দেশের সীমান্তবর্তী পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে মাদকের বিস্তার। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায়ে মাদক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন। মাদকাসক্ত নেই এমন কোনো গ্রাম খুঁজে পাওয়া যাবে না। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা আর প্রশাসনের পর্যাপ্ত উদ্যোগ না থাকায় জেলায় মাদকের ভয়াবহতা এমন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে বলে সচেতন মহলের অভিযোগ।
মাদককে ঘিরে দিনে দিনে অবনতির দিকে যাচ্ছে পর্যটন জেলা রাঙ্গামাটির সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতিতে সম্প্রতি জেলা পুলিশ মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে নেমেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাঙ্গমাটির ১০ উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে এখন মাদকের কারবার ও ব্যবহার চলছে। বিশেষ করে রাঙ্গামাটি শহরের পরিস্থিতি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে মাদকের আড্ডা, মাদক বেচাকেনা ও মাদক কারবারিদের আস্তানা রয়েছে, যা গড়ে উঠেছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দুই মেয়াদের সময় থেকে।
আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মাদকের কারবার ও ব্যবহারে নতুন মাত্রা যোগ হয় বলে একাধিক সূত্র বলেছে। সূত্র জানায়, এ সময় মাদকের ব্যাপারে প্রশাসনের নির্লিপ্ততা লক্ষ করা গেছে। আওয়ামী সরকারের গড়ে তোলা মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগ হয় নতুন কারবারিরা। এতে বর্তমান সরকারের অনেকের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। গেল মাসে এমন অভিযোগে শহরের কাঠালতলী থেকে সাবেক এক যুবদল নেতাকে আটক করা হয়, যার বিরুদ্ধে একাধিক মাদকের মামলা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা বিএনপির কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, ‘আগে বিএনপির সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন যারা মাদকের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারা এখন আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া মাদকসাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। এ নিয়ে আমরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
রাঙ্গামাটি জেলার তিন দিকে ভারত আর এক দিকে মিয়ানমার সীমান্ত। সমতলের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি মাদক ঢুকছে সীমান্ত দিয়ে। এসব সীমান্ত প্রায় অরক্ষিত, যেখানে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে পাহাড়িদের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের। তাদের হাত হয়ে মাদক ও বিদেশি সিগারেট চলে আসে স্থানীয় কারবারিদের কাছে। এই সিন্ডিকেটে রয়েছে পেশাদার মাদক কারবারি, পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন ও জাতীয় রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতা। গত দেড় বছরে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ সিগারেট ও গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাঙামাটি পৌর এলাকার রিজার্ভ বাজার, কাঠালতলী, তবলছড়ি, আসামবস্তি, রিজার্ভমুখ, হ্যাপির মোড়, ভেদেভেদি, রাজবাড়ি, হাসপাতাল এলাকা, শিমুলতলী, হ্যাচারিপাড়া, রূপনগরসহ শহরের আনাচে কানাচে মাদকের বেচাকেনা ও প্রকাশ্যে আড্ডা বসে। এসব এলাকার বহু তরুণ ছাত্র ও যুব সমাজ মাদকাসক্ত ও এর কারবারের সঙ্গে জড়িত।
স্থানীয়রা জানান, মাদকাসক্তদের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের কর্মী। তাই তাদের এলাকাবাসী চাইলেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাদের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ছোটখাটো মাদকসেবীদের আটক করলেও মাদক সিন্ডিকেটের গডফাদার বা হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। মাঝেমধ্যে দুয়েকজন মাদক কারবারি আটক হলেও তারা আইনের ফাঁকফোকরে বের হয়ে আবারও কার্যক্রম চালায়। এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের অসাধু কারো কারো হাত আছে বলে সচেতন মহলের অভিযোগ।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ বলেন, মাদকের বিষয়ে দলের অবস্থান জিরো টলারেন্স। দলের কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা মাদক ও জুয়াকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়কমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। এ ছাড়াও সাধারণ মানুষ বিভিন্ন সময়ে মাদকের বিস্তার রোধে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে নড়েচড়ে বসে রাঙামাটি পুলিশ প্রশাসন। মাঠ পর্যায়ে জরিপ শেষে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে অভিযান শুরু করে পুলিশ। ঈদের পর থেকে এ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে মাদকসেবী, আরবারি ও অসামাজিক কার্যকলাপে অভিযুক্ত অর্ধশতাধিককে আটক করা হয়েছে। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি মাদকের গডফাদারদের ধরার ছক করা হচ্ছে।
কোতোয়ালি থানার ওসি জসীম উদ্দিন জানান, মাদক পরিস্থিতি রাঙামাটি পুলিশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা রাঙামাটি শহরকে মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে অভিযানে নেমেছি। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ধর্মের শপথ নিয়ে অপরাধজগতে ভিড়ছে যুবকেরা