২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই চমক দেখিয়েছে আইভরি কোস্ট। গ্রুপ ‘ই’-এর রোমাঞ্চকর ম্যাচে ইকুয়েডরকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে পূর্ণ ৩ পয়েন্ট তুলে নিয়েছে আফ্রিকান পরাশক্তিরা। তবে এই জয়ের চেয়েও বড় গল্প হয়ে উঠেছে দলের ‘অপ্রত্যাশিত নায়ক’ আমাদ দিয়ালোর জীবনসংগ্রাম। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই উইঙ্গার বদলি হিসেবে নেমে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন। অথচ এই জয়সূচক গোলের পেছনে লুকিয়ে আছে মানব পাচার, জালিয়াতি ও এক শিশুর পরিচয়হীনতার নির্মম ইতিহাস। যেতে পারতেন জেলেও।
২০১৫ সালের কথা। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে অভিবাসনের তীব্র জোয়ারের সুযোগ নিয়েছিল আইভরি কোস্টের একটি অবৈধ মানব পাচারকারী চক্র। তারা ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে আফ্রিকান শিশুদের ইউরোপে পাচার করত। মাত্র ১২ বছর বয়সে ফুটবল খেলার স্বপ্ন নিয়ে নয়, বরং এই নিষ্ঠুর চক্রের শিকার হয়ে ইতালিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন দিয়ালো। ২০২০ সালে এই চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হলেও ততক্ষণে দিয়ালোর জীবন বিষাদে ঢেকে গেছে।
ইউরোপে পৌঁছানোর পর দিয়ালোকে সম্পূর্ণ একটি ভুয়া পরিচয় দেওয়া হয়েছিল। নথিপত্রে এমন কিছু মানুষকে তার বাবা-মা হিসেবে দেখানো হয়েছিল, যাদের তিনি চেনেনই না। কাগজপত্র জালিয়াতি করার অপরাধে যেতে পারতেন জেলেও।
এমনকি অলিম্পিক দে মার্শেইয়ের ফুটবলার হামেদ জুনিয়র ত্রাওরেকেও কাগজপত্রে তার ভাই সাজানো হয়েছিল, যদিও পরবর্তীতে প্রমাণিত হয় তাদের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই অবুঝ এই শিশুদের ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো—দিয়ালো তার আসল বা জন্মদাতা বাবা-মা সম্পর্কে খুব কম কথাই বলেছেন!
এত বড় মানসিক ধাক্কা, নির্মম ট্র্যাজেডি ও পরিচয়হীনতার কষ্ট বুক চাপা দিয়ে দিয়ালো বেছে নিয়েছেন ফুটবলকে। ভালোবেসেছেন নিজের জন্মভূমিকে। সব কষ্ট ভুলে আইভরি কোস্টের জার্সি গায়ে তুলে নেওয়া এই উইঙ্গার গত শনিবার দেশকে এনে দিলেন বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা এক আনন্দের মুহূর্ত।
দিয়ালোর জাদুকরী গোলে সেবাস্তিয়ান বেকাসেসের ইকুয়েডরকে পয়েন্টহীন মাঠে ছাড়তে হয়েছে। এই স্মরণীয় জয়ের পর আত্মবিশ্বাসী আইভরি কোস্টের পরবর্তী লক্ষ্য শক্তিশালী জার্মানি। অন্যদিকে, এমন হতাশাজনক শুরুর পর ইকুয়েডর চাইবে কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়াতে। তবে ম্যাচের ফলাফল ছাপিয়ে ফুটবল বিশ্ব এখন স্যালুট জানাচ্ছে আমাদ দিয়ালোকে—যিনি জীবনের সব অন্ধকারকে হারিয়ে আজ এক দেশের আলোর দিশারী।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

