ক্রমেই প্রতিকূল বিশ্বের মুখোমুখি হচ্ছেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ক্রমেই প্রতিকূল বিশ্বের মুখোমুখি হচ্ছেন ট্রাম্প
ছবি: সংগৃহীত

মাসের পর মাস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে কটাক্ষ করে তাদের ব্যবসা ও রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করে আসছেন। তার বক্তব্যে প্রায়ই এমন ধারণা ফুটে ওঠে, যেন অন্যান্য দেশ রাষ্ট্র ও অর্থনীতি পরিচালনায় অদক্ষ। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিশ্বের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে অস্বীকার বা উপেক্ষা করেছেন, যা তার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।

ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতারা শান্তি আলোচনা থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে হাঙ্গেরির ভোটাররা ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ইউরোপীয় মিত্র প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে পোপ লিও ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করে জানিয়েছেন, তিনি ট্রাম্পকে ভয় পান না। ট্রাম্পের হুমকিমূলক বক্তব্যের জবাব হিসেবেই তিনি এ মন্তব্য করেন।

বিজ্ঞাপন

সাধারণভাবে ট্রাম্প ও তার সমর্থকরা এমন ভঙ্গিতে কথা বলেন, যেন বিশ্বরাজনীতির অন্য দেশগুলো কোনো গুরুত্বই বহন করে না—একটি ভিডিও গেমের নগণ্য খেলোয়াড়ের মতো। তাদের ধারণা, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র দেশ, যা নিজের স্বার্থে অন্যদের ওপর চাপ প্রয়োগ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কিছু মৌলিক নীতি রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো—প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি প্রতিক্রিয়া থাকে। সেই প্রতিক্রিয়া সবসময় সমান বা সম্পূর্ণ বিপরীত না হলেও, তা কখনোই একতরফাভাবে প্রত্যাশিত ফল দেয় না—বিশেষত ট্রাম্প যা চান, তা সবসময় বাস্তবায়ন হয় না।

ক্রমেই আরো বেশি আন্তর্জাতিক শক্তি ওয়াশিংটনের আধিপত্যের বিরোধিতা করছে, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত এই বাস্তবতাকে স্বীকার করতে পারেনি।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সাবেক সভাপতি রিচার্ড হাস বলেছেন, ট্রাম্প যদি বুঝতে পারতেন যে, ভয়ভীতি প্রদর্শন কোনো কার্যকর কৌশল নয়, তাহলে তিনি তা পরিত্যাগ করতেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি সেই পথ থেকে সরে আসছেন না।

তিনি আরো উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ভূরাজনীতি সম্পর্কিত সমালোচনামূলক তথ্য ট্রাম্পের কাছে পৌঁছায় না, কারণ তার আশপাশের মানুষ তাকে কঠিন সত্য জানাতে অনাগ্রহী। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার সময় ট্রাম্প ভাইস প্রেসিডেন্টসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করলেও, কেউই তাকে বাস্তব পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে জানাননি।

সম্প্রতি ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে ২১ ঘণ্টার বৈঠকের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর ও একপেশে মনোভাব স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন, ইরান তাদের দাবি মেনে নেয়নি, যেন আলোচনায় নয়, বরং নির্দেশ দিতে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এই মনোভাব ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে নেতিবাচকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, আর অন্যান্য দেশের জনগণ এটিকে উত্তেজনা কমানোর একটি সুযোগ হারানো হিসেবে দেখেছে।

একজন পশ্চিমা কূটনীতিক মন্তব্য করেন, কোনো পক্ষের কাছ থেকে কিছু পেতে হলে বিনিময়ে কিছু দিতে হয়—যদি না পরিস্থিতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো হয়, যেখানে একপক্ষ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু জিততেই থাকব’ এমন নীতি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এ বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেয়নি, যার ফল এখন তারা ভোগ করছে।

এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, ট্রাম্প বা তার সহযোগীরা তাদের সিদ্ধান্তের ফলে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়াগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করেন, কিংবা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। বরং মনে হয়, তারা এসব বিষয়ে উদাসীন।

ডেনমার্কের অধীন গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে ট্রাম্পের জোরাজুরি ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে একটি স্পষ্ট ‘রেড লাইন’ হয়ে ওঠে। যদিও ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার প্রথম বছরে ইউরোপীয় নেতারা তার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে তার অনড় অবস্থানের কারণে তারা জানিয়ে দেন—এটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এরপর ন্যাটোর কাঠামোর মাধ্যমে দ্বীপটিতে আমেরিকার সামরিক প্রবেশাধিকার কিছুটা বাড়ানো হলেও, মালিকানা হস্তান্তরের প্রশ্নে ইউরোপ অনড় অবস্থান বজায় রাখে, যা ট্রাম্পের ক্ষমতা কমার ইঙ্গিত বহন করে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন