সাহরি—রাতের শেষভাগে খাওয়া হয় এমন খাবার। মহান আল্লাহ রোজার উদ্দেশ্যে ভোরে সাহরি খাওয়ার বিধান দিয়েছেন। সাহরি খাওয়ার প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.) উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং এটিকে বরকতময় বলে আখ্যায়িত করেছেন। এটি মুসলমানদের বৈশিষ্ট্যও বটে।
সাহরির সময়
সাহরি হলো ভোরের একটু আগের খাবার। আল্লামা যামাখশারী (রহ.) বলেন, রাতের ছয় ভাগের শেষ ভাগ সাহরির সময়। মোল্লা আলি কারি (রাহ.) বলেন, রাতের অর্ধাংশের পর থেকেই সাহরির সময় শুরু হয় এবং ফজরের পূর্ব পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে (মিরকাতুর মাফাতিহ, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪১৬)। সাহরির সময় শুরু হওয়ার ব্যাপারে মতপার্থক্য থাকলেও এর সমাপ্তির ব্যাপারে সবাই একমত। তা হলো সুবহে সাদিক তথা ফজরের সময় শুরু হওয়া মাত্রই সাহরির সময় শেষ হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা খাও ও পান করো যতক্ষণ রাতের কালো রেখা হতে উষার সাদা রেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের কাছে প্রতিভাত না হয়। অতঃপর রাত আগমন পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭) কাজেই সাহরির সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পর পানাহার করলে নিঃসন্দেহে রোজা ভেঙে যাবে।
সাহরির ফজিলত
আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮২৩; মুসলিম, হাদিস : ২৬০৩। আমর ইবন আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমাদের ও কিতাবধারীদের (ইহুদি-খ্রিষ্টান) রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো, সাহরি খাওয়া।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬০৪) ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা সাহরি গ্রহণকারীদের প্রতি রহমতের জন্য প্রার্থনা করেন।’ (ইবন হিব্বান, হাদিস : ৩৪৬৭)
সাহরিতে যা খাওয়া যায়
সাহরি বরকতময় খাবার। বরকতময় হওয়ার অর্থ এই নয় যে, খুব বেশি করে সাহরি খেতে হবে। এক ঢোক পানি পান করলেও সাহরির সুন্নত আদায় হয়। (ইবন হিব্বান, হাদিস : ৩৪৭৬) খেজুর দিয়েও সাহরি খাওয়া যায়। নবী (সা.) এটিকে মুমিনের সাহরির উত্তম খাবার বলে আখ্যায়িত করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুমিনের উত্তম সাহরি হলো- খেজুর।’ (আবু দাউদ : ২৩৪৭)
শেষ সময়ে সাহরি খাওয়া
সুন্নত হলো, দেরি করে সাহরির শেষ সময়ের কাছাকাছি সাহরি খাওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা শেষ সময়ে সাহরি খেতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহরি ও ফজর নামাজের মধ্যে ৫০ আয়াত পাঠ করার মতো সময়ের ব্যবধান থাকত। যায়দ ইবন সাবেত (রা.) থেকে বর্ণিত, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে সাহরি খেয়েছি। অতঃপর (ফজরের) নামাজ পড়েছি। আমি (আনাস) বললাম, সাহরি ও নামাজের মধ্যে কতটুকু সময় ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, ৫০ আয়াত তেলাওয়াত পরিমাণ।’ (বুখারি : ১৮২১; মুসলিম : ২৬০৬) আমর ইবন মায়মুন আল-আওদী (রা.) থেকে বর্ণিত, মুহাম্মাদ (সা.) এর সাহাবিরা (সময় হলে) তাড়াতাড়ি ইফতার করতেন আর দেরিতে (সাহরির শেষ সময় পর্যন্ত) সাহরি খেতেন।’ (আল-মুসান্নাফ : ৯০২৫; মুসান্নাফু আব্দির রায্যাক : ৭৫৯১) ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার পূর্বক্ষণে সাহরি খেলে রোজা রাখতে অধিকতর সহজ হয় এবং ফজর নামাজ আদায় করার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে কষ্ট করতে হয় না। সতর্কতা অবলম্বন করে ফজরের অনেক আগে সাহরি শেষ করা সুন্নত নয়।
সাহরি ও ফজরের আজান
সাহরির সময় শেষ হওয়া মাত্রই পানাহার শেষ করতে হবে। আজান দেওয়া-না দেওয়া কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। কারণ এটি কোরআনের অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সময় তাহাজ্জুদ ও সাহরির সময় একবার আজান দেওয়া হতো। যেটি ছিল মূলত ঘুম থেকে জাগ্রত করার জন্য। এরপর ফজরের সময় হওয়ামাত্র ফজরের আজান দেওয়া হতো।
বেলাল (রা.) তাহাজ্জুদ ও সাহরির সময় আজান দিতেন আর অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন উম্মি মাকতুম (রা.) ফজরের আজান দিতেন। এজন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) আব্দুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রা.)-এর আজান শোনা পর্যন্ত পানাহার করতে বলতেন। আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বেলাল রাতে আজান দেয়। তোমরা খাও ও পান করো যতক্ষণ না ইবন উম্মে মাকতুমের আজান শুনতে পাও।’ (বুখারি : ২৫১৩; মুসলিম : ২৫৮৯)
সাহরি ও ফজর নামাজ
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহরি ও ফজর নামাজের মধ্যে ৫০ আয়াত পাঠ করার মতো সময়ের ব্যবধান থাকত। ৫০ আয়াত তেলাওয়াত করতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে। কাজেই শেষ সময়ে সাহরি খেয়ে তারপর ফজরের আজান হলে ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর ফজর নামাজ আদায় করলে সব সুন্নত আদায় হয়ে যায়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

