আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দ্বীন প্রতিষ্ঠায় নারী সাহাবি

প্রথম শহীদ সুমাইয়া বিনতে খাব্বাত (রা.)

এমরানা আহমেদ

প্রথম শহীদ সুমাইয়া বিনতে খাব্বাত (রা.)

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম শহীদ এবং প্রথম মহিলা শহীদ হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন সুমাইয়া বিনতে খাব্বাত (রা.)। ইসলামের দাওয়াতের সূচনাকালে ইসলাম গ্রহণের কারণে তাকে মক্কার কুরাইশদের নির্মম অত্যাচারের শিকার হতে হয়। সুমাইয়া ছিলেন ইয়াসির ইবনে আমিরের স্ত্রী এবং প্রসিদ্ধ সাহাবি আম্মার ইবনে ইয়াসিরের মাতা। আম্মার ছিলেন ইসলামের প্রথম মসজিদ স্থাপনকারী। তাদের পুরো পরিবারই প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। কুরাইশরা তাদের পরিবারের সবাইকে লোহার বর্ম পরিয়ে প্রচণ্ড রোদে দাঁড় করিয়ে রাখত। সুমাইয়াকে শুইয়ে দিত তপ্ত বালুর ওপর। মাথার ওপর থাকত সূর্যের প্রখর উত্তাপ। এ অবস্থায় কেটে যেত সারা দিন। সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফিরিয়ে এনে এ নতুন দ্বীন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ দেওয়া হতো। পরদিন এসে কাফেররা নিরাশ হতো। আবার শুরু হতো নির্যাতন। আরো বাড়িয়ে দিত কঠোর শাস্তির মাধ্যমে তার ওপর নির্যাতনের মাত্রা। শেষ পর্যন্ত আবু জাহেলের হাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কাফেরদের কথা না শোনার কারণে তাঁর ওপর নেমে এসেছিল নির্যাতনের স্টিমরোলার। কিন্তু ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে স্বামী ও পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে তিনি অটল থাকলেন সত্যের পথে।

বিজ্ঞাপন

শুরুর দিকে সুমাইয়া বিনতে খাব্বাত মক্কার আবু হুজাইফা বিন আল-মুগিরা আল মাখজুমির দাসী ছিলেন। তিনি ছিলেন আবিসিনীয় (বর্তমান ইথিওপিয়া) কৃষ্ণাঙ্গ দাসী। সেই সময় প্রচলিত বংশমর্যাদার সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, সুমাইয়া নীচকুলজাত মহিলা ছিলেন; কিন্তু চিন্তা ও বিবেকবুদ্ধির দিক থেকে আরবের যে কোন শরিফ নারীর চেয়ে কম ছিলেন না। তিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের চেয়ে প্রিয় বস্তু দুনিয়ায় আর কিছু নেই।

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) যাত্রাপথে আম্মার ইবনে ইয়াসিরের পরিবারকে শাস্তি দিতে দেখেন। রাসুল (সা.) তাতে খুব ব্যথিত হন। তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সেই সঙ্গে জান্নাতের সুসংবাদ দেন।

ইমাম আহমাদ ও ইবনে মাজাহ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেন, সর্বপ্রথম যে সাতজন প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দান করেন, সুমাইয়া বিনতে খাব্বাত ছিলেন তাঁদের অন্যতম।

অন্যদিকে তাঁর স্বামী ইয়াসির ইবনে আমির ইয়েমেনের মাজহাজ গোত্রের আনসী শাখার সন্তান ছিলেন। ইয়াসির মক্কায় এসে আবু হুজাইফা ইবনে আল মুগিরা আল মাখজুমির সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হন। আবু হুজাইফা তাঁর দাসী সুমাইয়াকে ইয়াসিরের সঙ্গে বিয়ে দেন এবং এই ঘরেই আম্মার ইবনে ইয়াসিরের জন্ম হয়। মক্কায় ইসলামের দাওয়াতের সূচনা হলে সুমাইয়া প্রথমভাগেই স্বামী ইয়াসির ও ছেলে আম্মার ইবনে ইয়াসিরসহ গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন। ইসলাম গ্রহণের ঘোষণার পর সুমাইয়া ও তাঁর পরিবার কুরাইশদের অত্যাচারের রোষানলে পড়ে। মক্কায় সুমাইয়ার পরিবারের ওপর কুরাইশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাহায্য করার মতো কেউই ছিল না (যেহেতু তারা বহিরাগত ও দাস ছিলেন)। তাই তারা বহু নির্মম অত্যাচারের শিকার হন। মক্কার আবু জাহেল ও তার সঙ্গী কুরাইশরা সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত অত্যাচার করত। তবে নবী (সা.) তার চাচা আবু তালিব ও আবু বকরের দ্বারা তাদের নিরাপত্তার চেষ্টা করেন।

আবদুল্লাহ ইবনে জাফর বলেন, মুহাম্মদ (সা.) তাঁদের এই অসহায় অবস্থা দেখে সান্ত্বনা দিতেন এবং বলতেন, ‘হে ইয়াসিরের পরিবারবর্গ ধৈর্য ধরো! তোমাদের জন্য জান্নাত নির্ধারিত রয়েছে।’

একদিন প্রতিদিনের মতো সারা দিন অত্যাচার সহ্য করে বাড়ি ফেরার পর এক সন্ধ্যায় আবু জাহেল অশালীন ভাষায় গালাগাল করার একপর্যায়ে সুমাইয়া বিনতে খাব্বাত (রা.)-এর দিকে বর্শা ছুড়ে মারে। সেই বর্শার আঘাতে ৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে এই মহীয়সী নারী ইসলামের ইতিহাসে প্রথম শহীদ হিসেবে শাহাদাত লাভ করেন। তাঁর স্বামী ইয়াসির ইবনে আমির এবং ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনে ইয়াসিরও কাফেরদের নির্মম ও অমানুষিক অত্যাচারের শিকার হয়ে শাহাদাতবরণ করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন