রমজান মাস মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ সময়। গোটা মাসটাই আমলের মৌসুম তবে এই মাসের শেষ দশ দিন আরো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ সময়ে মহাত্বপূর্ণ একটি ইবাদত রয়েছে, সেটা হলো—ইতিকাফ। ইতিকাফের মাধ্যমে একজন মুমিন কিছু দিনের জন্য দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে নিজেকে আলাদা করে আল্লাহর ইবাদতে নিবিষ্ট হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করেছেন। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন, তার ওফাত পর্যন্ত এই নিয়ম চালু ছিল। এরপর তার সহধর্মিণীগণও (সে দিনগুলোতে) ইতিকাফ করতেন। (বুখারি, ২০২৬; মুসলিম, ১১৭২)।
ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য হলো অন্তরকে আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে নিবন্ধ করা এবং দুনিয়ার ব্যস্ততা, পাপাচার ও ধোঁকা থেকে দূরে থাকা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে সহবাস করো না। (সূরা বাকারা, ১৮৭) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইতিকাফ এমন একটি অবস্থা যেখানে মানুষ দুনিয়াবি কাজ, চাহিদা ও সম্পর্ক থেকে নিজেকে বিরত রেখে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টায় মগ্ন হয়।
ইতিকাফের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ মহাত্ব হলো—এর মাধ্যমে নিশ্চিতভাবেই লাইলাতুল কদর পাওয়া যায়। আর লাইলাতুল কদর হলো হাজার মাসের চেয়েও উত্তম একটি রাত। আল্লাহ তায়ালা এ রাতে পবিত্র কুরআন নাজিল করেছেন (সুরা কদর, আয়াত-১-৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর। (বুখারি, ২০২০)
ইতিকাফকারী গোনাহমুক্ত পরিবেশে থাকার সুযোগ পায়। শরীয়তের দৃষ্টিতে, ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে কেবল অবস্থান করাটাও ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়, যদি এ সময় কেউ কোনো আমল নাও করে।
কিন্তু বর্তমান যুগের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো—মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট। অনেক সময় দেখা যায়, কেউ মসজিদে ইতিকাফে বসেছেন, কিন্তু তার অধিকাংশ সময় কাটছে মোবাইল ব্যবহার করে—সোশ্যাল মিডিয়া দেখা, অপ্রয়োজনীয় আলাপ করে বা বিভিন্ন খবর পড়ার মাধ্যমে। এর ফলে ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইসলামের সৌন্দর্যের একটি দিক হলো, মানুষ অনর্থক বিষয় পরিত্যাগ করবে। (তিরমিজি, ২৩১৭)
ইতিকাফে বসে যদি আমরা অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি বেশি মোবাইল ব্যবহার করি, তাহলে তা অনেকাংশে এই হাদিসের শিক্ষার বিপরীত হয়ে যায়। তাই বিজ্ঞা আলেমগণ পরামর্শ দিয়েছেন—ইতিকাফকে ডিভাইসমুক্ত রাখা উত্তম। যদি খুব প্রয়োজনে কোনো ডিভাইস সাথে নিতেও হয়, সেক্ষেত্র আমরা আমাদের ডিভাইসে বিভিন্ন সিকিউরিটি অ্যাপস ইনস্টল করে রাখতে পারি—যাতে অযাচিত কোনো ছবি বা ভিডিও সামনে না আসে।
এক্ষেত্রে কাহাফ গার্ড নামের একটি মোবাইল অ্যাপলিকেশন বর্তমানে বেশ সাড়া জাগিয়েছে, আমরা এটা ডিভাইসে ইনস্টল করে রাখতে পারি।
Kahf Guard-এর কার্যকতারিতা হলো, কোনো ডিভাইসে এই অ্যাপলিকেশনটি ইনস্টল করা থাকলে লক্ষ লক্ষ পর্নোগ্রাফিক সাইটসহ খারাপ বা অশ্লীল ছবি ও ভিডিওকে DNS লেভেলে ব্লক করে দেয়। সুতরাং মোবাইল বা ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও অযাচিত কোনো কিছু সামনে আসার কোনো সুযোগ আর থাকবে না। এছাড়া Kahf Browser নামের একটি সেবাটি গ্রহণ করতে পারি। এটা মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একটি হালাল ব্রাউজিং সেবা। ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে গেলে অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবেই অনুপযুক্ত বা অশ্লীল ছবি বা ভিডিও চোখের সামনে আসে। Kahf Browser এই অনিচ্ছাকৃত এক্সপোজার থেকে ডিভাইসকে স্বংয়ক্রিয়ভাবে রক্ষা করার কাজটি করে থাকে। ওয়েবসাইটে থাকা অশ্লীল বা অনুপযুক্ত ছবি এবং ভিডিওতে থাকা অনুপযুক্ত দৃশ্যও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝাপসা হয়ে যায়।
ইতিকাফ আসলে এক ধরনের আধ্যাত্মিক রিট্রিট। এটি এমন সময় যখন একজন মুমিন আল্লাহর সাথে নিজের সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। যদি এই সময়টিও মোবাইলের পর্দায় কাটে বা অযাচিত ছবি বা ভিডিও দেখতে হয় তাহলে ইতিকাফের গভীরতা অনেকটাই হারিয়ে যায়। তাই আমাদের চেষ্টা করা উচিত—রমজানের শেষ দশ দিনের এই মূল্যবান আমলের সময়টিকে যতটা সম্ভব ডিভাইসমুক্ত রাখা।
রমজানের এই বরকতময় সময় আমাদের জীবনকে পরিবর্তন করার একটি সুবর্ণ সুযোগ। যদি আমরা সচেতনভাবে মোবাইল ও দুনিয়াবি বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকি, তাহলে ইতিকাফ সত্যিই আমাদের হৃদয়কে আলোকিত করতে পারে এবং অর্জিত হবে আল্লাহর নৈকট্য।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

