আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

নির্বাচন ইস্যুতে চার ধারায় বিভক্ত হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা

রকীবুল হক

নির্বাচন ইস্যুতে চার ধারায় বিভক্ত হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সরগরম হয়ে উঠছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো তাদের প্রার্থীদের নিয়ে ভোটের প্রচারে ব্যস্ত। এক্ষেত্রে বিপরীত অবস্থানে অরাজনৈতিক ধর্মীয় বৃহত্তর সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

সংগঠনটির বহু নেতা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের পক্ষে নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ায় তাদের অনুসারীরাও স্ব স্ব দলের পক্ষেই কাজ করছেন। আবার প্রার্থী না হলেও হেফাজতের আমির ও মহাসচিবসহ অনেকেই একটি পক্ষ-বিপক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

কেউ কেউ আবার তাদের অপছন্দের দল বা জোটের বিরোধিতাও করছেন। সব মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচন ইস্যুতে অন্তত চার ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছেন দেশের আলোচিত এই সংগঠনের নেতাকর্মীরা। কওমি অঙ্গনের এই দ্বিধা-বিভক্ত অবস্থান নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে বেশ অস্বস্তি ও জটিলতাও দেখা দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

সূত্র মতে, দেশে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার লক্ষ্যে কওমি মাদরাসা শিক্ষকদের নিয়ে ২০১০ সালে গঠিত হয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক ও কওমি মাদরাসা বোর্ড-বেফাকের চেয়ারম্যান মরহুম শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে যাত্রা করে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বেশ আলোচিত হয়ে ওঠে হেফাজত। বিভিন্ন ধর্মীয় দলের নেতারা হেফাজতের শীর্ষ পদে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে তাদের অঘোষিতভাবে বিশেষ ভূমিকা থাকে।

তবে এতদিন সাংগঠনিকভাবে কোনো দলের পক্ষে-বিপক্ষে শীর্ষ নেতাদের তেমন কোনো অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। অবশ্য সাংগঠনিক এবং কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্ট সুবিধা নিতে বিভিন্ন দল ও বিগত সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করতেও দেখা গেছে। তবে এবারের নির্বাচন ঘিরে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের অনেকে নতুন নতুন বলয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। কিছু নেতাকর্মী নীরব অবস্থানেও আছেন।

আসন্ন নির্বাচন ঘিরে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান সম্পর্কে সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, হেফাজতে ইসলাম অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়ায় আমাদের নির্বাচনি কোনো তৎপরতা নেই। তবে প্রত্যেকে তাদের নাগরিক অধিকার হিসেবে দেশ ও জাতির কল্যাণে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অধিকার রাখেন।

হেফাজতের আমির মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানসহ অনেক নেতার জামায়াত বিরোধী অবস্থান ও বিতর্কিত বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, তারা কোনো রাজনীতিতে জড়িত নন। জাতির অভিভাবক ও দেশের আলেম সমাজের মুরব্বি হিসেবে তারা বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে থাকেন। শীর্ষ আলেমরা একই মত পোষণ করেন।

সূত্র মতে, হেফাজতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র প্রস্তুত করা হলেও তা সংশোধনের জন্য এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। তবে সংগঠনটির নীতি অনুযায়ী হেফাজতের কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ নেই। বিগত জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনগুলোতেও হেফাজতে পক্ষ থেকে কোনো প্রার্থী দেওয়া বা প্রচার কাজে জড়িত ছিল না। তবে বিভিন্ন আহ্বানমূলক বা দিক-নির্দেশনা দেন শীর্ষ নেতারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে পতিত আওয়ামী সরকারের হেফাজতের সমাবেশে বর্বর হত্যাকাণ্ডের পর বেশ বিপাকে পড়ে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। নানাভাবে সংগঠনটিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায় স্বৈরাচার সরকার। তবে ওই হামলার ঘটনায় সারা দেশে হেফাজত নেতার্মীদের মাঝে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তাদের কব্জায় রাখতে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে হেফাজত থেকে প্রার্থী দেওয়া এবং মন্ত্রী-এমপি বানানোর প্রলোভন দেখানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তাতে সাড়া না দিয়ে বরং আওয়ামী বিরোধী শক্ত অবস্থানে ছিলেন হেফাজত নেতাকর্মীরা।

একইভাবে ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনেও প্রকাশ্য কোনো অবস্থান নেয়নি সংগঠনটি। যদিও কওমি মাদরাসাসমূহের সর্বোচ্চ সংস্থা আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ আয়োজিত শোকরানা সমাবেশে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান অতিথি এবং তাকে কওমি জননী উপাধি দিয়ে বেশ সমালোচিত হন হেফাজত নেতারা। সমাবেশে তৎকালীন হেফাজত আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর উপস্থিতি নিয়ে সংগঠনটিতে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

এই সমাবেশ ঘিরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হয়। সংগঠনটির মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী, নায়েবে আমির নূর হুসাইন কাসেমী, ইজহারুল ইসলাম, মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী প্রমুখ এতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। পরবর্তী এই অসন্তোষ হাটহাজারী মাদরাসায় ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়। অবশ্য কওমি সনদের স্বীকৃতি আদায়ের স্বার্থেই আল্লামা শফী তাতে যোগ দেন বলে সংশ্লিষ্টরা ব্যাখ্যা দেন।

এদিকে ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদী সরকারের বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় হেফাজত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দলের নেতাদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে দুঃখ প্রকাশ করায় তাদের অনেককে আবার ফিরিয়ে আনা হয়। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনেও হেফাজতের সাংগঠনিক অবস্থান একই আছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন। তবে বাস্তবে এবারের চিত্র অনেকটা ভিন্ন বলে জানা গেছে।

সূত্র মতে, হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলাম পার্টি থেকে বেশ কয়েকজন প্রার্থী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। তবে এসব দল প্রধান দুটি বৃহত্তর নির্বাচনি জোটের অংশ হয়েছে। এর মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দুটি অংশই যুক্ত হয়েছে বিএনপি জোটে। এদের মধ্যে হেফাজতের ঢাকা মহানগর সভাপতি ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল-হাবীব ও যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী অন্যতম। তাদের অনুসারী হেফাজতসংশ্লিষ্ট সারা দেশের নেতাকর্মীরা তাই বিএনপি জোটের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি যুক্ত হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি জোটে। এদের মধ্যে হেফাজতের নায়েবে আমির ও খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের, যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর সেক্রেটারি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক অন্যতম। তাদের অনুসারীদের সবাই জামায়াত জোটের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।

তবে হেফাজতের আমির ও মহাসচিবসহ শীর্ষ নেতাদের অনেকেই কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকায় সরাসরি নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে যুক্ত নেই। তবে তারা মূলত জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতা ও সমালোচনায় সরব আছেন। তাদের অনুসারীদের অনেকেও একই অবস্থানে আছেন।

সম্প্রতি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে হেফাজত আমির মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী জামায়াত কোনো ইসলমী দল নয়, জামায়াতকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান ইত্যাদি বক্তব্য দিয়ে বেশ বিতর্ক ছড়িয়ে দেন। অবশ্য এসব বক্তব্যকে হেফাজত আমিরের ব্যক্তিগত বক্তব্য বলে দাবি করেন সংগঠনটির নেতারা।

তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে হেফাজত আমিরের বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিবৃতিতে বলেন, ‘জামায়াত সরকারে আসতে পারলে কওমি, দেওবন্দি ও সুন্নিয়াত মাদরাসার অস্তিত্ব রাখবে না’ শিরোনামে হেফাজতের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা অসত্য ও মনগড়া। তার এ বক্তব্যের মধ্যে সত্যের লেশমাত্রও নেই। তার বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

এদিকে, সম্প্রতি হেফাজতের আমির ও মহাসচিবসহ ১০১ আলেমের নামে জামায়াত জোটবিরোধী একটি বিবৃতি নিয়েও বেশ তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওই বিবৃতিতে নাম দেওয়া বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আব্দুল মালেকসহ বেশ কয়েকজন দাবি করেন, তারা এ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেননি এবং এ বিষয়ে কিছুই তারা জানেন না। অর্থাৎ বিবৃতির নামে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে হেফাজত নেতাদের নামে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মাঝে বেশ অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে।

সূত্র জানায়, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত কওমি মাদরাসাসংশ্লিষ্ট বিশাল একটি অংশ কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। তাদের কিছু অংশ জামায়াতবিরোধী অবস্থানে থাকলেও অধিকাংশ অনুসারীই প্রকাশ্য তেমন কোনো মতপ্রকাশ করেন না। আসন্ন নির্বাচন নিয়েও তারা অনেকটা নীরব অবস্থানে আছেন। অবশ্য সংশ্লিষ্ট কওমি মাদরাসার মুহতামিম, শিক্ষক ও মুরুব্বিদের পরামর্শে তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। সব মিলিয়ে এ নির্বাচন ঘিরে হেফাজতসংশ্লিষ্টরা প্রধান চারটি ধারায় বিভক্ত হয়ে আছেন।

নির্বাচনি ইস্যুতে হেফাজতের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, আমার জানামতে নির্বাচন নিয়ে হেফাজতে ইসলাম কোনো পক্ষে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে হেফাজতে যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা আছেন, তাদের অনুসারীরা সংশ্লিষ্ট পক্ষে কাজ করছেন। হেফাজতের আমির ও মহাসচিব পরোক্ষভাবে কোনো পক্ষ নিতে পারেন, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ নেওয়ার কথা নয়। ব্যক্তিগতভাবে নিতে পারেন। বর্তমানে তাদের অবস্থান ব্যক্তিগত পর্যায়ের, সাংগঠনিকভাবে এ ধরনের পক্ষ নেওয়ার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন