৮, ১৮ ও ৩৮ মিনিট, প্রথমার্ধের তিনটি গোলের মুহূর্ত এটি। হিসাব জানাচ্ছে, প্রায় প্রতি ১৩ মিনিট পরপর গোল হয়েছে। এই তিন গোলের জন্য মূলত দায়ী কেÑসেই প্রশ্ন উঠলে সবার আগে নামটা আসবে গোলকিপার শ্রাবণের। হ্যাঁ, মানছি সেই সঙ্গে দলের ডিফেন্স প্রক্রিয়াও বড় দায়ী। এই সফরে কোচ গোলরক্ষক জিকোকে কেন নেননি সেটা অজানা। আন্তর্জাতিক ম্যাচে অভিজ্ঞতা অনেক বড় সম্পদ। গোলরক্ষক শ্রাবণ কিন্তু এই মৌসুমে লিগের ম্যাচগুলোতেও নিয়মিত ছিল না। এমন একজনকে আপনি আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য হঠাৎ বেছে নিলে সমস্যা তো হতেই পারে। অন্তত সিঙ্গাপুর ম্যাচের আগে ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রস্তুতি ম্যাচে তো সেই সমস্যাই আমরা দেখতে পেলাম।
আরেকটু পরিষ্কার করে বললে এই সমস্যা বা ভুলগুলো করছেন কিন্তু স্বয়ং কোচ ক্যাবরেরা। আরেকটু ব্যাখ্যায় যাই। কোচ ক্যাবরেরা যখন দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন বাংলাদেশ দল ছিল অন্যরকম। আর এখন আরেক রকম। হামজা চৌধুরী, সামিত সোম, জায়ানসহ আরো বেশ কয়েকজন প্রবাসী খেলোয়াড় দলে যোগ দেওয়ায় পুরো দলের শক্তি, খেলার স্টাইল, একের সঙ্গে অন্যের বোঝাপড়াÑযাকে বলে সিংক্রোনাইজেশন; সেটা এখন অন্যরকম। এই সময়ের মধ্যে পুরো দলের শক্তির মানে অনেক উন্নতি হয়েছে। যাকে ফুটবলের ভাষায় বলে স্ট্রেংথ বিল্ডআপ। তো আমার কাছে দেখে মনে হচ্ছে, স্ট্রেংথ বিল্ডআপ হওয়া এই দল কোচ হিসেবে ক্যাবরেরা সঠিকভাবে হ্যান্ডেল করতে পারছেন না। ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রস্তুতি ম্যাচে দল যে ভুলগুলো করেছে, সেই ভুল যদি আমি সিঙ্গাপুরের সঙ্গে ম্যাচেও দেখতে পাই, তাহলে আমি শতভাগ নিশ্চিত হবো যে সমস্যার মূল কেন্দ্রবিন্দু আর কিছু নয়Ñকোচ!
ভিয়েতনাম ম্যাচে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স দেখে মনে হচ্ছিল এই ম্যাচে যে আমরা জিতব না, সেটা দল আগে থেকেই জানত! আত্মবিশ্বাসহীন একটা দলকে দেখেছি আমরা এই ম্যাচে। শুরুর অর্ধের খেলা দেখে মনে হয়েছে ডিফেন্স করতেই যেন ভুলে গেছে দল। আপনি ম্যাচ হারতেই পারেন; কিন্তু কিছুটা প্রতিযোগিতা তো সেখানে করতে হবে আপনাকে। তিন গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ভিয়েতনামও যেন আর গোল করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিল! পুরো ম্যাচে বাংলাদেশ খুব ভালো ফুটবল খেলেছে তাও কিন্তু নয়। অনেক সময় দেখবেন হারলেও সেই হারের ভেতরে কিন্তু ইতিবাচক অনেক কিছু থাকে। এই ম্যাচে ইতিবাচক তেমন কিছুই ছিল না। এটা ছিল একটা প্রস্তুতি ম্যাচ এবং প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে গিয়ে ভিয়েতনামের মতো একটা কঠিন প্রতিপক্ষ বেছে নিয়েছে এটা ঠিক আছে। আমরা জানি ভিয়েতনাম আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে সেরা, তারা আসিয়ান চ্যাম্পিয়ন এবং এশিয়ান কাপে অলরেডি কোয়ালিফাই করে ফেলেছে। তাও আবার সবার থেকে বেশি ১৫ পয়েন্ট নিয়ে। তারা একদম টপে রয়েছে। এমন একটা শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে লড়তে বাংলাদেশ যে স্কোয়াড নিয়ে গেছে, সেখানে আপনার দুজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় তপু এবং রাকিব দলে নেই। এই দুজনের অভাবটা মাঠের লড়াইয়ে স্পষ্ট হয়েছে। বড় তারকা হামজা চৌধুরী মাত্র একদিন আগে এসে দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। মাত্র একদিন অনুশীলন সেশন শেষে মাঠে নেমেছেন। হামজার দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। ও আসার পর আমাদের দলের স্ট্রেংথ অনেক বেড়েছে। লম্বা সফরের কারণে আমার কাছে মনে হয়েছে হামজা কিছুটা ক্লান্ত ছিল তবে সে তার জায়গা থেকে সেরাটা খেলারই চেষ্টা করেছে। ডিফেন্সে যে দুজন সেন্টার ব্যাক খেলেছে তাদের ভুলগুলো আসলে বেশি হয়েছে, বিশেষ করে শাকিল হোসাইন এবং তারেক কাজীর সেটআপটা ঠিক ছিল না।
এশিয়ান কাপ কোয়ালিফায়ারের বেশিরভাগ ম্যাচেই খেলেছি আমরা ৪-২-৩-১ বা ৪-৩-৩ ফরমেশনে। তবে ব্যাপারটা হলো, আপনার ডিফেন্সিভ এরিয়া মানে ডিফেন্সিভ পজিশনগুলোতে আপনি যে দুই সেন্টার ব্যাক নিয়ে খেলেছেন এবং রাইট ব্যাক সাদ ও লেফট ব্যাকে জায়ান। শুরুতে আসলে জায়ানের একটা মিসটেকে আমরা প্রথমেই আত্মঘাতী গোল হজম করলাম। তবে সেই গোলের জন্য শুধু সে নয়, গোলরক্ষক শ্রাবণও সমান দায়ী। পোস্ট ছেড়ে যখন আপনি বের হবেন তখন যেকোনো মূল্যে বলে স্পর্শ করতে হবে। শ্রাবণ সামনে বের হয়েছে ঠিকই কিন্তু বল হারিয়ে দিশাহারা হয়ে গেছে। শুরুতে গোল খেয়ে বসলে শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে লড়াইটা তখন আরো কঠিন হয়ে যায়, যে সংকটে পড়ে বাংলাদেশ এই প্রস্তুতি ম্যাচে।
আমার কাছে মনে হয়েছে, আমাদের স্কোয়াডটা তো আসলে শক্তিশালী অবস্থানে নেই। খেলেছেও খুব অগোছালো। আমরা যে অফসাইড ট্র্যাপগুলো করেছি সেখানে অনেকগুলো ভুল হয়েছে। মিডফিল্ডে হামজা, সোহেল রানা ও সোহেলÑযে ডায়মন্ড শেপে যেভাবে খেলেছে, সেখানে অনেক গ্যাপ ছিল। একই সঙ্গে আক্রমণের তিনজন ফাহমিদুল, মিরাজুল ও ফাহিম, তারাও মিডফিল্ডের সঙ্গে সেভাবে অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমরা মাত্র ৩৮ মিনিটের মধ্যে তিন গোলে পিছিয়ে যাই, এতেই আসলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণটা হারিয়ে ফেলি। আমি কোচের গেম প্ল্যানেও ভুল দেখতে পাচ্ছি। আমার কাছে মনে হয়েছে যে, সে বড় একটা ভুল করেছে, সে ৪-৩-৩ ফরমেশনে খেলেছে তবে তার মিডফিল্ড প্যাটার্নটা সে ঠিক রাখতে পারেনি; যার কারণে ডিফেন্সের ওপর একের পর এক প্রেশার এসেছে। সেই চাপ রক্ষণভাগ সামাল দিতে পারেনি।
আমার কাছে মনে হয়েছে, হাই এনার্জেটিক টিম হিসেবে ভিয়েতনাম যে প্যাটার্নের ফুটবল খেলে তেমন দলের বিরুদ্ধে এই ম্যাচে আমরা সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী দলই সাজাতে পারিনি।
মোরসালিনকে আমরা সেরা একাদশে রাখতে পারিনি। দ্বিতীয়ার্ধে আমরা চেষ্টা করেছি। এই অর্ধে কোনো গোল কনসিড করিনি। দেরিতে হলেও বিশ্বনাথ নেমেছে, জামাল নেমেছে ৭৭ মিনিটের সময়ে। তারা সে সময় যা করেছে তাকে বলে রক্ষা করার চেষ্টা। আর তাই আমরা আর কোনো গোল খাইনি। কিন্তু পিছিয়ে পড়ার বা ম্যাচ হারার জন্য যা হওয়ার কিন্তু ফার্স্ট হাফে হয়ে গেছে।
দেখলাম, কোচ বলছেন আমরা নাকি সেকেন্ড হাফে ভালো খেলেছি। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে, শেষের অর্ধে আমরা যে আর গোল খাইনি সেটাকেই তার শুধু ভালো মনে হয়েছে।
আমরা এই প্রস্তুতি ম্যাচে শুধু তিন গোলই খাইনি, সেই সঙ্গে প্রচুর মিসটেকও করেছি। গোলকিপিং, ডিফেন্স, মিডফিল্ড এবং অ্যাটাকিং প্রত্যেক পজিশনে আমরা শুধু ভুল আর ভুল করে গেছি।
সিঙ্গাপুরের সঙ্গে আসল ম্যাচে এই ভুলগুলো করা যাবে না। ভিয়েতনাম ম্যাচ ফিফা ফ্রেন্ডলি ছিল। এখানে হারলেও কোনো বড় সমস্যা নেই। তবে এই বড় হারের সঙ্গে আমরা সম্ভবত যে জিনিসটা খুইয়েছি তার নামÑআত্মবিশ্বাস।
৩১ মার্চ সিঙ্গাপুর ম্যাচের আগে এই আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়াই হবে আমাদের মূল কাজ।
-জাহিদ হাসান এমিলি, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

