আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সময় এখন রমজান প্রস্তুতির

ড. মো. আব্দুল্লাহেল বাকী

সময় এখন রমজান প্রস্তুতির

যারা রমজানকে ভালোবাসেন, রমজান নিয়ে অনেক কিছু করতে চান, আলহামদুলিল্লাহ তারা রমজানের সুবাস পেতে শুরু করেছেন। যেমন একজন আম ব্যবসায়ী আমের সিজনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম বাগানের আমের মুকুল এলে সাভারে বসে এটার গন্ধ পায়। আমগাছের এক মুকুল থেকে আরেক মুকুলে মৌমাছি ঘুরে বেড়ায়, সেও তখন এখানে বসে একটু নাচানাচি করে, গুন গুন করে। একইভাবে সত্যিকার রমজান-প্রেমিকদেরও এখন একটু নড়েচড়ে ওঠার কথা। মা-বাবা-স্বামী-স্ত্রী-সন্তানসহ খুব কাছের যারা, তারা এটা টের পাওয়ার কথা।

সময় নির্বাচনের! নির্বাচনের সময় শুরু হয়েছে সেই কবে থেকে? কত আয়োজন, কত উদ্যোগ! কবে তা শেষ হবে? এ নির্বাচনের প্রভাব-ফল-ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কী, ১৩-১৪-২৮ ফেব্রুয়ারিতেই থেমে যাবে? নিশ্চয়ই না। যারা নির্বাচন নিয়ে বছর দেড়েক ধরে দিন-রাত পড়ে আছেন, তারা কি নির্বাচনের রেশ কাটিয়ে এত তাড়াতাড়ি রমজান প্রস্তুতির ভেতরে ঢুকে পড়তে পারবেন? নির্বাচনে বিজয়ী-বিজিত উভয়পক্ষই হুট করেই রমজানের বিষয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারবে?

বিজ্ঞাপন

১৮/১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান। তাহলে রমজান প্রস্তুতি শুরু হবে কবে? একটু ভাবুন, নির্বাচন বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে রমজান নিয়ে প্রস্তুতির কথা ভাবার সুযোগই দেয়নি। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারল না, সে চরম হতভাগা!!’ নির্বাচন থেকে যারা কিছুই পাবে না, তারা হয়তো এ নিয়ে আফসোস করতেও পারে। কিন্তু বিজয়ীরা কখনো রমজান হারানোর বেদনায় আফসোস করার সুযোগ পাবে না। নির্বাচনের ফল তাদের আরো অন্যরকম বিষয়ে ডুবিয়ে ফেলবে।

শুধু নির্বাচন নয়, এভাবেই প্রতিদিন-সপ্তাহ-মাস-বছর করে নানা বিষয়ে নানাভাবে আমরা নানা বিষয়ের মধ্যে ডুবে যাই। সময়ের ব্যবধানে আবার আরেক সময় আরেক বিষয়ে মেতে উঠি। রমজান নিয়ে প্রস্তুতি যার যে অবস্থায় থাকুক না কেন, রমজানের শেষদিকে ঈদ নিয়ে সবাই মাতামাতিতে লিপ্ত হবেই, তা যেকোনোভাবেই হোক না কেন।

সুরা বাকারার ২৩ রুকুতে রমজান সাফল্যে কোরআনের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। সে সূত্রে রমজান সাফল্যে প্রস্তুতির কিছু বিষয়-

১. রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত বিষয়ে স্বচ্ছ-সুস্পষ্ট-বিস্তারিত ধারণা অর্জন। বিশুদ্ধ বিষয় সঠিক উৎস থেকে জানা, এগুলো বারবার পড়া এবং বেশি বেশি চিন্তা করার কোনো বিকল্প নেই। একটি বিষয় ভালোভাবে উপলব্ধি করলে যে কেউই রমজান নিয়ে আনন্দের সাগরে দুলতে থাকবেন। সে দোলা তাকে চারপাশের অনেককেই আন্দোলিত করতে বাধ্য করবে।

২. রমজান সাফল্যের প্রস্তুতি বিষয়ে দ্বিতীয় বিষয় হলো-দোয়া। দোয়ার মাস-রমজানে যদি ঠিকমতো দোয়া করতে চাই, তাহলে দোয়াগুলো আগে শিখতে হবে। রমজানে শিখতে চাইলে পড়বেন কখনÑপাবেন কীভাবে? নিজে পারলে না অন্যকে খুব সহজেই দিতে পারবেন। নিজে না পারলে অন্যকে পারানোর চিন্তা করতে পারবেন না।

৩. রমজানের নামাজ-উপভোগ করতে হবে। সারাটা বছর নামাজ উপভোগ না করে, নামাজ উপভোগের কলাকৌশল আয়ত্ত না করে, রমজানে হঠাৎ করে নামাজ উপভোগ করার চিন্তা খুবই একটা বেমানান বলে মনে করি। যেকোনোভাবে নামাজ উন্নয়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। নিজের কাজে লাগছে এমন একটি বিষয়ও আয়ত্ত করলে সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের আপনজনদের তা দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।

৪. রমজানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোজা। মুহাম্মদ (সা.) রমজানের রোজার হক আদায় করার জন্য শাবানে প্রচুর রোজা রাখতেন। আর আমরা সারাটা বছর রোজার কোনো খবর না রেখে হঠাৎ করে রমজানের রোজার হক আদায় করার কথা চিন্তা করি কীভাবে? রোজার আসল উদ্দেশ্য, প্রায়োগিক অর্থ সম্পর্কে খুব ভালোভাবে বিস্তারিত জানার বিকল্প নেই। রোজার আসল আনন্দ কীসে? বুঝতে পারলে রমজান সাফল্যে আর কোনো বাধা থাকবে না। বাকি সবই অতি সহজেই আয়ত্তে চলে আসবে।

৫. রমজান ও কোরআন। কোরআন সম্পর্কে রমজানের যে দাবি, সে ব্যাপারে কোনো পূর্বপরিকল্পনা গোছগাছ ছাড়া রমজানে হুট করে সব ঠিকঠাকমতো করার দৃষ্টিভঙ্গিটা অবশ্যই চরম বিভ্রান্তি। রোজা ঠিক না হলে কোরআন ঠিকমতো ধরতে পারবেন না। খতম দেবেন-পড়বেন কিন্তু কাজ হবে না।

কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি পরিকল্পনা ছাড়া মাত্র এক মাসের মধ্যে এসবের সবকিছু সম্পাদন কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। সুতরাং আসুন কালবিলম্ব না করে শাবানের সামনের কয়েকটি দিনে রমজান সফল করার যাবতীয় বিষয় সুন্দরভাবে সাজিয়ে নিই।

পরিবার-আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে প্রতিবেশী-বন্ধুবান্ধব-মুসল্লি-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পেশাজীবী গ্রুপ ইত্যাদিতে নানাভাবে রমজানের গুরুত্ব-দোয়া-নামাজ-রোজা-কোরআন-সমাজ সেবা-জাকাত ব্যবস্থাপনা-ইতিকাফ ইত্যাদি নিয়ে নানা ধরনের প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের আয়োজন করি।

এসব বিষয়ে ইতোমধ্যে কিছুটা অগ্রসর হয়েছি যারা, তাদের অনেক বেশি দায়িত্ব-যারা কিছুই করেনি, তাদের পাশে দাঁড়ানো। স্রেফ ব্যক্তিগত উন্নয়নে সন্তুষ্টদের শেষ পর্যন্ত পস্তাতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। খুব ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে-রমজান শুধু মুমিনদের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য। সুতরাং সাধু সাবধান।

বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ২০২৬-এর হজযাত্রীদের রমজান সাফল্যের প্রতি। মনে রাখতে হবে, রমজান সফল না করে কেউ হজ সফল করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে পুরাতন হজ-ওমরাহকারীরা খুবই সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারেন।

রমজান সাফল্যে অভাবনীয় দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে মসজিদের ইমামকে। ইমামই হবেন রমজান সাফল্যের সুস্পষ্ট উদাহরণ। এ ব্যাপারে ইমামদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক। ইমামরা রমজান সাফল্যের কলাকৌশল আয়ত্ত করতে ব্যর্থ হলে অন্য আর কোনো উপায়ে তা সফল করা সম্ভব নয়।

পরিশেষে আমাদের সবাইকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে-মানুষের প্রকাশ্য শত্রু শয়তানই রমজান সাফল্যের প্রস্তুতির পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা। তার কারণেই আমরা রমজান প্রস্তুতিকে মোটেও গুরুত্ব দিতে পারি না। একটু মনোযোগ দিয়ে শুনুন, দেখুন আমাদের অতিশয় সুমহান প্রতিপালক আল্লাহ এ বিষয়ে কী করেছেন। তিনি রমজানের এক মাসে শয়তানকে জিনজিরাবদ্ধ করে বন্দি করার ব্যবস্থা করেছেন। সুবহানাল্লাহ। তা সত্ত্বেও যদি আমরা শয়তানের সঙ্গে না পারি, তাহলে শয়তানকে দোষারোপ করে কোনোই লাভ হবে না। বরং প্রমাণ হবে আসল কারণ-আমিই শয়তান। রমজানে শয়তান বন্দি থাকতেও যারা শয়তানি ছাড়তে পারব না, তাদেরই যারা রমজান শেষে হজে যাবেন, তারা মিনায় শয়তানের সঙ্গে পারবেন কীভাবে?

লেখক : সাবেক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...