আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভারতের ক্রিকেট ভন্ডামির মুখোশ উন্মোচন

এম. এম. কায়সার

ভারতের ক্রিকেট ভন্ডামির মুখোশ উন্মোচন

ক্রিকেট মাঠে হারজিত নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন ক্রিকেট নিজেই হেরে যায়, তখন তা কেবল খেলাধুলার ঘটনা হয়েই থাকে না, স্পষ্টত হয়ে ওঠে কুটচাল ও অনৈতিকতার অশনিসংকেত। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে যেভাবে এবং যে কায়দায় ভারত সরিয়ে দিয়েছে, সেটাই ক্রিকেটের হেরে যাওয়ার নগ্ন উদাহরণ।
উগ্রবাদের কাছে নতি স্বীকার করে ভারত আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার অন্যায্য, অবিবেচনাপ্রসূত এবং অন্যায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু যে বাংলাদেশ এর প্রতিবাদ করেছে তা নয়, খোদ ভারতে রাজনীতিবিদ এবং খেলোয়াড়েরাও এই অন্যায্য সিদ্ধান্তকে জোর গলায় অন্যায় বলছেন।
আইসিসির আয়ে বড় ভূমিকা রাখার পর থেকেই ভারতীয় ক্রিকেট নিজেদের বিশ্বক্রিকেটের মাতব্বর ভাবছে। সাম্রাজ্যবাদী মালিকের মতো আচরণ করছে। সিদ্ধান্ত তারা নেবে, শর্তও তারাই ঠিক করবে, আর বাকিদের কাজ হবে তা মেনে নেওয়া, ‘জি জাহাঁপনা’ বলে কুর্নিশে যাওয়া! মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে যেভাবে ছুড়ে ফেলা হয়েছে, সেটাই তাদের দাদাগিরির সর্বশেষ ও সবচেয়ে নগ্ন প্রদর্শনী।
আইপিএলের নিলামে মোস্তাফিজকে দলে নিতে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মধ্যে রীতিমতো টানাটানি হয়েছিল। দরকষাকষির সেই লড়াইয়েই কলকাতা নাইট রাইডার্স মোস্তাফিজকে দলে ভেড়ায়। অর্থা,ৎ ফিজ ছিলেন ‘চাহিদাসম্পন্ন পণ্য’! আইপিএলে তার অন্তর্ভুক্তি করুণানির্ভর কিছু ছিল না। এমন একজন পারফরমারকে দলে টেনে শাহরুখ খানের কলকাতা নাইটরাইডার্স টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই নিজেদের বিজয়ী মনে করছিল। অন্তত কেকেআরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফিজকে নিয়ে আগাম হাইপ তো তারই প্রমাণ দিচ্ছিল! অথচ এমন মূল্যবান ক্রিকেটারকে টুর্নামেন্ট শুরুর বহু আগেই, কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা ছাড়াই বাদ দেওয়া হলো। প্রশ্ন উঠছে—নিলামের সময় কি ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদ ঘুমিয়ে ছিল? তখন কি মোস্তাফিজের ধর্মীয় পরিচয় তাদের চোখে পড়েনি? তখন কি নিরাপত্তার কথা মনে পড়েনি? নাকি তখন মোস্তাফিজ শুধুই ‘পারফরম্যান্সের প্যাকেজ’ ছিলেন, আর সময় বদলাতেই সেই বাংলাদেশি মুসলিম হয়ে গেলেন আইপিএলের ‘ঝুঁকি’?
এই সিদ্ধান্ত যে ক্রিকেটীয় নয়—পুরোদস্তুর রাজনৈতিক, সেটা জানার জন্য খুব বেশি বুদ্ধি খরচের প্রয়োজন নেই। মাঠে নামার আগেই মোস্তাফিজুর রহমান তার ধর্মীয় পরিচয় এবং নাগরিকত্ব—এই দুইয়ের জন্যই ভারতের সবচেয়ে বড় ‘শত্রু’ হয়ে গেলেন! তার ক্রিকেটীয় পারফরম্যান্স তখন গৌণ হয়ে পড়ল। উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির আফিমে আচ্ছন্নরা চোঙা নিয়ে কলকাতার রাস্তা কাঁপিয়ে স্লোগান তুলল—‘মোস্তাফিজকে না সরালে ইডেনের পিচ খুঁড়ে ফেলা হবে। মাঠ-গ্যালারি জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।’ তারা কলকাতা নাইট রাইডার্সের স্বত্বাধিকারী বলিউড অভিনেতা শাহরুখ খানকেও বিশ্বাসঘাতক এমনকি দেশদ্রোহী বলে হোজ্জা তুলল। এখানেও শাহরুখের ভারতীয় নাগরিকত্বের চেয়ে তার মুসলিম পরিচয়কেই বেশি দায়ী করা হয়েছে। আশ্চর্য বিষয় হলো কলকাতা নাইটরাইডার্স ক্রিকেট ফ্রাঞ্চাইজির মালিকানার একটা অংশ জুড়ে আছেন জয় মেহতা ও বলিউডের সাবেক অভিনেত্রী জুহি চাওলা। কিন্তু কলকাতার উগ্রবাদীরা তাদের নারকীয় স্লোগানে একবারও তাদের নামও উচ্চারণ করেনি। যেন শুধু মুসলিম হয়েই শাহরুখ বড় অপরাধ করে ফেলেছেন! এই উগ্রবাদীদের অন্যায্য ও অন্যায় দাবি পূরণ করতে গিয়ে ভারত এবং তাদের ক্রিকেট বোর্ড নতজানু হয়। শুধু ধর্মীয় এবং বাংলাদেশি—এই দুই পরিচয়কে পার্সনা নন গ্রাটার ব্র্যাকেটবন্দি করে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেয় ভারত।
এটা আর কিছু নয়, সোজা ভাষায় ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদীদের চাপের কাছে ক্রিকেটের আত্মসমর্পণ।
মোস্তাফিজ এই সময়ের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ব্র্যান্ড। তাকে ছেঁটে ফেলা মানে বাংলাদেশকেই ছোট করে দেখানো। আর সেই ছোট করে দেখানোর সাহস ভারত পেয়েছে—কারণ তারা জানে, আইপিএল তাদের একচ্ছত্র সম্পত্তি। বাস্তবতা হলো—আইপিএল এখন ভারতের সফট পাওয়ারের হাতিয়ার। আর সেই হাতিয়ারের প্রয়োগ করে এই দফায় মোস্তাফিজ তথা পুরো বাংলাদেশকে অমর্যাদা করার নোংরা খেলায় নামল ভারত।
কিন্তু অন্যকে ছোট করতে গিয়ে ভারত এখন নিজের ক্ষুদ্রতাকে আরো বেশি স্পষ্ট করে তুলল। মোস্তাফিজ ইস্যুটা বুমেরাং হয়ে ভারতের ইজ্জত হানি ঘটাচ্ছে। নিরাপত্তা দিতে পারবে না বলে আইপিএল থেকে তারা মোস্তাফিজকে সরিয়ে দিল, অথচ এখন সেই তারাই বলছে, বিশ্বকাপে পুরো বাংলাদেশের জন্য পুরোদস্তুর নিরাপত্তা দেওয়া হবে। এক মোস্তাফিজকে যারা নিরাপত্তা দিতে অপরাগ সেই তারাই আবার পুরো বাংলাদেশ দলকে যথাযথ নিরাপত্তা দেওয়া হবে বলে হাত জোড় করছে।
এই আচরণকে ইংরেজিতে বলে হিপোক্রেসি, বাংলায় ভণ্ডামি!
ভারতের এমন আচরণ করে আসলে বোঝাতে চাইছে, আমরা চাইলেই ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা দিতে পারি, আবার ইচ্ছা না হলে দিই না। তাদের এই ইচ্ছা-অনিচ্ছার মাপকাঠি ক্রিকেট বা ক্রিকেটার নয়—সংশ্লিষ্টের পরিচয় এবং ধর্মকে টেনে আনার গল্প। মোস্তাফিজ ইস্যুতে ভারত এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড যে ভণ্ডামির আচরণ করেছে তাতে পুরো ক্রিকেট বিশ্বের কাছে তাদের মুখোশ খুলে গেছে।
নো-বলে রান আউট হওয়ার মতো বোকামো করেছে ভারত!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন