দুই দলের জাতীয় সংগীত পরিবেশন শেষ হয়েছে। ম্যাচপূর্ব আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছেন আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ। খেলোয়াড়রা প্রস্তুত, গ্যালারিতে অপেক্ষমাণ হাজারো সমর্থকও মুখিয়ে আছেন। এখন শুধু রেফারির প্রথম বাঁশির অপেক্ষা—শুরু হতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর বহুল প্রতীক্ষিত সেমিফাইনাল।
কিক-অফের আর বেশি দেরি নেই। দুই দলের ফুটবলাররা টানেলে প্রস্তুত, সেখান থেকে বেরিয়ে তারা প্রবেশ করলেন গর্জে ওঠা আটলান্টা স্টেডিয়ামে।
গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ। সমর্থকদের হাতে উড়ছে নানা রঙের পতাকা, চারদিকে উৎসবের আমেজ। উত্তেজনা এখন তুঙ্গে—সবকিছু প্রস্তুত বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের এই বহুল প্রতীক্ষিত মহারণের জন্য।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আজ মুখোমুখি হচ্ছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা দুই গোলদাতা। লিওনেল মেসি কি আরও বাড়াবেন নিজের রেকর্ড, নাকি হ্যারি কেইন এগিয়ে যাবেন ইতিহাসের তালিকায়?
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকা:
▪️লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) — ২১ গোল
▪️এমবাপ্পে (ফ্রান্স) — ২০ গোল
▪️মিরোস্লাভ ক্লোসে (জার্মানি) — ১৬ গোল
▪️রোনালদো (ব্রাজিল) — ১৫ গোল
▪️হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড) — ১৪ গোল
গার্ড মুলার (জার্মানি) — ১৪ গোল
▪️জুস্ত ফন্তেইন (ফ্রান্স) — ১৩ গোল
▪️পেলে (ব্রাজিল) — ১২ গোল
▪️ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল) — ১১ গোল
ইউর্গেন ক্লিন্সমান (জার্মানি) — ১১ গোল
শান্দর কচিশ (হাঙ্গেরি) — ১১ গোল
▪️গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা (আর্জেন্টিনা) — ১০ গোল
তেওফিলো কুবিয়াস (পেরু) — ১০ গোল
গ্রেজেগোর্জ লাতো (পোল্যান্ড) — ১০ গোল
গ্যারি লিনেকার (ইংল্যান্ড) — ১০ গোল
টমাস মুলার (জার্মানি) — ১০ গোল
হেলমুট রাহন (জার্মানি) — ১০ গোল

১৯৯৮ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার শেষ দেখায় বড় মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড। আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার দিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মারার ঘটনায় মাঠ ছাড়তে হয়েছিল বেকহামকে, আর সেই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত সুবিধা আদায় করে নেয় আর্জেন্টিনা।
২৮ বছর পর ইতিহাস যেন নতুন মোড় নিতে চলেছে। সেই দিয়েগো সিমিওনে এখন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের প্রধান কোচ। আর আজ তার ছেলে জুলিয়ানো সিমিওনে আর্জেন্টিনার হয়ে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শুরুর একাদশে রয়েছেন।
ফুটবলপ্রেমীদের মনে প্রশ্ন জাগছে—বাবার মতো এবার কি ছেলেও ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন?




ম্যাচ শুরুর আর বেশি দেরি নেই। শেষ মুহূর্তের ওয়ার্ম-আপের জন্য মাঠে নেমেছেন লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনা দল।
গ্যালারিতে উপস্থিত সমর্থকদের করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে আটলান্টা স্টেডিয়াম। সমর্থকদের অভিবাদনের জবাবে হাত নেড়ে সাড়া দেন মেসি ও তার সতীর্থরা।
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এখন প্রস্তুত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মহারণে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার জন্য।

‘কোচের সঙ্গে সব সময় একমত হওয়ার দরকার নেই’
নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের পর জুড বেলিংহামকে নিয়ে থমাস টুখেলের মন্তব্য প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক ওয়েন রুনি বলেছেন, খেলোয়াড় ও কোচের মধ্যে এমন মতবিনিময় একেবারেই স্বাভাবিক।
রুনির ভাষায়, “আমি এটা দারুণ পছন্দ করি। একজন খেলোয়াড় ও কোচের মধ্যে এমন ঘটনা হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।”
তিনি আরও বলেন, “একজন কোচ হিসেবে আপনি অবশ্যই চাইবেন আপনার খেলোয়াড়দের নিজস্ব মতামত থাকুক। আমরা যখন চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের কথা বলি, জুড বেলিংহাম সেটাই দেখিয়েছে।”
রুনির মতে, “আমি নিশ্চিত টুখেল এতে খুশিই হয়েছেন যে বেলিংহাম নিজের অবস্থান তুলে ধরেছে। আমরা এবং অন্য অনেক গণমাধ্যম বিষয়টিকে বড় করে দেখিয়েছি, কিন্তু বাস্তবে এমন ঘটনা ফুটবলে খুবই স্বাভাবিক।”
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের উদাহরণ টেনে রুনি বলেন, “স্যার অ্যালেক্স তো বরং পছন্দই করতেন যখন খেলোয়াড়রা তাকে চ্যালেঞ্জ করত। সব সময় কোচের সঙ্গে একমত হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। আমিও অনেক সময় তার সঙ্গে একমত হতাম না।”
ওয়েন রুনি, সাবেক ইংল্যান্ড স্ট্রাইকার, বিবিসি ওয়ানে




লিওনেল মেসিকে নিয়ে কথা শুরু করবেনই বা কীভাবে? ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই জাদুকরের গল্প হয়তো আজ থেকে বহু প্রজন্ম পরেও মানুষের মুখে মুখে ফিরবে।
৩৯ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা দীর্ঘ ও গৌরবময় ক্যারিয়ারে এবারই প্রথম ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছেন।
ইংল্যান্ডের অনেক ফুটবলারই ক্লাব ফুটবলে মেসির বিপক্ষে খেলেছেন। তবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো মঞ্চে মেসির মুখোমুখি হওয়ার অনুভূতি নিশ্চয়ই একেবারেই ভিন্ন।
লিওনেল স্কালোনির দলের ভরসার কেন্দ্রবিন্দু মেসি—মাঠে যেমন, মাঠের বাইরেও তেমনি। তাই আজকের ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করবে, তিনি কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন তার ওপর।
২০২২ সালে সতীর্থরা মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে দিতে পেরেছিল। এবারও কি তারা সেই কীর্তির পুনরাবৃত্তি করতে পারবে? আর যদি পারে, তবে কি ফুটবল ইতিহাসে সর্বকালের সেরা হিসেবে মেসির অবস্থান নিয়ে আর কোনো বিতর্কই থাকবে না?

বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে কোনো ঝুঁকিই নিতে চাইছেন না আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা। অনেকেই ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনের নাম কাগজে লিখে ফ্রিজারে রেখে দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ আগের ম্যাচগুলোর মতো একই রকম নানা রীতি পালন করছেন—যেগুলো তাদের বিশ্বাস, জাতীয় দলের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে।
এই বিশ্বাসগুলো আর্জেন্টিনায় ‘কাবালাস’ নামে পরিচিত, যা দীর্ঘদিনের এক ধরনের ফুটবল-সংস্কৃতি। সমর্থকদের ধারণা, এসব কুসংস্কার বা সৌভাগ্যের রীতি দলের ভাগ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা যখন ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তখন সমর্থকেরা সেই পুরোনো রীতিনীতিগুলো আরও নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলছেন। তাদের বিশ্বাস, অতীতের সাফল্যের পেছনেও এসব কুসংস্কারের ভূমিকা ছিল।
অনেকেই প্রতিপক্ষ দলের নাম উচ্চারণই করেন না। কেউ একই জার্সি, এমনকি না ধুয়েই প্রতিটি ম্যাচে পরে থাকেন। কেউ একই আসনে বসেন, আবার কেউ প্রতিটি ম্যাচের আগে একই খাবার খান। তাদের বিশ্বাস, এসব অভ্যাসে পরিবর্তন আনলেই দলের ভাগ্য খারাপ হতে পারে এবং বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যেতে পারে।
১৩ বছর বয়সী সমর্থক ইনেস মুত্রি বলেন, “আমাদের বন্ধুদের একটা বিশেষ রীতি আছে। আমরা প্রতিপক্ষের সেরা খেলোয়াড় ও গোলরক্ষকের নাম একই কাগজে লিখে ফ্রিজারের ভেতরে রেখে দিই।”

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে?
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াই মানেই নাটক, বিতর্ক আর অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি।
২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের আগে ফিরে দেখা যাক সেই ঐতিহাসিক ম্যাচকে—
‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’—ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনার সেই অবিস্মরণীয় দ্বৈরথ
১৯৮৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-১ ব্যবধানে জয় ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। সেই ম্যাচেই দিয়েগো ম্যারাডোনা প্রথমে হাত দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল করেন, যা রেফারির চোখ এড়িয়ে বৈধ গোল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
এর কয়েক মিনিট পরই ম্যারাডোনা নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে একের পর এক ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে অসাধারণ একক নৈপুণ্যে গোল করেন। ফুটবল ইতিহাসে সেটিই ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ নামে অমর হয়ে আছে।
বিতর্ক আর অবিশ্বাস্য প্রতিভার মিশেলে গড়ে ওঠা সেই ম্যাচ বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সংজ্ঞায়িত অধ্যায় হয়ে আছে এবং ম্যারাডোনার উত্তরাধিকারের সঙ্গেও চিরদিনের জন্য জড়িয়ে রয়েছে।
দুই দলের মুখোমুখি পরিসংখ্যান
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সিনিয়র পুরুষ দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে স্পষ্ট আধিপত্য রয়েছে ইংল্যান্ডের। দুই দল সর্বশেষ একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল ২৪ বছর আগে।
▪️মোট ম্যাচ: ৫টি
▪️ইংল্যান্ডের জয়: ৩টি
▪️আর্জেন্টিনার জয়: ১টি
▪️ড্র: ১টি

ইংল্যান্ড একাদশ
গোলরক্ষক: জর্ডান পিকফোর্ড।
রক্ষণভাগ: রিস জেমস, মার্ক গেহি, জন স্টোনস, জেড স্পেন্স।
মধ্যমাঠ: ডেকলান রাইস, এলিয়ট অ্যান্ডারসন, জুড বেলিংহাম, মরগান রজার্স।
আক্রমণভাগ: হ্যারি কেইন (অধিনায়ক), অ্যান্থনি গর্ডন।

আর্জেন্টিনা একাদশ
গোলরক্ষক: এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।
রক্ষণভাগ: নাহুয়েল মোলিনা, সার্জিও রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো।
মধ্যমাঠ: লিয়ান্দ্রো পারেদেস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ।
আক্রমণভাগ: জুলিয়ানো সিমিওনে, লিওনেল মেসি (অধিনায়ক), হুলিয়ান আলভারেজ।
স্বাগতম!
যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা শহরের আটলান্টা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচের দৈনিক আমার দেশ-এর লাইভ কভারেজে আপনাকে স্বাগতম।
লিওনেল মেসির নেতৃত্বে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যে মাঠে নামছে। অন্যদিকে অধিনায়ক হ্যারি কেইনের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়ে লড়বে।