁ’ জিতলে কী হবে?

সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হবে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, মেয়াদসীমা, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা—এগুলো কার্যকর হয়ে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ, নারী ও সংখ্যালঘুর অধিকার সুরক্ষিত, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হবে । নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথ সুগম হবে, ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান অসম্ভব হবে।

‘না’ জিতলে কী হবে?

সংস্কার প্যাকেজ বাতিল হয়ে যাবে। বর্তমান সংবিধান অনুসারে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে পুরনো ধাঁচে শাসন চালাতে পারবে—এককেন্দ্রিক ক্ষমতা, সংবিধান সংশোধনের সহজপথ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারহীন নির্বাচন। জনগণের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থাকবে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে, নতুন অভ্যুত্থানের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। সংস্কারের সুযোগ হারিয়ে যবে।

বিশ্লেষণ

গণভোট জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করছে, যা গণতন্ত্রের মূল স্পিরিট। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে; কেউ কেউ আরও পরিবর্তন চায়। ভোটারদের সচেতন হতে হবে—প্রচারণা, লিফলেট ও আলোচনা থেকে সঠিক তথ্য নিয়ে ভোট দিতে হবে। এই গণভোট শুধু সংস্কার নয়, জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

উপসংহার

১২ ফেব্রুয়ারি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে ‘হ্যাঁ’ দিন। এটি শুধু ভোট নয়, একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব। জনগণের হাতেই দেশের চাবিকাঠি। সংস্কার সফল হলে বাংলাদেশ হবে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র।

লেখক: ড.জাহিদ আহমেদ চৌধুরী, কলামিস্ট

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...