প্রায় দুই দশক পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই সফরের শুরুতেই একের পর এক ইনজুরির ধাক্কায় খর্বশক্তির দল নিয়েই লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে টাইগারদের।
রোববার প্রথম টেস্টের জন্য ১৫ সদস্যের দল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দলের নেতৃত্বে আছে নাজমুল হোসেন শান্ত, তার ডেপুটির দায়িত্ব পালন করবেন মেহেদী হাসান মিরাজ। আগামী ৩১ জুলাই অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে রওনা দেবে দল। ৬-৮ আগস্ট ডারউইনের ডিএক্সসি অ্যারেনায় ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। এরপর ১৩-১৭ আগস্ট মাররারা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে হবে প্রথম টেস্ট। সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট হবে ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায়।
ব্যাটিংয়ে অভিজ্ঞতা, পেসে অনিশ্চয়তা
১৫ সদস্যের স্কোয়াডে ব্যাটার রয়েছেন আটজন—নাজমুল হোসেন শান্ত, সৌম্য সরকার, সাদমান ইসলাম, তানজিদ হাসান, মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিম, অমিত হাসান ও জাকের আলী অনিক। স্পিন বিভাগে আছেন মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলাম। পেস আক্রমণে জায়গা পেয়েছেন তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ, সৈয়দ খালেদ আহমেদ, এবাদত হোসেন চৌধুরী ও মুশফিক হাসান।
একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, এই পাঁচ পেসারই ডানহাতি। এমনকি বাঁহাতি ব্যাটার সৌম্য সরকারও বল করেন ডান হাতে।
ফিরলেন সৌম্য ও জাকের, ডাক পেলেন মুশফিক
এক বছর পর টেস্ট দলে ফিরেছেন উইকেটকিপার-ব্যাটার জাকের আলী অনিক। গত নভেম্বরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বশেষ জাতীয় দলের হয়ে খেলার পর তিনি ছিলেন নির্বাচকদের ভাবনার বাইরে। লিটন দাসের ইনজুরির কারণেই মূলত তার প্রত্যাবর্তন। এখন পর্যন্ত ছয় টেস্টে ৩০.৬৩ গড়ে ৩৩৭ রান করা জাকেরের সর্বোচ্চ ইনিংস ৯১।
সৌম্য সরকারও ফিরেছেন দীর্ঘ বিরতির পর। অভিজ্ঞ এই বাঁহাতি ব্যাটারের ওপর টপ অর্ডারে স্থিতি আনার দায়িত্ব থাকবে।
অন্যদিকে প্রথমবারের মতো টেস্ট দলে ডাক পেয়েছেন পেসার মুশফিক হাসান। দলে রয়েছেন মাত্র একটি টেস্ট খেলা অমিত হাসানও। ইতালিতে ছুটি কাটাতে থাকা এবাদত হোসেনকে জরুরি ভিত্তিতে দলে ডেকে আনা হয়েছে।
পেস আক্রমণের ভরসা কতটা?
বাংলাদেশের পাঁচ পেসারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবাদত হোসেন, যার ঝুলিতে ২৪ টেস্ট। তাসকিন আহমেদ ও খালেদ আহমেদ খেলেছেন ১৯টি করে টেস্ট, হাসান মাহমুদের অভিজ্ঞতা ১৪ টেস্ট। আর মুশফিক হাসান এখনো অভিষেকের অপেক্ষায়।
কাগজে-কলমে অভিজ্ঞতার হিসাব মোটামুটি মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। চোট কাটিয়ে ফেরা এবাদতের ম্যাচ ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন আছে, আর একজন একেবারেই নতুন। ফলে অস্ট্রেলিয়ার মতো কন্ডিশনে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ কতটা কার্যকর হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
নাহিদ রানার ইনজুরি, নতুন বিতর্ক
দল ঘোষণার সবচেয়ে বড় খবর নাহিদ রানার অনুপস্থিতি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৭ জুলাইয়ের ওয়ানডেতে বাঁ পাশের পেশিতে চোট পাওয়া এই গতিতারকার এমআরআই স্ক্যানে ধরা পড়েছে গ্রেড-২ সাইড স্ট্রেইন। চিকিৎসকদের মতে, মাঠে ফিরতে তার ছয় থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগবে। ফলে অস্ট্রেলিয়া সফরের দুই টেস্ট থেকেই ছিটকে গেছেন তিনি।
ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের কাছাকাছি গতির ধারাবাহিক বোলিং ও রিভার্স সুইংয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পেস অস্ত্র হয়ে উঠেছিলেন নাহিদ। তাই তার ইনজুরির পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে ওয়ার্কলোড ব্যবস্থাপনা নিয়ে। তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ জিম্বাবুয়ে সিরিজে তাকে খেলানো কতটা প্রয়োজন ছিল—এই বিতর্ক এখন সামনে এসেছে।
নাহিদের পাশাপাশি হ্যামস্ট্রিং চোটের কারণে প্রথম টেস্টে নেই শরিফুল ইসলাম। পায়ের চোটে সিঙ্গাপুরে পিআরপি চিকিৎসা নেওয়া লিটন দাসও বাইরে। দ্বিতীয় টেস্টের আগে ফিটনেস পরীক্ষায় উতরে গেলেই কেবল তাদের ফেরার সম্ভাবনা থাকবে।
পূর্ণ শক্তির অস্ট্রেলিয়ার সামনে কঠিন পরীক্ষা
বাংলাদেশ যখন ইনজুরিতে জর্জরিত, অস্ট্রেলিয়া ঠিক তখনই নামছে পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে। প্যাট কামিন্সের নেতৃত্বাধীন স্কোয়াডে ফিরেছেন কামিন্স, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়ন। আছেন মিচেল স্টার্ক, স্কট বোল্যান্ড, স্টিভ স্মিথ, ট্রাভিস হেড ও মার্নাস লাবুশেনের মতো অভিজ্ঞ তারকারা।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের দৌড়ে থাকতে একটি পয়েন্টও হারাতে চায় না অস্ট্রেলিয়া। ফলে বাংলাদেশের জন্য এই সফর কেবল ঐতিহাসিক নয়, ভীষণ কঠিনও।
প্রায় দুই দশকের অপেক্ষার পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই স্বপ্নযাত্রার শুরুতেই ইনজুরি, অভিজ্ঞতার ঘাটতি ও পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন দলটিকে ঘিরে ধরেছে। ডারউইনের বাউন্স ও গতির উইকেটে এই সফর তাই শুধু প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নয়—বাংলাদেশের ক্রিকেট-পরিকল্পনা, বেঞ্চ শক্তি ও ভবিষ্যৎ ভাবনারও এক কঠিন পরীক্ষা।
প্রথম টেস্টের দল
নাজমুল হোসেন শান্ত (অধিনায়ক), সাদমান ইসলাম, তানজিদ হাসান, সৌম্য সরকার, মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিম, অমিত হাসান, জাকের আলী অনিক, মেহেদী হাসান মিরাজ (সহ-অধিনায়ক), তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ, সৈয়দ খালেদ আহমেদ, এবাদত হোসেন চৌধুরী ও মুশফিক হাসান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

