ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তৃত জলরাশি এবং সেই জলরাশিকে ঘিরে থাকা দেশগুলো নিয়ে গঠিত অঞ্চলকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বলা হয়। বর্তমানে ক্ষমতা বিস্তার, সমুদ্র বাণিজ্য ও অর্থনীতির মূল কেন্দ্র বলা চলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে। ২০০৬-০৭ সালে এই অঞ্চল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এ অঞ্চলের সঙ্গে অনেকগুলো দেশ সংযুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে উদীয়মান শক্তি হিসেবে রয়েছে চীন আর সুপারপাওয়ার আমেরিকা। রয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, আবার জাপান এবং কোরিয়ার মতো অর্থনৈতিক শক্তি। এছাড়া বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। সব মিলিয়ে এ অঞ্চল হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক রাজনীতির আগ্রহের মূল কারণ।
এদিকে আমেরিকার মাথাব্যথার একটি প্রধান কারণ চীন। একুশ শতকে চীন সামরিক ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে যেভাবে বিশ্বকে জানান দিচ্ছে, তাতে আমেরিকার কপালে চিন্তার ভাঁজ বেশ বেড়েছে।
একসময় বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র ছিল ইউরোপ। ইউরোপ নিয়েই ছিল বিভিন্ন রাষ্ট্রের চিন্তাভাবনা ও কৌশল। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদের কারণেই বিশ্বের কাছে মধ্যপ্রাচ্য গুরুত্ব পেতে থাকে। কিন্তু বর্তমানে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যকে ছাড়িয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলই বিশ্বের কাছে কৌশল এবং ভূরাজনীতির ভরকেন্দ্র। এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করার পাশাপাশি চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থানের প্রতি কৌশলগত দৃষ্টি রাখছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলো।
এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কারণ হিসেবে বলা যায় নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ। যদি এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্য বৃদ্ধি পায়, তাহলে চীনের সমুদ্রকেন্দ্রিক বাণিজ্যের ওপর একচেটিয়া প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নিরাপত্তা ও প্রভাব অনেকটাই খর্ব হবে। চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে থুসিডাইসিস ট্রাপের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে বলা হয়, নতুন উদীয়মান শক্তি যখন প্রতিষ্ঠিত শক্তির ওপর চ্যালেঞ্জ করে, তখন যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি অর্থাৎ ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ঘোষণা করে। যেখানে তারা উল্লেখ করেছে, ইন্দো-প্যাসিফিক দেশগুলোয় যে জনসংখ্যা বসবাস করে, সেটি বৈশ্বিক জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি। যার মধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ তরুণ। এই অঞ্চলগুলো দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি যেমনÑতেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদের বিরাট অংশ সরবরাহ করা হয়। বিশ্বের সামুদ্রিক সীমানার প্রায় ৬৫ শতাংশ রয়েছে এই অঞ্চলে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক অর্থনীতির দুই-তৃতীয়াংশ এবং বৈশ্বিক জিডিপির ৬০ শতাংশ।
এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক অবস্থান, অপার সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা, বিশাল বাজার ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে বিশ্বের বড় শক্তিগুলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে তাদের কৌশল ঘোষণা করছে। যে দেশের সমুদ্রের ওপর বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেই দেশ তত বেশি শক্তিশালী হবে। কারণ সমুদ্রপথে বাণিজ্য সহজ ও ব্যাপকভাবে করা যায়। সমুদ্রকেন্দ্রিক বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি দেশ অন্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও ব্যবসা বাড়াতে পারে। এর ফলে অর্থনীতি শক্তিশালী এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বৃদ্ধি পায়। যার সমুদ্রের ওপরে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেই আসল শক্তি। এই সমুদ্রের ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা চীন খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছে। এখন তারা বিশ্ববাণিজ্যের পথ খুলতে, নতুন বন্দর গড়ে তুলতে এবং সমুদ্রে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র যে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ঘোষণা করেছে, সেখানে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন ও বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশকে উল্লেখ করেছে। কিন্তু এই কৌশলে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বরং চীনকে এই অঞ্চলের জন্য আগ্রাসী এবং ক্ষতিকর প্রতিবেশী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চীন তার সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। চীন প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থা এবং নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না, এমন অভিযোগ করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে, চীন পাল্টা অভিযোগ করে বলে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা জোট চীনকে সামরিকভাবে ঘিরে ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং চীন কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জলসীমায় জাহাজ চলাচলে বাধা দিচ্ছে না। এই অঞ্চলে আবার চীনের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর দ্বন্দ্ব রয়েছে। চীন ও ভারত সীমান্ত দ্বন্দ্ব, তাদের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকলেও ১৯৬২ সালে মাত্র একবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এছাড়া সীমান্ত উত্তেজনা থাকলেও আর কোনো যুদ্ধ লক্ষ করা যায়নি। চীন-তাইওয়ান দ্বন্দ্ব, চীন-জাপান দ্বন্দ্ব, চীন-দক্ষিণ কোরিয়া দ্বন্দ্ব। চীনের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত জায়গা।
২০০৭ সালে (যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া) চারটি দেশ মিলে কোয়াড জোট গঠন করে। ২০০৭ সালে গঠিত হলেও প্রায় এক দশক হিমঘরে থাকার পর ২০১৭ সালে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই জোট। যার লক্ষ্য ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীল ও নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা। তবে, তাদের মূল লক্ষ্য চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা করা এবং এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোর ওপর চীনের আধিপত্য বিস্তার রোধ করা। বাংলাদেশকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের অবস্থান ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে এবং এর রয়েছে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি। এই জলরাশির গভীরে লুকিয়ে আছে তেল, গ্যাস, জীববৈচিত্র্য ও নবায়নযোগ্য শক্তির আধার।
বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে এমন একটি অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া, ইউরোপসহ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বাংলাদেশ ২০২৩ সালে তার নিজস্ব ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক(দৃষ্টিভঙ্গি) প্রকাশ করেছে, যা শান্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উন্মুক্ত সমুদ্র বাণিজ্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে।
আবার, ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি একুশ শতকের বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশাল সমুদ্রের জলরাশি শুধু বিশালতা নয়, এর তলদেশে লুকিয়ে আছে তেল, গ্যাস, জীববৈচিত্র্য ও খনিজসম্পদ, যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিস্তৃত জলসীমার মধ্যে আছে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা একটা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকলেও, অদূর ভবিষ্যতে দুই পরাশক্তি আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সামরিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় নামবে।
অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। যেখানে ১৫৫টি দেশ অংশ নেয়, অংশগ্রহণকারী দেশগুলো সরাসরি সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে যুক্ত করবে। এর মাধ্যমে চীন বিশ্বে তার অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চায়। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে চীন নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র অনেকটা পিছিয়ে পড়বে। আর প্রভাবটা পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর।
চীনের প্রভাব কমানোর জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করছে। বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না, চীন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাই এই অঞ্চলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক। শুধু শক্তির প্রদর্শনী নয়, কৌশলগত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের খেলা। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো কীভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবেÑসেটাই ভবিষ্যৎ বিশ্বরাজনীতি ও ভূরাজনীতির কৌশল। সে জায়গা থেকে বাংলাদেশ কৌশলগত জায়গায় অবস্থান করছে।
লেখক : ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা কলেজ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

