রমজান মাসে আমরা সবাই চেষ্টা করি নানারকম নেকির কাজে সম্পৃক্ত হতে। রোজা, নামাজ, তেলাওয়াত, সদকাসহ বিভিন্ন নেক আমলে মাহে রমজানকে সুশোভিত করতে চেষ্টা করি। কিন্তু সময় ও সুযোগের অপর্যাপ্ততায় অনেকের বেলায়ই কঠিন হয়ে যায় মনের মতো করে মাহে রমজানকে আবাদ করা। বিশেষত কর্মজীবী ও নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় বন্দিদের জন্য নফল আমলের সুযোগ হয়ে ওঠে না। এমন সবার জন্য রমজানকে কাজে লাগানোর সহজ সুযোগ হলো জিকির।
জিকির অর্থ স্মরণ। আল্লাহ মালিককে তাঁর বান্দা বা গোলাম যে কোনো সময়, যে কোনো অবস্থায়ই স্মরণ করতে পারে। দাঁড়ানো, বসা বা শোয়া কিংবা পবিত্র, অজুবিহীন এমনকি গোসল ফরজÑসর্বাবস্থায় জিকির করা যায়। সব রকমের ইবাদতের মধ্যে সহজতম আমল জিকির। রমজানের পবিত্র মুহূর্তগুলো যদি আল্লাহর পবিত্র জিকিরে সুবাসিত হয়, তবে তা কতই না উত্তম হয়। জিকিরের কথা আল্লাহ কোরআনে অসংখ্য স্থানে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর স্মরণ করতে থাক স্বীয় পালনকর্তাকে আপন মনে ক্রন্দনরত ও ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এবং এমন স্বরে, যা চিৎকার করে বলা অপেক্ষা কম; সকালে ও সন্ধ্যায়। আর বেখবর থেকো না।’ (সূরা আরাফ : ২০৫)। তিনি আরো বলেন, ‘হে আমার বান্দারা, তোমরা আমাকে ডাকো। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সূরা মু’মিন : ৬০)। আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের জিকির করে আর যে জিকির করে না, তাদের উপমা জীবিত ও মৃতের মতো।’ (বোখারি : ৬৪০৭)।
জিকিরের পুরস্কার অনেক। ‘আল্লাহর অধিক জিকিরকারী পুরুষ ও জিকিরকারী নারী- তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।’ (সূরা আহজাব : ৩৫)। আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমি কি তোমাদের বলে দেব না, তোমাদের কাজকর্মের মধ্যে কোন কাজটি তোমাদের মালিকের কাছে অধিক পবিত্র এবং তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধির ব্যাপারে অধিক কার্যকর। তাছাড়া তোমাদের জন্য সোনা-রুপা দান করার চেয়েও শ্রেষ্ঠ এবং এ কথার চেয়েও শ্রেষ্ঠ যে, তোমরা শত্রুর মোকাবিলা করবে, তাদের গলা কাটবে, আর তারা তোমাদের গলা কাটবে (যুদ্ধ করবে)। তারা উত্তরে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি বলুন। তিনি বললেন, তা হলো আল্লাহর জিকির বা স্মরণ করা।’ (তিরমিজি : ৩৩৭৭)।
আমরা নানাভাবে জিকির করতে পারি। প্রথমত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর রাসূল (সা.) থেকে বর্ণিত জিকিরগুলো করা। দ্বিতীয়ত, তাঁর থেকে বর্ণিত সকাল-সন্ধ্যার জিকিরগুলো করা। তৃতীয়ত, প্রত্যেক কাজের জন্য সুন্নত দোয়াগুলো পড়া ইত্যাদি। যেমন প্রত্যেক ফরজ নামাজ শেষে আয়াতুল কুরসি পাঠ করুন। এতে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে জান্নাতে যেতে পারবেন। (সিলসিলাহ সহিহাহ : ৯৭২)। প্রত্যেক ফরজ নামাজ শেষে ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৩ বার আল্লাহু আকবার এবং ১ বার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির পাঠ করুন। এতে আপনার অতীতের সব পাপ ক্ষমা হয়ে যাবে। (মুসলিম : ১২২৮)।
রাসুল (সা.)-এর ওপর সকালে ১০ বার ও সন্ধ্যায় ১০ বার দরুদ পড়ুন, এতে আপনি নিশ্চিত রাসুল (সা.)-এর সুপারিশ পাবেন। (সহিহ তারগিব : ৬৫৬)। সকালে ১০০ বার ও বিকালে ১০০ বার সুবহানাল্লাহিল আজিম ওয়া বিহামদিহি পড়লে সৃষ্টিকুলের সব মানুষ থেকে বেশি মর্যাদা দেওয়া হবে। (আবু দাউদ : ৫০৯১)। সকালে ১০০ বার ও সন্ধ্যায় ১০০ বার সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি পাঠ করলে কিয়ামতের দিন তার চেয়ে বেশি সওয়াব আর কারও হবে না। (মুসলিম : ২৬৯২)।
সর্বোপরি কর্মজীবী লোকেরা কর্মস্থলে যাতায়াতের সময়, গৃহিণী মা-বোনেরা গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে ফাঁকে জিকিরের মাধ্যমে জিহ্বাকে সজীব রাখতে পারেন। রমজানের এই মূল্যবান দিনগুলোর প্রতিটি সময় কোনো না কোনো ইবাদতে কাটে, সবার সে চেষ্টা করা উচিত। কিছু না হলেও অন্তত জিকিরের মাধ্যমে সময়কে সুবাসিত করার চেষ্টা থাকতে হবে। আল্লাহ সবাইকে সে তাওফিক দান করুন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

