আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সময় ব্যবস্থাপনায় মনীষীদের শিক্ষা

শারমিন আকতার

সময় ব্যবস্থাপনায় মনীষীদের শিক্ষা

‘Time Management is really Life management’ অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে সময় ব্যবস্থাপনাই হচ্ছে জীবন ব্যবস্থাপনা।’ Brain Tracy তার বিখ্যাত Time Management গ্রন্থে এই কথা উল্লেখ করেন । আসলেই মুসলিম বা অমুসলিম যাই বলেন না কেন, যে তার সময়ের সুন্দর ব্যবহার করতে পারে, সেই তার জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারে ।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি কিয়ামত শুরু হয়ে যায় আর তোমাদের কারো হাতে একটা গাছের চারা থাকে এবং সে তা রোপণ করতে সক্ষম, তার উচিত তা রোপণ করে ফেলা।’ (মুসনাদে আহমদ : ১২৯০২) আমাদের অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে- কিয়ামতের মতো এমন কঠিন মুহূর্তে আল্লাহর রাসুল কেন মুসলিমদের চারা রোপণেও অবহেলা করতে না করলেন, যেই চারা রোপণ করে তার ফল কেউ ভোগ করতে পারবে না! এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইউসুফ আল-কারজাভি (রহ.) বলেন, ‘এমন অবস্থায় চারা রোপণের আদেশ প্রদানের মাধ্যমে রাসুল (সা.) মূলত প্রত্যেকটি সময় যথাযথ ব্যবহারে গুরুত্ব দিয়েছেন । অতীত বা ভবিষ্যৎ যাই হোক, চলমান মুহূর্তটি সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।’ [মুমিন জীবনে সময়, পৃষ্ঠা : ৮৭]

বিজ্ঞাপন

মুসলিমরা তাদের প্রতিটি সময় এত সচেতনতার সঙ্গে ব্যয় করবে যে কিয়ামত এলেও সময়ের সঠিক ব্যবহারের ব্যাপারে সচেতন থাকার ইঙ্গিত রয়েছে । একজন মুমিনের দৈনন্দিন জীবন কেমন হওয়া উচিত? ইউসুফ আল-কারজাভি বলেন, ‘কোনো মুসলিম যদি বরকতময় সময় পেতে চায়, তাহলে তাকে ইসলাম-নির্ধারিত দৈনন্দিন জীবন পদ্ধতির পথে হাঁটতে হবে । এই জীবন পদ্ধতির দাবি হলো সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা এবং আগেভাগে ঘুমাতে যাওয়া ।’ [মুমিন জীবনে সময়, পৃষ্ঠা : ৪৪]

ভোরে আল্লাহর রাসুল তার উম্মতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ আমার উম্মতের জন্য ভোরবেলায় বরকত বর্ষণ করো ।’ (আবু দাউদ : ২৬০৬)

বর্তমান সময়ে মুসলিমরা আর ভোরের সময়ে কল্যাণ তালাশ করে না । তারা রাতের বেলা অহেতুক কাজে ব্যস্ত থেকে নিজের গুরুত্বপূর্ণ রাতের সময় ব্যয় করে অনেক রাতে ঘুমাতে যায় । আর সকালে উঠে হয় ফজরের পড়ে, নয়তো পড়িমরি করে কোনোমতে ফজরের নামাজ আদায় করে আবার লম্বা ঘুম দেয় দিনের কাজ শুরু করার আগে আগে । আলাদা করে অতিরিক্ত কাজ বা পরিশ্রম করার, জ্ঞান অর্জন করার বা একটু বেশি ইবাদত করার সময় তার হাতে কোথায়?

বর্তমান সময়ের মুসলিমদের এহেন দুর্দশা দেখে ইউসুফ আল-কারজাভি বলেছেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলমানরা তাদের দিনের রুটিন বদলে ফেলেছে। তারা গভীর রাত পর্যন্ত জাগ্রত থাকে । ফলে ফজর কাজা হয়ে যায় । সালাফরা অনেকে আশ্চর্য হয়ে বলতেন, ‘যে সূর্যোদয়ের পর ফজর পড়ে, সে কীভাবে রিজিকপ্রাপ্ত হয়! আশ্চর্য ।’” [মুমিন জীবনে সময়, পৃষ্ঠা : ৪৫]

মুসলিমদের উচিত প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে কর্মময় জীবনযাপন করা । মধ্যযুগে মুসলিমদের যে জয়জয়কার ছিল, তার প্রধান কারণ ছিল তারা সময়ের সঠিক ব্যবহার করেছেন । তারা হেলায় এক মুহূর্তও নষ্ট করতেন না ।

সময়ের সঠিক ব্যবহারের অভাবে আমরা আজ দ্বীনি বা দুনিয়াবি কোনো কাজই সঠিকভাবে করতে পারিনি । অথচ একসময় আল্লাহর রাসুল (সা.) এবং তার সাহাবিরা রাতে তাদের সময় ব্যয় করেছেন জায়নামাজে আর দিনে করেছেন যুদ্ধের ময়দানে। তারা একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করেছেন, সমাজসেবা করেছেন, দ্বীনের দাওয়াতি কাজ করেছেন, পরিবার সামলিয়েছেন । মধ্যযুগের স্বর্ণালি সময়ে ইবনে খালদুন, ইবনে সিনা, আল খোয়ারিজমি, জাবির ইবনে হাইয়ানরা দ্বীন ও দুনিয়ার কাজ একসঙ্গে সামলিয়ে পৃথিবী সেরা হয়েছিলেন। সমগ্র পৃথিবীর জন্য কল্যাণ ও উন্নয়নের পথিকৃৎ হয়ে ছিলেন তারা । তাদের অবদানের ওপর ভিত্তি করেই আজ ইউরোপ ও আমেরিকা উন্নত সভ্যতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

আমরা নানাভাবে আমাদের সময়কে হেলায় নষ্ট করে ফেলি । ইউসুফ আল-কারজাভির মতে, আমাদের সময় নষ্টের অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অন্যমনস্কতা ও ভবিষ্যতের জন্য রেখা দেওয়া । অনেক সময় আমরা এমন করি, কোনো কাজ এখনই করা প্রয়োজন কিন্তু আমরা সেটা আগামীকাল করব এই প্রত্যাশায় ফেলে রাখি । সেই আগামীকাল আর কখনো আসে না । আর আমাদের সেই কাজও আর সফলভাবে সম্পন্ন হয় না । আর এভাবে অনবরত সঠিকভাবে কাজ সম্পাদনের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যও অধরা রয়ে যায়। আর এভাবে আমরা মুসলিমরা পিছিয়ে পড়তে পড়তে যুগের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছি ।

একবার উমর ইবনে আব্দুল আজিজ এক দিন কাজের চাপে খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাকে বলা হলো, ‘আজ রাখুন বাকিটা কাল সেরে নিতে পারবেন ।’ তিনি উত্তর দেন, ‘এক দিনের কাজ আমাকে কাবু করে ফেলেছে । তাহলে দুদিনের কাজ একসঙ্গে জমা হলে কী হবে?’ [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ১০৬]

ইবনে আতা তার ‘হিকাম’ গ্রন্থে বলেন, ‘সময়ের মাঝে কিছু অধিকার আদায় সম্ভব, কিন্তু সময়ের অধিকার আদায় সম্ভব নয় । আল্লাহর কসম! প্রত্যেকটি নতুন সময়ে নতুন কিছু কর্তব্য এবং জরুরি কিছু বিষয় রয়েছে । তাহলে কীভাবে অন্য সময়ের কর্তব্য সেই সময়ে আদায় করবে? সেই সময়ে আল্লাহর প্রতি কর্তব্যগুলো কোথায় যাবে?’

ইউসুফ আল-কারজাভি মুসলিম সমাজে প্রচলিত এক প্রসিদ্ধ প্রবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘দুনিয়ার সঙ্গে এমন আচরণ করো, যেন তুমি সর্বদা বেঁচে থাকবে । আর আখিরাতের সঙ্গে এমন আচরণ করো, যেন কালই তোমার মৃত্যু হবে ।’

আমিরুল মোমেনিন উমর ইবনে খাত্তাব বলতেন, ‘তোমরা পরকালীন হিসাব-নিকাশের আগেই নিজেদের হিসাব করে নাও । তোমাদের কর্ম দ্বারা তোমাদের ওজন দেওয়ার আগেই নিজ নিজ কর্মকে ওজন দিয়ে নাও ।’

আসলে সময়ই জীবন । আমরা যদি সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে পারি, তাহলে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় কল্যাণ লাভ করা সম্ভব । সবশেষে ইউসুফ আল-কারজাভির উক্তি দিয়ে শেষ করতে চাই, ‘কর্মই হলো জীবিত মানুষের মিশন । যে মানুষ কোনো কাজ করে না, তার জীবিত থাকার অধিকার নেই । যতক্ষণ তার মাঝে জীবনের স্পন্দন আছে, ততক্ষণ তাকে কোনো না কোনো কাজ করতেই হবে; হোক তা দ্বীনি বা দুনিয়াবীবি।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়: