ফ্রান্স-স্পেন প্রথম সেমিফাইনাল আজ

গতি বনাম কৌশলী ফুটবলের যুদ্ধ

এম. এম. মাসুক

গতি বনাম কৌশলী ফুটবলের যুদ্ধ

ডালাস স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ফ্রান্স ও স্পেন। ইউরোপ তথা বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি দল তারা। দুবার বিশ্বকাপ জিতেছে ফ্রান্স। আর একবার জিতেছে স্পেন। সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের মধ্যকার সেরা দ্বৈরথ দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব। এটি শুধু দুদলের জন্য ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার ম্যাচ নয়, বরং ভিন্ন ফুটবল দর্শনের এক মহাযুদ্ধ। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই অবিশ্বাস্য পাওয়ার ফুটবল খেলছে ফ্রান্স। গতি আর কাউন্টার অ্যাটাকে অনন্য দলটি। শারীরিক শক্তির দিক থেকে অনেক শক্তিশালী তারা। যেকোনো দলের পক্ষে সবচেয়ে ধারাবাহিক ছন্দে থাকা অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্সকে আটকানো দুরূহ কাজ। এই মুহূর্তে যে ধারার ফুটবল খেলছেন এমবাপ্পে-দেম্বেলেরা, আবার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে এজন্য স্পেনের মতো কঠিন বাধা পার হতে হবে তাদের। কেননা ফুটবলকে যেন এক জ্যামিতিক শিল্পে রূপ দিয়েছেন স্প্যানিশরা! এবারের বিশ্বকাপে টিকিটাকা ফুটবলের আধুনিক সংস্করণ নিয়ে হাজির হয়েছে তারা। বল পজেশন ও নিখুঁত পাসিংই হলো তাদের মূল কৌশল। মাঠে পাসিংয়ের এক অদৃশ্য জাল বুনে স্পেন। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের ক্লান্ত করে মাঠে নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে সফল হয় তারা। এই কৌশলী ফুটবলেই ‘বুলেট’ গতির ফ্রান্সকে থামিয়ে দিতে পারে স্পেন। তবে এ নিয়ে বিশ্বকাপে টানা তৃতীয় সেমিফাইনাল খেলছে তারা। আগের দুই সেমিফাইনালেই জয়ের রেকর্ড রয়েছে তাদের। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে চাইবে ফরাসিরা। ব্রাজিল ও জার্মানির পর তৃতীয় দল হিসেবে ফ্রান্সের সামনে বিশ্বকাপের টানা তৃতীয়বার ফাইনালে ওঠার হাতছানি। অন্যদিকে, ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারই প্রথম সেমিফাইনাল খেলছে স্পেন। ফ্রান্স-স্পেন শুধু একটি ফুটবল ম্যাচই নয়, এটি হতে যাচ্ছে কৌশল, গতি, মেধা এবং শারীরিক শক্তির এক বড় যুদ্ধ। ফ্রান্স চাইবে তাদের তৃতীয় শিরোপার দিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে যেতে। আর স্পেন চাইবে বিশ্বমঞ্চে তাদের হারিয়ে যাওয়া গৌরব পুনরুদ্ধারের দিকে ধাবিত হতে। প্রথম সেমিফাইনালের জয়ী দল ফাইনালে আর্জেন্টিনা কিংবা ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে।
ইউরোপ ফুটবলে ফ্রান্স-স্পেন লড়াইটা ঐতিহ্যবাহী। উনিশ শতকের শুরু থেকেই হয়ে আসছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এই দুদলের রোমাঞ্চকর ফুটবল লড়াই। এ পর্যন্ত মোট ৩৮ ম্যাচ খেলেছে দুদল। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৮টি জয় স্পেনের। আর ফ্রান্সের জয় ১৩টি। বাকি ৭টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। এই পরিসংখ্যানই জানান দিচ্ছে, ফ্রান্স-স্পেন ম্যাচ সব সময়ই কতটা উত্তাপ ছড়ায়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের জুনে নেশনস কাপের ফাইনালে দুদলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। ওই ম্যাচটি ৫-৪ গোলে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। এর আগে উয়েফা ইউরোর সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হেরেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছিল ফ্রান্স। এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে আবার মুখোমুখি হচ্ছে দুদল। তাই দুদলের ম্যাচ ঘিরে বাড়তি উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। স্পেনের পুনরাবৃত্তি নাকি ফ্রান্সের জয়ের ফেরা, সেটিই দেখার বিষয়।
বিশ্বকাপে টানা ছয় ম্যাচেই জয় পেয়েছে ফ্রান্স। গ্রুপ পর্বে সেরা দল হয়ে নকআউটে উঠে তারা। এ পর্বে সুইডেন, প্যারাগুয়ে ও মরক্কোকে হারিয়ে সেমিফাইনালের মঞ্চে এসেছে ফরাসিরা। এর মধ্যে কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে তাদের। ওই ম্যাচে কিলিয়ান এমবাপ্পে পেনাল্টি মিস করেছেন। যদিও পেনাল্টি মিসের পর এমবাপ্পের গোলেই এগিয়ে যায় ফ্রান্স। এবার বিদুৎগতির এমবাপ্পেকে দেখা যাচ্ছে। একের পর এক ম্যাচে অসাধারণ পারফরম্যান্স শো করে টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় লিওনেল মেসির সমান ৮ গোল এখন এই ফরাসি তারকার। স্পেন ম্যাচেও তার দিকে তাকিয়ে থাকবে ফরাসিরা। এমবাপ্পের নেতৃত্বাধীন ফ্রান্সের আক্রমণভাগ যেকোনো শক্তিশালী রক্ষণ-দুর্গ গুঁড়িয়ে দিতে পারে। তাদের ক্ষিপ্রগতির কাউন্টার অ্যাটাক ব্যর্থ করার মতো সামর্থ্য খুব কম দলেরই আছে। স্পেনের রক্ষণভাগের জন্য যে এমবাপ্পেরা সবচেয়ে ভয়ের কারণ হবে- সেটি সহজেই বলে দেওয়া যায়। স্পেনের রক্ষণভাগ শৃঙ্খল হলেও ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত নিজেদের কৌশল বদলে ফেলতে পারে ফ্রান্স। রক্ষণ ধরে রেখে কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়ার কৌশল নিতে পারে কোচ দিদিয়ের দেশমের দল। জানা যায়, গত মরক্কো ম্যাচে গোড়ালিতে এমবাপ্পে হালকা চোট পেলেও সেমিফাইনালের পুরো ম্যাচ খেলার জন্য প্রস্তুত এমবাপ্পে।
অন্যদিকে, লামিন ইয়ামালের প্রতি আস্থা রাখছে স্পেন। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলছেন এই তরুণ তারকা। ধীরে ধীরে দলের অন্যতম শক্তি হয়ে উঠছেন ইয়ামাল। ফ্রান্সের বিপক্ষে লড়াইয়ে বরাবরই সফল এই ফুটবলার। ইউরো কিংবা নেশনস কাপের ম্যাচে ফরাসিদের বিপক্ষে গোল পেয়েছেন ইয়ামাল। এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে ফ্রান্সের বিপক্ষে তার নিজের সেরাটা দেখানোর পালা। অভিজ্ঞ এমবাপ্পে আর ইয়ামালের মধ্যেও যে দ্বৈরথ জমবে—সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। স্পেনের আক্রমণভাগ ক্ষুরধার। বিশেষ করে উইং দিয়ে তাদের আক্রমণগুলো প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ভয় ধরিয়ে দেয়। তাদের টিকিটাকা বা পজেশনভিত্তিক ফুটবল এবং মাঝমাঠ অবিশ্বাস্য রকমের। ওয়ারজাবাল দুর্দান্ত খেলছেন। এরই মধ্যে চার গোল করেছেন এই স্প্যানিশ। আক্রমণভাগে ইয়ামাল আর ওয়ারজাবালের দিকে তাকিয়ে থাকবে স্পেন। মাঝমাঠে তরুণ ও অভিজ্ঞতার মিশ্রণ স্প্যানিশদের খেলায় দারুণ এক ছন্দ দেখা গেছে। তারা বল পজেশন ধরে রেখে প্রতিপক্ষের প্রতি মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে ওস্তাদ। তবে স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দলগত রসায়ন। একক কোনো তারকার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পুরো দল হিসেবে খেলে তারা। এটি ম্যাচে তাদের এগিয়ে দেবে। স্পেনের কৌশলী ফুটবলের জয় হবে নাকি, গতিময় ফ্রান্সের ‘বুলেট ট্রেন’ ছুটে চলবে—সেটি দেখার অপেক্ষা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন