আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

পুনরুদ্ধার, উত্থান ও রাজনীতির নতুন মানচিত্র

শাহীদ কামরুল

পুনরুদ্ধার, উত্থান ও রাজনীতির নতুন মানচিত্র

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশের এই জটিল রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণকে বুঝতে গেলে একটি পুরোনো পাশ্চাত্য গল্প অদ্ভুতভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেÑ‘আ টেল অব টু সিটিসের’ (A Tale of Two Cities) সেই হৃদয়বিদারক অধ্যায়, যেখানে ফরাসি বিপ্লবের অগ্নিগর্ভ প্যারিস আর অপেক্ষাকৃত স্থিত লন্ডনের মধ্যে মানবিক নিয়তি, প্রতিশোধ ও পুনর্জন্মের দ্বৈত সত্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে। গল্পের নায়ক চার্লস ডারনে এক অভিজাত পরিবার থেকে এসেও অত্যাচারী উত্তরাধিকার প্রত্যাখ্যান করে ন্যায় ও মানবতার পথে দাঁড়াতে চেয়েছিল; কিন্তু বিপ্লবের উত্তাল সময় তাকে অতীতের দায় থেকে মুক্তি দেয়নি। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, বিচার হয় এবং মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়Ñকারণ বিপ্লবের চোখে ব্যক্তি নয়, পরিচয়ই ছিল অপরাধের মাপকাঠি।

এই সংকটময় মুহূর্তে আবির্ভূত হয় সিডনি কার্টনের আত্মত্যাগÑএক ব্যর্থ, ক্লান্ত, কিন্তু অন্তরে মহৎ মানুষ, যে ডারনের জায়গায় নিজেকে উৎসর্গ করে গিলোটিনে মৃত্যুবরণ করে। তার শেষ উপলব্ধি ছিল, ‘ইট ইজ আ ফার, ফার বেটার থিং দ্যাট আই ডু’ (It is a far, far better thing that I do…)—এক নীরব উপলব্ধি যে ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতার পরও নৈতিক সিদ্ধান্ত ইতিহাসের ধারাকে স্পর্শ করতে পারে। এই আত্মত্যাগ স্রেফ এক ব্যক্তিকে বাঁচানো নয়; এটি ছিল ভবিষ্যৎকে নতুন সম্ভাবনা দেওয়া, সহিংস বিপ্লবের মধ্যেও মানবতার শিখা অম্লান রাখার প্রয়াস।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের ২০২৬-এর রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই গল্পটি রূপক হয়ে ওঠে। দীর্ঘ একচ্ছত্র ক্ষমতার পতনের পর যে নির্বাচন ঘটল, সেখানে বিএনপি যেন সেই ডারনের মতোÑঅতীতের দায়, নিপীড়নের স্মৃতি এবং পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে বহন করে ক্ষমতায় ফিরেছে। আর জামায়াতের অবস্থান অনেকটা কার্টনের মতোÑক্ষমতায় না গিয়েও আত্মসংযম, প্রস্তুতি ও সম্ভাবনার জায়গায় দাঁড়িয়ে। নির্বাচন তাদের পরাজয় নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য এক নৈতিক অবস্থান নির্মাণের মুহূর্ত। কারণ রাজনীতির ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যে শক্তি ক্ষমতার বাইরে থেকেও মানুষের আশা ধারণ করে, শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই সমাজের গভীরে প্রভাব বিস্তার করে।

এই রূপক থেকে বর্তমান রাজনীতির জন্য একটি নীরব শিক্ষা উঠে আসে। বিএনপির জন্যÑক্ষমতায় ফেরা যদি প্রতিশোধের রাজনীতি হয়ে ওঠে, তবে তা ডারনের পরিবারের মতো অতীতের দায়ের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। আর জামায়াতের জন্যÑবিরোধী অবস্থান যদি নৈতিক সংযম, দায়বদ্ধতা ও মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিতে রূপ নেয়, তবে তা কার্টনের আত্মত্যাগের মতো ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তি হয়ে উঠতে পারে। কারণ রাজনীতির প্রকৃত তাকাত শুধু ক্ষমতায় নয়; মানুষের মনে আস্থা ও মর্যাদার অনুভূতি জাগাতে পারার ক্ষমতায়। গল্পের শেষে কার্টনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ডারনে বেঁচে যায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নতুন জীবন পায়। এটি এক গভীর প্রতীকÑইতিহাসের ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত তাদের দিকেই ঝুঁকে পড়ে, যারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বৃহত্তর কল্যাণের জন্য অবস্থান নেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও ২০২৬-এর নির্বাচন সেই সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। ক্ষমতায় থাকা ও না থাকাÑদুটিই এখন পরীক্ষা; কে ক্ষমতায় থেকে মানবিকতা রক্ষা করবে আর কে ক্ষমতার বাইরে থেকেও ভবিষ্যতের আস্থা গড়ে তুলবে।

এ কারণেই বিশ্ববিখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক

ডিকেন্সের গল্প আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ প্রতিটি রাজনৈতিক যুগান্তরের ভেতরে পুশিদা থাকে একই প্রশ্নÑক্ষমতা কি প্রতিশোধের হাতিয়ার হবে, নাকি মানবতার পুনর্গঠনের পথ?

যাই হোক, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ইতিহাসে এক জটিল, ভারী, তবু গভীর তাৎপর্যময় দিন। ভোটের ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার হয়ে যায় : দীর্ঘ দমন-পীড়ন, নির্বাসন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অধ্যায় পেরিয়ে আবার রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে বিএনপি। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তন একক বিজয়ের সরল এনেকডট নয়; এটি বহুকণ্ঠ বাস্তবতার বহুমাত্রিক পরিণতি। কারণ একই নির্বাচনে দৃশ্যমান হয়েছে আরেকটি সমান্তরাল সত্যÑজামায়াত জোটের উল্লেখযোগ্য উত্থান, ৭৭ আসনে জয় এবং আরো প্রায় ৫৩ আসনে সামান্য ব্যবধান। অর্থাৎ অল্প সুইং ঘটলেই রাজনৈতিক মানচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। ফলে এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার নতুন যুগের শুরুয়াতের সিম্বল।

এই নির্বাচনের ফল বোঝার জন্য ফিরে তাকাতে হয় সাম্প্রতিক সময়ের সেই প্রবল অস্থিরতার দিকে, যা রাষ্ট্রক্ষমতার দীর্ঘ মনোলিথিক স্ট্রাকচার ভেঙে দিয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; এটি রাজনৈতিক ক্ষেত্রকে হঠাৎ উন্মুক্ত করে দেয়। বহু বছর ধরে দল ও রাষ্ট্রের যে একীভূত রূপ গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে পড়লে সমাজে তৈরি হয় ক্ষমতার শূন্যতা এবং নতুন প্রতিযোগিতার সুযোগ। রাজনৈতিক তত্ত্বে এটিকে বলা যায়Ñ ওপেন ফিল্ড মোমেন্ট (open field moment) আর সেই উন্মুক্ততার প্রথম বৃহৎ গণতান্ত্রিক পরীক্ষা ছিল ২০২৬ সালের এই নির্বাচন। বিএনপি সেখানে বিজয়ী হলেও, রাজনৈতিক বাস্তবতা আর একমুখী রইল না; বরং একাধিক শক্তির সহাবস্থানের নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

বিএনপির এ বিজয় অনেকের কাছে পুনরুদ্ধারের প্রতীক। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের লিজিটিমাসি (legitimacy) ধারণা অনুযায়ী, রাজনৈতিক বৈধতা তিন উৎস থেকে আসে : ঐতিহ্য, ক্যারিশমা ও আইনি কাঠামো। বিএনপি এই নির্বাচনে মূলত ভুক্তভোগী ঐতিহ্য ও প্রতিরোধের নৈতিক পুঁজি থেকে বৈধতা পেয়েছে। জনগণের একটি বড় অংশ তাদের দেখেছে নিপীড়িত বিরোধী শক্তি হিসেবে, যারা রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার হয়েছে। এই নৈতিক সহানুভূতি ভোটে রূপ নিয়েছে।

দীর্ঘ বছর ধরে কারাবরণ, গুম, নিপীড়ন, রাজনৈতিক নির্বাসনÑএই স্মৃতিগুলো তাদের সংগঠনকে এক ধরনের নৈতিক সহানুভূতির পুঁজি দিয়েছে। জনমানসে তারা শুধু একটি দল নয়, বরং এক নিপীড়িত বিরোধী শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সেই প্রতীকী শক্তিই ভোটে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্রের ইতিহাস দেখায়, সহানুভূতি দিয়ে ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব হলেও, ক্ষমতা ধরে রাখা যায় শুধু শাসনের দক্ষতা ও নৈতিকতার মাধ্যমে। তাই এ বিজয় একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও দায়Ñউভয়ের ভার বহন করছে। তবে এই নির্বাচনের আরেকটি গভীর স্তর হলো জামায়াতের উত্থান, যা নিছক নির্বাচনি সাফল্য নয়; এটি দীর্ঘ সামাজিক পুনর্গঠনের ফল। বহু বছর ধরে প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিসরে প্রায় অনুপস্থিত থাকা একটি দল হঠাৎ করে ৪৩ শতাংশ ভোটের শক্তিতে পরিণত হওয়া শুধু সাংগঠনিক কৌশলের ফল নয়; এটি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ধীর, নীরব পরিবর্তনের প্রতিফলন। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তাদের তুলনামূলক বেশি সমর্থন দেখায়, সমাজের মানসিক ভূগোল বদলাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম পুরোনো দলীয় দ্বন্দ্বের বাইরে নতুন রাজনৈতিক ভাষা খুঁজছেÑযেখানে পরিচয়, নৈতিকতা, সংগঠন এবং পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি মিলেমিশে থাকে। জামায়াত সেই ভাষায় কথা বলতে পেরেছে; বিএনপি সেখানে আংশিক সাড়া পেলেও, সম্পূর্ণ আধিপত্য অর্জন করতে পারেনি।

তরুণ ভোটের এই প্রবণতা বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ করে। যে প্রজন্ম আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং পরিবর্তনের তামান্না একসঙ্গে অনুভব করেছে, তাদের কাছে রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়; এটি মর্যাদা ও ন্যায়ের প্রশ্ন। এই প্রজন্মের আস্থা অর্জন করা মানে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করা। বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে এলেও, তরুণদের মানসিক সমর্থন এখন আর একদলীয় নয়Ñএটি বহুমাত্রিক। এই বাস্তবতা ক্ষমতাসীনদের জন্য সতর্কবার্তা এবং বিরোধীদের জন্য সুযোগ।

ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নÑতারা কি প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে সরে এসে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করতে পারবে? ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, দীর্ঘ নিপীড়নের শিকার দল ক্ষমতায় এসে প্রতিহিংসার ফাঁদে পড়ে। কিন্তু প্রতিশোধ রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে না; বরং নতুন সংঘাতের বীজ বপন করে। জনগণ যে সহানুভূতি থেকে বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছে, সেই সহানুভূতি দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে যদি শাসনব্যবস্থা আবার দলীয় হয়ে ওঠে। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলাÑএই প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষ করা এখন তাদের নৈতিক দায়িত্ব। অন্যথায় ২০২৬ সালের বিজয় শুধু অতীতের পুনরাবৃত্তি হয়ে থাকবে।

অন্যদিকে, জামায়াতের জন্য এই নির্বাচন পরাজয়ের গল্প নয়; বরং সম্ভাবনার প্রথম বড় সোপান। ৭৭ আসন এবং আরো বহু আসনে সামান্য ব্যবধান দেখায়, তারা এখন আর মারজিনালাইজড শক্তি নয়। আর রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন মুহূর্তকে বলা যায় ‘থ্রেশহোল্ড ক্রসিং’ (threshold crossing)—যখন একটি দল প্রান্তিকতা থেকে মূলধারায় প্রবেশ করে। তারা এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে তাদের প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি অবস্থান জাতীয় আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে। বিরোধী দল হিসেবে তাদের ভূমিকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রে কার্যকর বিরোধী শক্তি শুধু সমালোচনা করে না; বরং শাসনের বিকল্প ধারণা তুলে ধরে, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখে। জামায়াত যদি এই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেÑভালো কাজের সমর্থন, খারাপের কঠোর সমালোচনাÑতবে তারা ভবিষ্যতের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার পথে এগোবে।

জুলাই সনদের নৈতিক অঙ্গীকার এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। পরিবর্তনের সময় যে মূল্যবোধ উচ্চারিত হয়েছিলÑস্বচ্ছতা, অন্তর্ভুক্তি, মানবিক মর্যাদাÑসেগুলোর প্রতি ধারাবাহিক আনুগত্য এখন জামায়াতের জন্য অপরিহার্য। সংখ্যালঘু অধিকার, নারী অংশগ্রহণ, আইনের শাসনÑএই ইস্যুগুলোয় স্পষ্ট অবস্থান তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে। কারণ আধুনিক গণতন্ত্রে কোনো রাজনৈতিক শক্তির সাফল্য শুধু ভোটে নয়; সামাজিক আস্থায় নির্ধারিত হয়। আস্থা গড়ে ওঠে ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে।

ইতিহাস দেখিয়েছে, আদর্শিক অস্পষ্টতা রাজনৈতিক শক্তিকে দীর্ঘ মেয়াদে দুর্বল করে। জার্মান দার্শনিক হাবারমাস বলেছিলেন, বৈধতা টিকে থাকে তখনই, যখন রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে যোগাযোগ স্বচ্ছ ও যুক্তিসংগত থাকে। এই জায়গায় তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণ করবে।

তাছাড়া, গ্রাম ও শহরের পার্থক্যও এই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা। জামায়াতের তুলনামূলক কম ভোট গ্রামীণ অঞ্চলে দেখায়, তাদের সাংগঠনিক বিস্তার এখনো অসম। কিন্তু এখানেই তাদের বৃহৎ সম্ভাবনা। গ্রামীণ সমাজে ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রশ্নÑকৃষি, বাজার, অবকাঠামো, নিরাপত্তাÑআরো বেশি বাস্তব। যদি তারা এই বাস্তব সমস্যার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারে, তবে তাদের ভোটভিত্তি স্থায়ী হবে। আর যদি তা শুধু আদর্শিক থাকে, তবে বিস্তার সীমিত থাকবে। ফলে ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য গ্রামীণ সমাজে আস্থা অর্জন তাদের অন্যতম প্রধান কাজ।

এই নির্বাচনের আরেকটি গভীর দিক হলো বহুদলীয় ভারসাম্যের প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘদিন বাংলাদেশে রাজনীতি ছিল দ্বিমেরুÑএকদিকে ক্ষমতাসীন শক্তি, অন্যদিকে দুর্বল বিরোধী। এখন দৃশ্যপট বদলাচ্ছে। বিএনপি ক্ষমতায়, কিন্তু জামায়াত শক্তিশালী বিরোধী। এই কাঠামো গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক হতে পারে, যদি প্রতিযোগিতা নীতিগত থাকে। রাজনৈতিক তত্ত্বে এটিকে বলা হয় ‘কম্পিটিটিভ প্লুরালিজম’ (competitive pluralism)—যেখানে বহু শক্তি প্রতিযোগিতা করে; কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকে। বাংলাদেশের জন্য এটি নতুন অভিজ্ঞতা। এই কাঠামো গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক হতে পারে, যদি প্রতিযোগিতা নীতিগত থাকে। কারণ সুস্থ প্রতিযোগিতা শাসনকে জবাবদিহিমূলক করে, ক্ষমতার একচ্ছত্রতা ভাঙে এবং জনগণের বিকল্পের সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের জন্য এটি নতুন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, যেখানে ক্ষমতা ও সম্ভাবনা একই সঙ্গে সহাবস্থান করছে।

তরুণদের প্রসঙ্গ আবার ফিরে আসে, কারণ ভবিষ্যৎ রাজনীতির কেন্দ্র তারাই। নির্বাচন-পরবর্তী পর্যবেক্ষণ দেখায়, তরুণ ভোটাররা শুধু আদর্শ নয়; কর্মসংস্থান, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ভোট দিয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাস তাদের মানসিকতা নির্ধারণ করেছে। যদি ক্ষমতাসীন সরকার এই বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের সমর্থন দ্রুত বদলাবে। একইভাবে বিরোধী শক্তি যদি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প দেখাতে পারে, তবে তরুণদের আস্থা তাদের দিকে যাবে। ফলে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক লড়াই মূলত তরুণদের বিশ্বাস অর্জনের লড়াই।

আসলে, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তাই এক দ্বৈত সত্যের দিন। একদিকে বিএনপির প্রত্যাবর্তনÑদীর্ঘ সংগ্রামের পর পুনরুদ্ধার। অন্যদিকে জামায়াতের উত্থানÑনীরব প্রস্তুতির ফল। এই দুই বাস্তবতা মিলেই বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা। এখানে প্রতিযোগিতা আছে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার ভেতরেই রয়েছে সম্ভাবনা। যদি এই প্রতিযোগিতা নীতি, উন্নয়ন এবং মর্যাদার ভিত্তিতে দাঁড়ায়, তবে দেশ লাভবান হবে। আর যদি তা প্রতিহিংসা ও বিভাজনে নেমে যায়, তবে ইতিহাস আবার পুনরাবৃত্তি হবে। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এখনো জীবন্ত। বিএনপি সেই আকাঙ্ক্ষার এক রূপ পেয়েছে ক্ষমতায়; জামায়াত পেয়েছে সম্ভাবনায়। এখন প্রশ্ন শুধু এইÑকে সেই তামান্নাকে মর্যাদা দেবে, কে তাকে ভঙ্গ করবে। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কোনো দলের নয়; ইতিহাস মানুষের আশা, বেদনা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নের। আর সেই স্বপ্নই আজ বাংলাদেশের রাজনীতিকে নতুন এক অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিএনপির সামনে সেই গভীর সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছে : দীর্ঘ দুঃসময়ের স্মৃতিকে শক্তিতে রূপ দিয়ে রাষ্ট্রকে স্থিতি, ন্যায় ও মর্যাদার পথে এগিয়ে নেওয়া। যদি তারা মানুষের কষ্টের ইতিহাসকে সম্মান করে সহমর্মিতার রাজনীতি গড়ে তুলতে পারে, তবে এই প্রত্যাবর্তন শুধু ক্ষমতায় ফেরা নয়Ñএক নতুন আস্থার যুগের সূচনা হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ক্ষমতা ফিরে পাওয়া সহজ, কিন্তু মানুষের আস্থা ফিরিয়ে রাখা কঠিনÑআর যে শক্তি আস্থাকে মর্যাদা দিতে পারে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তার দিকেই ঝুঁকে পড়ে; এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির সামনে সেই বিরল সুযোগই এখন দাঁড়িয়ে আছে।

লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি

sahidkamrul25@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...