আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

মুসাব্বির খুনের ঘটনায় মামলা

কারওয়ান বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধসহ তদন্তের কেন্দ্রে তিন প্রশ্ন

তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে তিন বড় প্রশ্ন

খুনিদের গ্রেপ্তারে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

দেশব্যাপী বিক্ষোভ আগামীকাল

ওয়াসিম সিদ্দিকী

কারওয়ান বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধসহ তদন্তের কেন্দ্রে তিন প্রশ্ন

রাজধানীর তেজতুরি বাজার এলাকায় দুঃসাহসিক ‘কিলিং মিশনে’ ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের খুনের ঘটনায় উত্তাল রাজনৈতিক ও অপরাধ জগত।

এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বৃহস্পতিবার সকালে তেজগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করেন নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। মামলার তদন্তে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তার, নাকি জেলবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ সবকটি বিষয়ই সমান গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

এদিকে হত্যাকাণ্ডের ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও এখনো অধরা রয়ে গেছে মোটরসাইকেলে আসা সেই দুই খুনি। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজে দুই শ্যুটারকে শনাক্ত করার কাজ অনেকটা এগিয়েছে। তারা যাতে কোনোভাবেই সীমান্ত পার হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য দেশের প্রতিটি স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন পয়েন্টে বিশেষ সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক এক প্রতিপক্ষ স্থানীয় নেতাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে আপাতত কেউই বিষয়টি স্বীকার করেনি। স্বেচ্ছাসেবক দলের পক্ষ থেকে খুনিদের গ্রেপ্তারে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে। দেশব্যাপী সংগঠনের পক্ষ থেকে আগামীকাল শনিবার বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে তিন বড় প্রশ্ন

মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ও ডিবির প্রাথমিক তদন্তে তিনটি মূল কারণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, কারওয়ান বাজার এলাকার ব্যবসা ও শ্রমিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ। নিহত মুসাব্বিরের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হওয়া আবু সুফিয়ান মাসুদ কারওয়ান বাজার ভ্যানচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। এই এলাকার পরিবহন সেক্টর এবং ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসায়িক স্বার্থের পেছনে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। পুলিশের একটি সূত্র বলছে, আধিপত্যের লড়াইয়ে মুসাব্বির ও মাসুদের প্রভাব কোনো শক্তিশালী পক্ষের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কি না, তা নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চলছে।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলামের সম্পৃক্ততার প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, বসুন্ধরা সিটির পেছনে একটি মূল্যবান সরকারি জমি নিয়ে সুইডেন আসলামের গোষ্ঠীর সঙ্গে মুসাব্বিরের বিরোধ চলছিল। কারাগার থেকে বা দেশের বাইরের অপরাধী চক্রের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে কি না, তা নিয়ে তদন্তকারীরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। খুনিদের গুলি চালানোর পেশাদারত্ব এবং মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো অপারেশন শেষ করার ধরনটি কোনো অভিজ্ঞ গ্যাংস্টারের কাজ বলেই ধারণা দিচ্ছে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষয়টিও এড়িয়ে যাচ্ছে না পুলিশ। স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব হিসেবে মুসাব্বির ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির রাজনীতিতে জনপ্রিয় ছিলেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলে দীর্ঘ কারাভোগের ইতিহাস রয়েছে তার। রাজনৈতিক কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা বিরোধী কোনো পক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে তিনি ছিলেন কি না, তা-ও তদন্তের অধীনে রয়েছে।

কফি খাওয়ার সুযোগটিও পেলেন না তিনি

হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে নিজের পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়টুকুর স্মৃতি বলতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন মুসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। তিনি জানান, গত বুধবার সন্ধ্যায় ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মুসাব্বির তাকে বলেছিলেন, তুমি একটা কফি বানিয়ে দাও, আমি নামাজ পড়ে এসে খাব। নামাজের পর সেই কফি আর খাওয়া হয়নি তার। এক মুহূর্তের সেই শেষ কথাটিই এখন সুরাইয়ার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষত।

তিনি বলেন, আমার স্বামী ২০ বছর ধরে পানির ব্যবসা করতেন। রাজনীতি করার সময় অন্যদের দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তার কোনো শত্রু ছিল বলে আমাদের জানা নেই। কেন তাকে এভাবে প্রাণ দিতে হলো? সিসিটিভি ফুটেজে তো সব আছে, তবে কেন খুনিরা এখনো ধরা পড়ছে না?’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যদি এই হত্যার বিচার না হয়, তবে আরো অনেক পরিবার এভাবে নিঃস্ব হয়ে যাবে।

পেশাদার শ্যুটারদের ‘টার্গেট কিলিং’

প্রত্যক্ষদর্শী এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বুধবার রাত আটটার দিকে ফার্মগেট এলাকা পার হয়ে কারওয়ান বাজারের বিপরীত দিকে স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে মুসাব্বির ও মাসুদ দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। ঠিক তখনই একটি মোটরসাইকেলে করে হেলমেট পরিহিত দুজন সেখানে আসে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্তত পাঁচ রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে তারা।

লক্ষ্যটি ছিল নির্দিষ্ট এবং নিখুঁত। গুলির আঘাতে মুসাব্বিরের বুক ও পাঁজরের হাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। আর মাসুদের পেটের বাম পাশে গুলি লাগে। হামলা এতটাই দ্রুত ছিল, আশপাশে শত শত মানুষ থাকলেও কাউকে প্রতিরোধের সুযোগ দেয়নি তারা। গুলি শেষ করেই সোনারগাঁও হোটেলের দিকে পালিয়ে যায়। পরে দুজনকে উদ্ধার করে বিআরবি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মুসাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করেন। আবু সুফিয়ান মাসুদ বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।

তদন্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও ছায়া তদন্ত

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারীরা রাজধানীর কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে অনুসরণ করে মুসাব্বিরকে সেখানে এসে আঘাত হানে। তাদের গতিপথ শনাক্তে অন্তত এক ডজন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজের পাশাপাশি মুসাব্বিরের মোবাইল কললিস্ট, আর্থিক লেনদেন, সাম্প্রতিক চলাফেরা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। আহত আবু সুফিয়ানের জবানবন্দি পাওয়া গেলে সেটিকে মামলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি ও র‍্যাব আলাদাভাবে ছায়া তদন্ত চালাচ্ছে।

এদিকে, কারওয়ান বাজার কেন্দ্রিক শ্রমিক রাজনীতির সাথে যুক্ত একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করায় এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তের স্বার্থে আটক ব্যক্তির নাম এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তবে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যারাই থাকুক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ কমিশনার ইবনে মিজান বলেন, আপাতত দুই শ্যূটারকে চিহ্নিত করার দিকে মনোযোগ রয়েছে। সম্ভাব্য সব কারণ সামনে রেখে তদন্ত এগুচ্ছে।

জানাজায় খুনিদের গ্রেপ্তারে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় জানাজা শেষে মুসাব্বিরের লাশ রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সহযোদ্ধাদের উপস্থিতিতে মুসাব্বিরের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জোহর নামাজের পর অনুষ্ঠিত জানাজায় ইমামতি করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সদস্যসচিব কাজী মোহাম্মদ আবুল হোসেন। বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠেনর বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা এতে উপস্থিত হন।

জানাজার আগে দেওয়া বক্তব্যে মুসাব্বিরের হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার দাবিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের পক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম ও প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এ সময় হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, অনতিবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িততের গ্রেপ্তার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। গ্রেপ্তার না করলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

এদিকে পল্টনে জানাজা শেষে মুসাব্বিরের লাশ তার বাসভবনে নেওয়া হয়। আসর নামাজের পরে কারওয়ানবাজারের আম্বরশাহ জামে মসজিদের সামনে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রতিবাদ কর্মসূচি

মুসাব্বিরকে হত্যার প্রতিবাদ ও খুনিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সংগঠনের উদ্যোগে আগামীকাল শনিবার ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণসহ দেশব্যাপী জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল।

বুধবার রাতে রাজধানীর তেজতুরি বাজার এলাকায় অজ্ঞাতনামা বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহত হন আজিজুর রহমান মুসাব্বির। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও কারওয়ান বাজার ভ্যান চালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মাসুদ। ঘটনার পরদিন গত বৃহস্পতিবার সকালে মুসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন