মিয়ানমারে অং সান সূচির নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাত্র সাত দিনের মাথায় জেনারেল মিন অং লাইং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, নির্বাচন আয়োজন করে এক বছরের মধ্যে বেসামরিক শাসনে ফিরে যাবে দেশটি। দিনটি ছিল ২০২১ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি।
তবে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে তার সময় লেগেছে পাঁচ বছর।
আজ শুক্রবার নবনির্বাচিত সংসদ তাকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেবে। এই পদে বসার জন্য সংবিধান অনুযায়ী ইতোমধ্যেই তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
কিন্তু এটি কেবল নামমাত্র বেসামরিক শাসন।
অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো বসা এই সংসদ তার অনুগতদের দিয়েই পূর্ণ।
সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত এক-চতুর্থাংশ আসন এবং নির্বাচনের আগে সামরিক বাহিনীর নিজস্ব দল ইউএসডিপি তাদের পক্ষে তৈরি করা পরিবেশে অবশিষ্ট আসনের প্রায় ৮০ শিতাংশ জিতে নেওয়ায় ফলাফল মূলত পূর্বনির্ধারিত ছিল।
এটাকে নির্বাচনের চেয়ে বরং এক ধরনের অভিষেকই বলা যায়।
নতুন সরকার গঠিত হলে তাতেও সামরিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
আর সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে মিন অং লাইং-এর ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং একইসাথে কঠোরপন্থি এবং নিষ্ঠুরতার জন্য পরিচিত জেনারেল ইয়ে উইন উ’র স্থলাভিষিক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খোদ নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।
তিনি নতুন একটি পরামর্শদাতা পরিষদও গঠন করেছেন। এই পরিষদের কাছে বেসামরিক ও সামরিক সব বিষয়ে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষমতা থাকবে।
এক কথায় বলা যায়, সামরিক পোশাক খুললেও ক্ষমতা যেন না কমে সে বিষয়ে সচেষ্ট ছিলেন মিন অং লাইং।
কিয়াও উইনের (ছদ্মনাম) মতো তরুণ আন্দোলনকর্মীদের জন্য পরিবর্তনের সব আশা শেষ হয়ে গেছে। ছাত্রাবস্থায় ২০২২ সালের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং জেলে পাঠানোর আগে এক সপ্তাহ ধরে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। সম্প্রতি তিনি মুক্তি পেয়েছেন।
‘তারা লোহার রড দিয়ে আমার পিঠে মেরেছে। সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়েছে, ছুরি দিয়ে আমার উরুতে আঘাত করেছে। তারপর তারা আমার অন্তর্বাস খুলে নিয়ে আমাকে যৌন নির্যাতন করেছে। তারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, কিন্তু তারা যে আমার কাছ থেকে কী শুনতে চায় তা কখনোই স্পষ্ট ছিল না’।
কিয়াও উইনের ভাষায় বিপ্লবের প্রতি তার অঙ্গীকার অপরিবর্তিত রয়েছে, কিন্তু মিয়ানমারের ভেতর থেকে এখন তিনি খুব বেশি কিছু করতে পারছেন না। তিনি দেশের বাইরে কাজ খোঁজার কথা ভাবছেন।
মিন অং লৈঙ্গ লাইং’র অভ্যুত্থানের পর থেকে গত পাঁচ বছর মিয়ানমারের জন্য বিপর্যয়কর ছিল।
২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে অং সান সু চি এবং তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সংসদ যখন তাদের আরো এক মেয়াদের জন্য অনুমোদন দিতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ক্ষমতা দখল করা হলে জনরোষ উসকে দেওয়ার হিসাবটি তিনি মারাত্মকভাবে ভুল কষেছিলেন।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া গণবিক্ষোভের বিরুদ্ধে তার প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গৃহযুদ্ধের সূচনা করে, যা হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। বাস্তুচ্যুত করেছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে, আর ধ্বংস করে দিয়েছে দেশটির অর্থনীতিকে।
সামরিক শাসন দেশের বিশাল এলাকা সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনীর কাছে ছেড়ে দিয়েছে। এর জবাবে তারা বিরোধী পক্ষের নিয়ন্ত্রিত গ্রামগুলোতে নির্বিচার বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলা ধ্বংস করে দিয়েছে স্কুল, বাড়িঘর এবং হাসপাতাল।
এটি মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের এক সামরিক কৌশল, যা ‘চার আঘাত’ নামে পরিচিত। এর উদ্দেশ্য হলো বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনকারী সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দেওয়া। চীন ও রাশিয়ার সহায়তায় সামরিক জান্তা বর্তমানে গত দুই বছরে হারানো কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে।
মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদো-এ প্রতি যে জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। শেষবারের মতো সেখানে সভাপতিত্ব করার সময়, অভ্যুত্থানের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে তার বক্তব্যে আত্মসমালোচনা বা অনুশোচনার কোনো ইঙ্গিত আছে কি না—আমরা তা মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলাম। সেখানে এমন কিছুই ছিল না।
বরং আমরা আবারও সেই পুরোনো, দ্বিধাহীন সামরিক হস্তক্ষেপের যুক্তিগুলোই শুনেছি।
‘গঠনমূলকভাবে জাতীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার’ সাংবিধানিক ম্যান্ডেট সেনাবাহিনীর রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তারাই বহুদলীয় গণতন্ত্র টিকিয়ে রেখেছে—এমন দাবিও করেন তিনি।
সামরিক শাসনের বিরোধীদের ‘সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিদেশি আগ্রাসী ও স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক সুবিধাবাদীরা’ তাদের পেছনে রয়েছে। তার বক্তব্যে এমন কিছুই ছিল না যা থেকে মনে হতে পারে, ইউনিফর্ম পরা অবস্থার তুলনায় বেসামরিক পোশাকে মিন অং লাইং ভিন্নভাবে মিয়ানমার শাসন করবেন।
‘মিয়ানমারের সংঘাত মূলত অপরিবর্তিতই থাকবে,’ বলেন সশস্ত্র সংঘাত সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা সংস্থা এসিএলইডি’র জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সু মন।
‘নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়ে উইন উ একজন অনুগত ব্যক্তি, যার পরিবারের সঙ্গে মিন অং লাইং-এর পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। হারানো ভূখণ্ড পুনর্দখলের লক্ষ্যে তিনি সম্ভবত তার পথই অনুসরণ করবেন। প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো এখনো প্রায় ৯০টি শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। এর অর্থ হলো—প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বেসামরিক মানুষের ওপর আরো বিমান ও ড্রোন হামলা, আরও পোড়ামাটি কৌশল।’
অভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া প্রশাসনের প্রতিনিধিত্বকারী ন্যাশনাল ইউনিটি গভার্নমেন্ট থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে পরিচালিত হয়। তারাও তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে না।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় তারা হিমশিম খেলেও, নতুন সরকার, সংসদ এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনকে তারা পুরোপুরি অবৈধ বলেই মনে করে। তারা জানিয়েছে, রাজনীতি থেকে সেনাবাহিনীকে অপসারণ এবং নতুন একটি ফেডারেল সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে তারা লড়াই চালিয়ে যাবে।
‘এটা সমঝোতার সময় নয়,’ বলেন মুখপাত্র নে ফোন লাট। ‘সেনাবাহিনী যদি আমাদের লক্ষ্য মেনে না নেয়, আমাদের বিপ্লব চলতেই থাকবে। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমরা যদি এখন থেমে যাই, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম, আমাদের মানুষ, আরো বেশি ভোগান্তির শিকার হবে।’
মিন অং লাইং’র অভ্যুত্থান অর্থনীতিতে এক বিপর্যয়কর আঘাত হেনেছে।
জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে এক কোটি ৬০ লাখেরও বেশি মানুষের জীবনরক্ষাকারী সহায়তার প্রয়োজন। যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি জীবনযাত্রার মান ধসিয়ে দিয়েছে।
এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকট।
মিয়ানমারের আমদানিকৃত ৯০ শতাংশ তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের বেশিরভাগই আসে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে। তারাও এখন রপ্তানি সীমিত করছে। পেট্রোল ও ডিজেল রেশনিং করা হচ্ছে, আর যে দাম আগেই প্রতিবেশী থাইল্যান্ডের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি ছিল—তা আরো বেড়ে গেছে।
‘এখন আর ১০ বছর আগের পার্থক্য দিন-রাতের মতো,’ বলেন ইয়াঙ্গুনের শিল্প এলাকা লাইং থারইয়ারের মোটরবাইক ট্যাক্সিচালক টিন উ। ‘আমরা ভাড়া আর খাবারের খরচ মেটানোর মতোও আয় করতে পারি না।’
নতুন সরকারের ওপর তার খুব একটা আস্থা নেই।
‘তারা আমাদের নিয়ে ভাববে না। আমাদের এখনো নিজেদের ওপরই নির্ভর করতে হবে। এখন সৎভাবে সাধারণ জীবনযাপন করার চেষ্টা করলে টিকে থাকা কঠিন, কিন্তু অসৎ হলে ধনী হওয়া যায়।’
জ্বালানি সংকট মিয়ানমারের ব্যবসার জন্য বিশেষভাবে কঠিন, কারণ অনেক প্রতিষ্ঠানই বিদ্যুতের জন্য জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল; ইয়াঙ্গুনের বেশিরভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ গ্রিড দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
এই অচলাবস্থার মধ্যে, বহু বছর সামরিক কারাগারে কাটানো অভিজ্ঞ রাজনৈতিক কর্মী মিয়া আয় এ সপ্তাহে যুক্তি ও প্রতিরোধের এক বিরল কণ্ঠ নিয়ে সামনে এসেছেন। তার যুক্তিতে, সংকট থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো সামরিক বাহিনী এবং তাদের অসংখ্য বিরোধীর মধ্যে একটি সমঝোতা খুঁজে বের করা।
তিনি একটি নতুন কাউন্সিল গঠন করেছেন। এই কাউন্সিলের মাধ্যমে সংলাপের আহ্বান ও সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি দাবি করে তার সঙ্গে একমত সবাইকে একত্রিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
তার সঙ্গে কয়েকজন পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। তবে তার দাবি, আরও অনেকের সঙ্গেই তিনি গোপনে আলোচনা করছেন।
‘এই নির্বাচন কোনো সমাধান নয়,’ বলেন তিনি।
‘মিন অং লাইং তার জনগণের সঙ্গে খেলা খেলছেন। বর্তমান সংবিধান দিয়েও আমরা এগোতে পারব না। কিন্তু জনগণ এই পরিস্থিতিতে ক্লান্ত। আমরা যদি কোনো পথ খুঁজে না পাই, দেশ ধসে পড়বে। আসলে, এটি ইতোমধ্যেই ধসের মধ্যে রয়েছে।’
তার মতে, কারাবন্দি গণতান্ত্রিক নেত্রী অং সান সূচিকে মুক্তি দেওয়া হলে, ৮০ বছর বয়সেও তিনি একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতা খোঁজার ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারবেন।
এ বছর কোনো এক সময় মিন অং লাইং তাকে মুক্তি দিতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। বিশেষ করে এখন যখন অবশেষে রাষ্ট্রপতি হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা তার অভ্যুত্থান ঘটানোর সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছিল তাও পূরণ হয়ে গেছে।
তবে মিয়ানমারে শান্তির কোনো পথ থাকলেও, তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সংকীর্ণ—এবং আপাতত দেশটির সামরিক শাসকরা সেই পথে হাঁটতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


কঙ্গোতে ভয়াবহ হামলায় নিহত অন্তত ৪৩
৪০ জনের বেশি হিজবুল্লাহ সদস্যকে হত্যার দাবি ইসরাইলের