জীবন ভীষণ সুন্দর। জটিলতা আরো ভয়ংকর সুন্দরের জন্ম দেয়। তবে জটিলতার কারণে মন ভেঙে যায়। এতে তার প্রভাব শারীরিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রেই পড়ে। এ সময় পরিবারের মানুষজন এবং বন্ধুবান্ধব সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও অনেক সময় কাজে আসে না। মানবজীবনের বাস্তবতায় দেখা যায়, এ সময় একা কোথাও থেকে বেরিয়ে আসা বরাবরই ফলপ্রসূ হয়। কারণ একা ভ্রমণ করলে অতীতকে ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়া সহজতর হয়। অনেক নিত্যনতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া যায়। এগুলো জীবনের অর্থ পাল্টে দেয়, নানা দুশ্চিন্তায় কমে যাওয়া আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। নতুন মানুষ ও নতুন স্থানের সঙ্গে পরিচয় পুরোনো বিষণ্ণ স্মৃতি ভুলিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনে। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের গল্প শুনে মনে সান্ত্বনা পাওয়া যায়। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সাহস সঞ্চার হয়। একা ভ্রমণের মাধ্যমে নিজের অনেক গুণ আবিষ্কার করা যায়, যেগুলো কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। নতুন অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জনের কারণে ভবিষ্যৎ নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। একা থাকার কারণে নিজের পছন্দ অনুযায়ী কাজ করা যায়। অবশ্য একাকী ভ্রমণ বেশি দিনের না হওয়াই ভালো। সেক্ষেত্রে একাকিত্ব বিষণ্ণতার আরেকটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৪০ বছর বয়সে পদার্পণের ঠিক প্রথম দিন থেকেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মাথার ওপর যে গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়, তা পালন করতে গিয়ে লাগাতার ১০টি বছর তাকে নানা কটু কথা, গালাগাল, মানসিক চাপ ও শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। লাগাতার তিন বছর তাকে অনুসারী এবং আত্মীয়-স্বজন নিয়ে অসহনীয় মানবেতর জীবন অতিবাহিত করতে হয়। সেই জীবন থেকে যখন কিছুটা নিষ্কৃতি পাওয়া যায়, তখনই সমাজের আঘাতের ঢালস্বরূপ প্রাণপ্রিয় পিতৃতুল্য চাচার ছায়া উঠে যায়। এই শোকের ব্যথা মন থেকে এবং নীরব কান্নার অশ্রু চোখ থেকে শুকাতে না শুকাতেই ঘরে এসে যেই প্রিয়তমা সহধর্মিণীর আঁচলতলে কিছুটা আশ্রয় নিতেন, তিন দিনের মাথায় তিনিও ওপারে চলে যান। দায়িত্ব পালনের স্বার্থে নিজ এলাকা ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় যখন পয়গাম পৌঁছাতে যান, সেখানেও পাগল বলে পেছন থেকে ধাওয়া করা হয়। কঙ্কর-পাথর নিক্ষেপ করে আপাদমস্তক দেহ রক্তরঞ্জিত করা হয়। বারবার বেহুঁশ হয়েও কোনো ছাড় পাননি। ভগ্ন হৃদয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। এভাবে তার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে এবং মানসিকভাবে তিনি হাঁপিয়ে ওঠেন।
এক দায়িত্ব পালন করার পর থেকে এই যে এতগুলো অমানবিক যন্ত্রণা ও কষ্ট বুকে চেপে ছিল, সেজন্য স্বাভাবিকভাবেই রক্ত-মাংসের একজন মানুষের মনে হতাশা, ব্যর্থতার গ্লানি এবং দুশ্চিন্তার দানা বাঁধতেই পারে। প্রশস্ত হৃদয়ও এসব ডিপ্রেশনে সংকীর্ণ হয়ে যায়। হৃদয়ের মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর বন্ধুর মনকে এসব চাপ ও প্রেশার থেকে মুক্ত করতে এবং তার মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই সৃষ্টিজগতের অনুপম ও অদ্বিতীয় ইতিহাস রচনা করেন এক নিশিরাতের ইসরা ও মেরাজের মাধ্যমে। মৌলিকভাবে এটিই ইসরা ও মেরাজের প্রধান রহস্য।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তায়ালা এই মোজেজার মাধ্যমে তার কাছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মর্যাদা ও অবস্থান সৃষ্টিজগতের সামনে প্রকাশ করেছেন। তাকে এত কাছে টেনে নিয়েছিলেন যেখানে তিনি লাওহে কলমের লেখার আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন। নবী-ফেরেশতা কোনো মাখলুক সেখানে পৌঁছাতে পারে না। আল্লাহ তায়ালার এত কাছাকাছি হয়েছিলেন যে, তাকে তিনি সরাসরি দেখেছিলেন বলেও কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়।
তৃতীয়ত, মসজিদে আকসায় সব নবীর ইমামতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে নবীদের ইমাম ও নেতা বানিয়েছেন। তার শরিয়তের মাধ্যমে সব শরিয়তকে রহিত করেছেন এবং পরিষ্কার করে দিয়েছেন, কেয়ামত পর্যন্ত আগত সবাইকেই তার শরিয়তের অনুসরণ করতে হবে।
চতুর্থত, অদৃশ্য বিষয় যুক্তির মাধ্যমে বোধগম্য হয় না, যে কারণে মানবমনে নানা ধরনের প্রশ্নের উদয় হয়। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রদানের জন্যই আল্লাহ তায়ালা তাকে অদৃশ্য জগতের বহু নিদর্শন দেখিয়েছেন। জান্নাত-জাহান্নাম দর্শন করিয়েছেন। সাত আসমানে নবী-রাসুলদের সাক্ষাৎ লাভ করিয়েছেন। তার চাক্ষুষ দর্শনের মাধ্যমে উম্মতি মুহাম্মদি অদৃশ্য জ্ঞানভান্ডার লাভ করেছে।
পঞ্চমত, আল্লাহ তায়ালা নিজের কুদরত, ওহির সত্যতা বোঝানো এবং প্রমাণ করার জন্য নবীকে জান্নাত-জাহান্নামসহ বহু কিছু দর্শন করিয়েছেন। যেগুলোর ওয়াদা তিনি ওহিতে মুমিন ও কাফের বান্দাদের জন্য দিয়েছেন।
ষষ্ঠত, ভ্রমণ শুরুর আগে চতুর্থবারের মতো তার ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়। এর মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার পবিত্র দিদার লাভের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। যেই দিদার রাসুলুল্লাহ (সা.) আরশে মুআল্লায় গিয়ে লাভ করেছেন।
সপ্তমত, জান্নাতি পশু বোরাক ভ্রমণের বাহন হিসেবে পাঠিয়ে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার বুকে তাঁর সম্মান আরো বৃদ্ধি করেছেন।
অষ্টমত, বাইতুল মুকাদ্দাসে তাঁর ইমামতি সম্পন্ন করার মাধ্যমে বায়তুল মুকাদ্দাসের প্রতি প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে টান ও আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন। এটি প্রথম কিবলা হিসেবে এর সুরক্ষায় যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহকে প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
নবমত, এই ইমামতির মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা শরিয়তে মুহাম্মদিকে সর্বজনীন এবং সর্বকালীন করে দিয়েছেন এবং বুঝিয়েছেন সব নবীর ইসলাম ও দ্বীন এক।
লেখক : শিক্ষক, ওয়ামী মডেল মাদরাসা, সফিপুর, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

