আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জুনায়েদের খেজুরগাছ নাড়া দিতে প্রস্তুত রুমিনের হাঁস

মফিজুর রহমান লিমন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

জুনায়েদের খেজুরগাছ নাড়া দিতে প্রস্তুত রুমিনের হাঁস

একদিকে কথার লড়াই, অন্যদিকে বৃহৎ দলের বিপরীতে ব্যক্তি পরিচয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সভা-সমাবেশ ও মিটিং-মিছিলে সরগরম প্রচার। প্রার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে করছেন তির্যক মন্তব্য। সব মিলিয়ে সারা দেশে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর উপজেলার দুটি ইউনিয়ন) আসনের নির্বাচনি মাঠ। এ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহসভাপতি জুনায়েদ আল হাবীব এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার দ্বৈরথ জমে উঠেছে।

মূলত এ আসন থেকে বিএনপির হয়ে নির্বাচন করার আগ্রহ ছিল রুমিন ফারহানার। তবে আসন সমঝোতার কারণে এ আসন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে ছেড়ে দেয় বিএনপি। এতেই বাধে বিপত্তি। রুমিন ফারহানা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নেমে পড়েন ভোটের মাঠে, যার মাশুল এই নেত্রীকে দিতে হয়েছে দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর থেকে তিনি কোনো দলীয় ব্যানারে নয়; বরং নিজেকে গণমানুষের প্রার্থী দাবি করে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চাইছেন।

বিজ্ঞাপন

রুমিন ফারহানা হাঁস প্রতীকে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন গ্রামগঞ্জের পথে প্রান্তরে। তবে থেমে নেই বিএনপি জোটের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবীবও। তিনিও খেজুর গাছ প্রতীকের ব্যাপক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিটি দিন কাটছে গণসংযোগ আর সভা-সমাবেশে। শুধু তাই নয়, গত ৮ জানুয়ারি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবীবকে রোহিঙ্গা প্রার্থী হিসেবে আখ্যায়িত করে বক্তব্য দেন রুমিন ফারহানা, যা স্যোশাল মিডিয়াসহ সর্বমহলে আলোচনার ঝড় তুলেছে।

তবে এর জবাবে একটি দোয়া মাহফিল থেকে জুনায়েদ আল হাবীব বলেন, ‘মো রোহিঙ্গা নাহি হো, মুঝে তারেক নে ভেজা হ্যায়।’ তবে সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল সফর এ আসনের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে তিনি ওই দিনের সভায় বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে খেজুর গাছ প্রতীকের জুনায়েদ আল হাবীবকে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাকে জয়ী করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান। এরপর থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের জোট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে।

সরেজমিন জানা গেছে, আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এ আসন থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জয়ী হন। পরে ২০০১ সালে বিএনপি জোটের প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে আসনটিতে জয় পান। এছাড়া ২০১৮ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে জয়ী হন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া। ঐতিহাসিকভাবে এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রতি মানুষের অন্যরকম আগ্রহ রয়েছে। তবে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক না থাকায় ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে।

কয়েকজন ভোটার জানান, আসনটি বেশিরভাগ সময় বৃহৎ দলগুলো তাদের জোটের প্রার্থীদের জন্য ছেড়ে দেওয়ায় এলাকার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। তবে এবার এ আসনের ভোটাররা আশায় বুক বেঁধেছিলেনÑহয়েতো আসনটি থেকে বিএনপি ধানের শীষ প্রতীকে তাদের প্রার্থী দেবে। কিন্তু তা না হয়ে আবারও জোটের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে এ এলাকার ভোটাররা অনেকটা আশাহত হয়েছেন।

আশুগঞ্জের বাহাদুরপুর গ্রামের খাইরুল ইসলাম বলেন, ধানের শীষ প্রতীক না থাকায় বিএনপির পদধারী নেতারা তাদের জোটের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবীবের পক্ষে কাজ করলেও তৃণমূলের অনেক কর্মী রুমিন ফারহানার পক্ষে কাজ করছেন, যা ভোটের লড়াইয়ে প্রভাব ফেলবে।

খোলাপাড়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম জানান, এলাকায় দুজন প্রার্থীরই প্রচার রয়েছে। সাধারণ ভোটাররাও অনেকটা দ্বিধাগ্রস্ত। একদিকে বিএনপি জোটের প্রার্থী, অন্যদিকে বিএনপির এক সময়ের দাপুটে নেত্রী রুমিন ফারহানা। এ কারণে ভোটের লাড়াইয়ে ফলাফল কার পক্ষে যায়, তা আগে থেকে বলা কঠিন।

সরাইল উপজেলার অরুয়াইল গ্রামের মোশাররফ হোসেন বলেন, আগের নির্বাচনগুলোয় আঞ্চলিকতার কারণে উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু তিনি না থাকায় এবারের নির্বাচনে ভাটি অঞ্চলের ভোটের ওপর নির্ভর করবে জয়-পরাজয়। এছাড়া তরুণ ভোটারদের ওপর যিনি ইতিবাচক প্রভাব যারা ফেলতে পারবেন, তিনিই জয় ছিনিয়ে নেবেন।

শাহবাজপুর এলাকার গৃহিণী ফাতেমা বেগম বলেন, ‘আগের দিনগুলোয় আমাদের এলাকার কোনো উন্নয়ন হয়নি। এবার মহিলারা আবেগ দিয়া না, বিবেক দিয়া চিন্তা কইরা ভোট দেব। তবে শুনতাছি রুমিন ফারহানার অবস্থা ভালা।’

নির্বাচনের সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হলে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস দেখলে দেখা যায় নির্বাচনের মাঠে পেশিশক্তি এবং কালো টাকা কাজ করে। বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর যেকোনো উপায়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার চেষ্টা থাকে। আমি যেহেতু স্বতন্ত্র প্রার্থী, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী বড় একটি দলের যে প্রার্থী রয়েছেন তিনি নির্বাচনের আগে যেকোনো কিছুই করতে পারেন। সেজন্য নেতাকর্মী ও ভোটারদের বারবার সাবধান করা এবং আমার পক্ষে যে গণজোয়ার উঠেছে তা অনেকের ভয়ের কারণ। তাই আমি তাদের সতর্ক হতে বলিÑকেউ যেন ভোট চুরি করতে পারে।

তিনি আরো বলেন, আপানার দেখেছেন ইতোমধ্যে প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব লক্ষ করা যাচ্ছে। আমি উঠান বৈঠক করার কারণে তিন দফায় ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী নির্বাচনি প্রচার শুরুর আগেই বড় বড় স্টেজ করে সমাবেশ করেছেন, ভোট চেয়েছেন। দোয়া মাহফিলের নামে আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়েছেন। অথচ প্রশাসন নীরব, কানা-বোবার মতো আচরণ করেছে।

তিনি বলেন, আমার পক্ষে যে গণজোয়ার উঠেছে তা সবার জানা। আমি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে ভোটার এবং কর্মী-সমর্থকদের সতর্ক ও সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছি আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি বিকাল থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রত্যেককে যার যার কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার জন্য। শুধু তাই নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিদেশি কূটনীতিকদের নজরদারি থাকবে। আমি আশাবাদী, যদি কোনো পেশিশক্তি ভোট ডাকাতি করতে না পারে তাহলে আমি বিপুল ভোটে জয়ী হব। কারণ হাঁস হচ্ছে শান্তির প্রাতীক, হাঁস হচ্ছে ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতীক। তাই এবারের ভোট হবে হাঁসের পক্ষে।

এদিকে ভোট নিয়ে রুমিন ফারাহান বিভিন্ন সময় যে শঙ্কার কথা বারবার তুলে ধরছেন, সেসবকে কাল্পনিক, বানোয়াট, মিথ্যাচার এবং অতিরঞ্জিত বলে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপি জোটের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবীব। তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানা ছাড়া আরো অনেক প্রার্থী আছেন। তারা এ ধরনের কোনো শঙ্কার কথা বলছেন না কিংবা দেশের কোথাও প্রার্থীদের এমন কোনো শঙ্কা নেই। তাহলে তিনি কেন বারবার এসব বলেন? আমি মনে করি তিনি কারো ইন্ধনে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতে কোনো একটি মিশন নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন।

তিনি আরো বলেন, মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই বিএনপির কর্মী-সমর্থকসহ আমার ভক্তরা আমার পক্ষে গণজোয়ার তুলেছেন। আমি প্রায় ৫০ বছর ধরে সরাইল-আশুগঞ্জের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সবাই আমাকে চেনেন। যেহেতু আসনটি বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা, তাই এখানে প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে বিএনপি এবং আমার দলের নেতাকর্মীরা সাংগঠনিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বুধন্তী ইউনিয়নে আমার একটি নির্বাচনি ক্যাম্প করা হয়েছিল। কিন্তু আচরণবিধির কথা বলে প্রশাসন সেটি ভেঙে দেয়। অথচ আচরণবিধি মেনেই ক্যাম্পটি করা হয়েছিল। প্রশাসনের এ ভূমিকার কারণে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সর্বস্তরের আলেম-ওলামারা আমাকে সমর্থন জানিয়েছেন। আমি আশাবাদী, নির্বাচনে বিএনপি জোটের খেজুর গাছের বিজয় সুনিশ্চিত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...