জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনীতির মাঠে যখন একের পর এক নতুন প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাব ঘটছে, তখন আবারও আলোচনায় আসছে আরেকটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ। জাতীয় নাগরিক কমিটি থেকে শুরু করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)- গঠনের পরপরই দল ছাড়ছেন নেতাকর্মীরা, কেউ কেউ প্রকাশ্যে সমালোচনায় মুখর হচ্ছেন।
প্রগতিশীলতার বদলে 'ডানপন্থি' ঝোঁকের অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে অনেকেই এনসিপি থেকে বেরিয়ে আসছেন। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্ভাব্য নির্বাচনি জোট নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রগতিশীল অ্যাকটিভিস্ট ও এনসিপি থেকে বেরিয়ে আসা একাংশ নতুন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে—কেন বারবার নতুন প্ল্যাটফর্ম আসছে? আর এই নতুন উদ্যোগে কী থাকছে ভিন্নতা?
আত্মপ্রকাশ শুক্রবার:
আগামী শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে তিনটায় রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নতুন এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ হবে। উদ্যোক্তাদের পাঠানো বার্তায় একে ‘নতুন রাজনৈতিক প্রয়াস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখনো প্ল্যাটফর্মটির নাম চূড়ান্ত হয়নি। তবে ‘পিপলস মার্চ’, ‘পিপলস অ্যাকশন’, ‘জনযাত্রা’, ‘গণসফর’ ও ‘পলিটিক্যাল অ্যাকশন’- এই পাঁচটি নাম আলোচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন- প্রস্তাবিত নামগুলোর মধ্যে 'পিপলস মার্চ' নামটি এগিয়ে রয়েছে।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, অর্থনীতির গণতান্ত্রিকায়ণ এই প্লাটফর্মের অন্যতম উদ্যেশ্য। এই প্লাটফর্ম দেশের অর্থনীতির সুষম বন্টন নিশ্চিত করতে কাজ করবে যাতে দেশের অর্থনৈতিক সুবিধা সকল শ্রেণি পেশার মানুষ সমানভাবে ভোগ করতে পারে। এছাড়া ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন, শিক্ষা-চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়াই এই প্ল্যাটফর্মের প্রধান লক্ষ্য হবে।
কারা যুক্ত হচ্ছেন:
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বাম ও মধ্যপন্থি মতাদর্শের অনেকেই এই উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছেন। এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা অনিক রায়, তুহিন খান (মঈনুল ইসলাম তুহিন) ও অলিক মৃ এই প্ল্যাটফর্মে থাকছেন। এছাড়া অন্তরবর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও থাকছেন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে।
অনিক রায়- বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং এনসিপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। তুহিন খান- ছিলেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব। আর অলিক মৃ ছিলেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক।
এ ছাড়া থাকছেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি বাকী বিল্লাহ, লেখক ও গবেষক মীর হুযাইফা আল মামদূহ, লেখক ফেরদৌস আরা রুমী, ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক নাজিফা জান্নাত, ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি সভাপতি মেঘমল্লার বসু ও সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদসহ আরও অনেকে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষ, নানা সামাজিক ও শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ডের তরুণ অ্যাকটিভিস্টরাও এতে যুক্ত হচ্ছেন।
কেন নতুন প্ল্যাটফর্ম, বিশেষত্ব কী:
প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ এক উদ্যোক্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, “প্রায় এক বছর আগে থেকেই এই প্ল্যাটফর্ম গঠনের চিন্তা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে এর নাম ছিল ‘নিউ পলিটিক্যাল অ্যাকশন’। পরে আরো কয়েকটি নাম নিয়ে আলোচনা হয়। ইতোমধ্যে একটি নাম চূড়ান্ত হয়েছে।"
এনসিপির সাবেক নেতা ও প্লাটফর্মের অন্যতম উদ্যোক্তা অনিক রায় আমার দেশকে বলেন, “বাংলাদেশের জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠাই আমাদের মূল লক্ষ্য। অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমরা গণতান্ত্রিক অর্থনীতির পক্ষে এবং সামগ্রিকভাবে সামাজিক গণতন্ত্রের রাজনীতি করতে চাই।”
প্ল্যাটফর্মের অন্যতম উদ্যোক্তা মেঘমল্লার বসু আমার দেশকে বলেন, “অভ্যুত্থানের পর আমরা বুঝেছি বাংলাদেশে একটা প্রগতিশীল বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম দরকার। যারা শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার পুঁজিপতিদের সমান হতে হবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার সংখ্যাগুরুর সমতুল্য হতে হবে। নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক- সব ক্ষেত্রেই গণতন্ত্র চাই। সংখ্যাগরিষ্ঠের দাদাগিরি নয়, বরং সকলের সমান মানবিক মর্যাদা।”
অনিক রায় জানান, তাঁদের প্রধান এজেন্ডা হবে অর্থনৈতিক সংস্কার।
তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, কিন্তু অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। আমরা চাই একটি গণতান্ত্রিক অর্থনীতি, যেখানে প্রতিটি নাগরিক অংশীদার হবে।”
তিনি বলেন, প্ল্যাটফর্মটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলে রূপ নিতে পারে। ১৭ জানুয়ারি প্রায় ৮০ থেকে ১০০ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে।
নেতৃত্বে ভিন্ন মডেল:
এই প্ল্যাটফর্মে নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নতুনত্ব থাকছে। অনিক রায় জানান,
“আমরা রোটেশনাল লিডারশিপ মডেল অনুসরণ করব। নির্দিষ্ট সময় পরপর নেতৃত্ব পরিবর্তন হবে, যাতে সবাই সমান সুযোগ পায়।”
তিনি বলেন, এই মডেল বাংলাদেশে নতুন হলেও আন্তর্জাতিকভাবে অনেক জায়গায় চালু আছে।
‘বাংলাদেশপন্থা’ বিতর্ক:
'বাংলাদেশপন্থা' শব্দ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে মেঘমল্লার বসু আমার দেশকে বলেন, “আমরা কোথাও ‘বাংলাদেশপন্থা’ শব্দটা ব্যবহার করিনি।
তিনি বলেন, সেদিন মিডিয়ার এক প্রশ্নের উত্তরে এটা এসেছে। ‘বাংলাদেশপন্থী বামধারা’ বলাটা নিতান্তই সমস্যাজনক, কারণ এতে বোঝায় বাকি বামরা প্রো-বাংলাদেশ না, তারা বাংলাদেশপন্থী না। বাস্তবে সাম্রাজ্যবাদ মোকাবিলায় সবচেয়ে শক্ত অবস্থান বামরাই নিয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন,“‘সাবেক এনসিপি সদস্যদের দ্বারা গঠিত’ ফ্রেমিং দিয়ে আমাদের পাপেট পার্টি বানানোর চেষ্টা হচ্ছে। অথচ এই প্ল্যাটফর্মের চিন্তা বহু আগের। এই প্লাটফর্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন সেট-আপে আগাবে।
প্লাটফর্মটির উদ্যোক্তারা বলছেন, তাঁদের লক্ষ্য ধাপে ধাপে পুঁজিবাদী কাঠামোকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দাঁড় করানো। বাস্তবতা মাথায় রেখে ট্রান্সফরমেটিভ রাজনৈতিক প্রকল্প গড়ে তোলাই তাঁদের উদ্দেশ্য।
মূলত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর উদ্ভূত রাজনৈতিক শূন্যতা, প্রগতিশীল বিকল্পের অভাব ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা থেকেই নতুন এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাব হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন- তারা প্লাটফর্মটিকে বড় একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তর করতে চান। এই নতুন উদ্যোগ সত্যিই রাজনীতিতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারবে কি না- সেদিকে এবার সবার নজর।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

