উদারপন্থি থেকে বামপন্থি কিংবা স্বতন্ত্র— নির্বাচনি জনসংযোগে প্রায় সব পক্ষের প্রার্থীরই পোশাকে পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। টুপি, পাঞ্জাবি, ঘোমটা হয়ে উঠেছে তাদের প্রচারণার পোশাক।
কেবল পোশাকই নয়, ধর্মকে ব্যবহার করে নির্বাচনি প্রচারণার বিষয়টি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশ পুরোনো ঘটনা। আর তাতে পিছিয়ে ছিল না ধর্মভিত্তিক কিংবা উদারপন্থি রাজনৈতিক দলের কেউ।
দেখা গেছে ধর্মভিত্তিক স্লোগান, পোস্টার কিংবা মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনি প্রচারের নজির।
তবে গণঅভ্যুত্থানের পর ‘নতুন বন্দোবস্তে’ ভোটাররা যে পরিবর্তনের আশা করেছিলেন, নির্বাচনি জনসংযোগে তার প্রতিফলন হয়নি বরং এবাররের নির্বাচনে ধর্মকে আরও বেশি ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। আর ভোটারদের অজ্ঞতাই রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহারের কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। বিবিসি বাংলার রিপোর্টার তানহা তাসনিমের করা বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
যদিও নির্বাচনি আচরণবিধিতে ধর্মকে ব্যবহারের বিষয়ে আছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। কোনো প্রার্থী যদি সেই নির্দেশ অমান্য করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে জরিমানা ও শাস্তির বিধানও রয়েছে।
নির্বাচনি জনসংযোগে টুপি, ঘোমটা, পাঞ্জাবি
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হলেও বেশ কিছুদিন আগে থেকেই নিজ নিজ আসনে জনসংযোগ করছেন প্রার্থীরা।
বেশির ভাগ সময়ই এসব প্রার্থীকে মসজিদ বা শোকসভার মতো জমায়েতে জনসংযোগ করতে দেখা গেছে, যেখানে বেশির ভাগই পুরুষ প্রার্থীদের পরতে দেখা গেছে টুপি-পাঞ্জাবি আর নারী প্রার্থীরা টেনেছেন ঘোমটা।
বিএনপি, এনসিপি, গণঅধিকার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রায় সবাইকেই এই বেশে দেখা গেছে।
তবে এ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েন ঢাকার এমপি পদপ্রার্থী ও এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
সম্প্রতি তার জনসংযোগের সময় একজন ধর্মীয় পোশাক পরা ব্যক্তি তাকে হঠাৎ করে টুপি, পাঞ্জাবি পরার বিষয়ে প্রশ্ন করেন। এ সময় ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
পাটওয়ারীই বা কেন এই সময়ে এই পোশাককে প্রয়োজনীয় মনে করলেন?
‘নির্বাচন এলে এটা থাকে। আর সমাজে যারা উপরস্থ, মসজিদ বা বাজার কমিটির সভাপতি, তাদের বয়স ৪০ থেকে ৫০ বছরের ওপরে থাকে। ফলে তারা ঐ সময় ধর্মচর্চাটা করেন এবং পাঞ্জাবি-টুপি পরেন।
‘তো তাদের সাথে যখন কমিউনিকেশন হয়, তখন ওই ধরনের একটা কালচারাল জায়গা চলে আসে। যেহেতু এটা ৯০ পারসেন্ট মুসলমানের দেশ এবং ভোটার রেশিওটা মুসলমানদের মধ্যেই বেশি; তখন ওই ইস্যুটা চলে আসে বলে জানিয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক দলের নেতাদের অনেককে আগে থেকেই ধর্মীয় পোশাক পরতে দেখা গেলেও নির্বাচনি জনসংযোগের সময় তারা ধর্মকে আরও বেশি ব্যবহার করছেন— উঠছে এমন অভিযোগও।
‘লেবাস পরিবর্তনকে’ ভোটাররা কীভাবে দেখেন
গত ১৩ জানুয়ারি নিজের ফেসবুক পাতায় এ নিয়ে একটি পোস্ট দেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ।
সেখানে তিনি লেখেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে প্রচারণায় টুপির ব্যবহার বেড়েছে। এটা এ দেশে নতুন নয়। এতে যে কাজ হয় না, তা-ও তো বলা যায় না। নিশ্চয়ই কাজ হয়, না হলে এত এত স্মার্ট প্রার্থী এই কৌশল নেবেন কেন!’
যদিও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নির্বাচনের আগ দিয়ে পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টিকে খুব বেশি ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না ভোটারদের অনেকে।
এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শাজেদুজ্জামান সৌমিক বলেন, ‘এটা হিপোক্রেসি হয়ে গেল না?’
‘সবার রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি থাকে, সেখান থেকে কেউ যদি ফলো করে, সেটা বেটার। কিন্তু লেবাস পরে জান্নাতের টিকিট বিক্রি করা তো কাম্য নয়, বলেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়টির আরেকজন শিক্ষার্থী রুমানা খাতুন বলেন, ‘আমি সচেতন হলে ব্যক্তি দেখে ভোট দেব, কিন্তু মেজরিটি মানে গ্রামের দিকে দেখা যায়, যারা তাদের মতো রিলিজিয়াস মাইন্ডের, তাকে ভোট দেবে।’
ফলে সেখানে পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি কাজে দেবে বলেই মনে করেন তিনি।
বিষয়টিকে অনেকটা একইভাবে দেখেন নোয়াখালীর ব্যবসায়ী মোবারক। ‘এটা আসলে লোক দেখানোর জন্য, নির্বাচন চলে গেলে তারা আগের লেবাসে চলে যায় বলে মনে করেন তিনি।
এমন কোনো প্রার্থীকে ভোট দেবেন না বলেও জানান ওই ব্যবসায়ী।
তবে কেউ যদি ‘লেবাস ধারণ করে ভালো ইলেকশন করতে পারে’, তাতে কোনো সমস্যা নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মাহমা আলম শান্তা।
আপাতভাবে বেশির ভাগ ভোটারের চোখে বিষয়টিকে প্রতারণা মনে হলেও প্রার্থীরা কেন ধর্মীয় পোশাকের দিকে ঝোঁকেন— এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা বলেন, ‘একটা হলো ক্লিন ইমেজ দেওয়া, কারণ অনেকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলের অভিযোগ আছে। এছাড়া ঋণখেলাপি, দুর্নীতি— এগুলো তো কমবেশি আছেই’।
ফলে ধর্মীয় পোশাক পরে ভোটারদের মন জয় করা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তৈরির উদ্দেশ্যেই তারা এ ধরনের পোশাক পরেন বলে মন্তব্য করেন এই বিশ্লেষক।
অতীতেও দেখা গেছে ধর্মের ব্যবহার
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান ভাগই হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। ফলে লম্বা সময় ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার এই অংশে নির্বাচন তথা রাজনীতিকে কেন্দ্র করে হয়েছে ধর্মের ব্যবহার।
আলতাফ পারভেজ তার পোস্টে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর টুপি পরার একটি প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
‘মুসলিম লিগে যোগ দেওয়ার আগে টুপি পরা ব্যক্তি জিন্নাহর ছবি পাওয়া মুশকিল। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে টুপির আনুষ্ঠানিক অভিষেক ১৯৩৭-এর নির্বাচনের পর থেকে। ঐ নির্বাচনে মুসলিম লীগ অতি খারাপ ফল করে। জিন্নাহ তখন তার ও দলের রাজনীতির মোড়ে বদল ঘটান।... তারপর ১৯৪৬ এর নির্বাচনে কী ঘটল, সেটা সবার জানা। মূলত সেই থেকে টুপির রাজনৈতিক কদর বেশ!, লেখেন তিনি।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ালী লীগের নির্বাচনি পোস্টারের ওপর ‘আল্লাহু আকবর’, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, ‘আওয়ামী লীগ জিন্দাবাদ’, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব – জিন্দাবাদ’ লেখা ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ম্যানিফ্যাস্টোতে লেখা ছিল, ‘কুরআন ও সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন করতে দেওয়া হবে না’।
১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে জনসভা শেষে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’ বলে স্লোগান দেন শেখ মুজিবুর রহমান।
যদিও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে ১৯৭৫ সালে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন তৈরি করেন।
১৯৭৫ সালে সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবারও রাজনীতিতে দেখা যায় ধর্মের ব্যবহার।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় সংবিধানের মৌলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতার স্থলে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর চূড়ান্ত আস্থা এবং বিশ্বাস’ সংযুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে ‘সংবিধানের ইসলামিকরণ’ শুরু হয়।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদটি যেখানে সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল, একটি ধর্মে বিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে, তা তুলে দেওয়া হয়।
কোলাবরেশন অ্যাক্ট বাতিল করে দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক শক্তিকে সহায়তা করা হয়। এমনকি জিয়াউর রহমান একটি প্রক্লেমেশন আদেশের মাধ্যমে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় দল গঠনের ক্ষেত্রে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা তুলে দেন।
এতে আরও বলা হয়, নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে এরশাদ জনগণের ধর্মীয় আবেগকে তার সরকারের সমর্থনের ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। ১৯৮৮ সালে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও ধর্মকে সামনে আনে রাজনৈতিক দলগুলো। সেসময় শাহজালালের মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
প্রচারণার সময় তিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আজান বন্ধ হয়ে যাবে, মসজিদে মসজিদে উলুধ্বনি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনের সময় তাদের দলের একটি স্লোগান ছিল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ধানের শীষে বিসমিল্লাহ’।
সেই নির্বাচনে জয়ী হয় দলটি। পরের নির্বাচনে ১৯৯৬ সালে একইভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচনে তাদের একটি স্লোগান ছিল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, নৌকার মালিক তুই আল্লাহ’।
অন্যদিকে ওমরাহ হজ করে এসে মাথায় কালো কাপড়, লম্বা হাতার ব্লাউজ আর হাতে তসবিহ নিয়ে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেন শেখ হাসিনা। সেই নির্বাচনে তিনিও নির্বাচনি সফর শুরু করেন শাহজালালের মাজার জিয়ারত করে। প্রার্থনারত অবস্থায় তার ছবি ছাপিয়ে করা হয়েছিল পোস্টার।
নির্বাচনে ধর্ম ব্যবহারের এই দৌরাত্ম্য নব্বইয়ের দশকে শেষ হয়নি। চলেছে পরবর্তী সময়েও।
২০২৩ সালে ইসলামী আন্দোলনের মেয়র পদপ্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেছিলেন, ‘আপনি যদি হাতপাখা প্রতীকে ভোট দেন, তাহলে ভোটটা পাবে ইসলাম এবং আল্লাহর নবী’।
একই বছর সিলেটের এক নির্বাচনি জনসভায় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘এই নৌকা নূহ নবির নৌকা।’
তবে পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ধর্মকে ব্যবহারের সবচেয়ে বড় নজির দেখা যাচ্ছে এবারের নির্বাচনে।
ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ভোটের নামে ‘জান্নাতের টিকিট’ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
যদিও ধর্মকে ব্যবহারের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দলটির আমির শফিকুর রহমান। গত মাসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা ধর্মকে কখনই ব্যবহার করি নাই, করবো না’।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

