আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার

বাংলাদেশের নির্বাচন: মূল খেলোয়াড় ও দল কারা

আমার দেশ অনলাইন

বাংলাদেশের নির্বাচন: মূল খেলোয়াড় ও দল কারা

২০২৪ সালে সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি একই দিনে জুলাই সনদের ওপর অনুষ্ঠিত হবে গণভোট।

সংসদের ৩০০ আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দুটি বৃহত্তম দল হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যা ১০ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং জামায়াতে ইসলামী (জেআইবি), যা ১১ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। জামায়াতের জোটে রয়েছে হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

দুটি প্রধান ব্লক ছাড়াও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বেরিয়ে আসা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং হাসিনার আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের মিত্র জাতীয় পার্টি স্বাধীনভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল:

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপিকে আসন্ন নির্বাচনে অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

১৯৭৮ সালে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী নীতির ওপর ভিত্তি করে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন তারেক রহমানের বাবা এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দেশের মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সামরিক ব্যক্তিত্ব জিয়াউর রহমান।

একটি মধ্য ডানপন্থি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি কয়েক দশক ধরে দেশের একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এবং ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে আসছে।

৬০ বছর বয়সি তারেক রহমান ২০০৮ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বসবাস করছিলেন। ৩০ ডিসেম্বর তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর আগে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য তিনি ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন।

ডিসেম্বরে দেশে ফিরে তিনি পাহাড় ও সমতলের নাগরিকদের— মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সবাইকে নিয়ে একটি নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতি গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন। সেই সঙ্গে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্নেন্সের প্রভাষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান বলেন, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের পর থেকে বিএনপি আরো সংগঠিত হয়েছে।

তিনি বলেন, দলটি মূলত তার কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যে একটি নতুন চেতনা নিয়ে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।

রেজওয়ান আরো বলেন, ‘বিএনপি ও সহযোগী দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে….যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জনরোষ তৈরি করতে পারে এমনে কোনো বক্তব্য দেওয়া এড়াতে তুলনামূলকভাবে সতর্ক রয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতারা। তাৎপর্যপূর্ণভাবে মধ্যরাতেও তারেক রহমানের নির্বাচনি সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ তার বক্তব্য শুনতে ভিড় করছেন।’

তিনি বলেন, ‘ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে তারেক রহমানই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশকে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি’ দিয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন। বিপরীতে তার জামায়াত প্রতিদ্বন্দ্বীরা কোনো স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, বিশেষ করে নারী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু ইস্যুতে।

জামায়াতে ইসলামী:

১৯৪১ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী এই দল প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। স্বাধীনতার পর দলটি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে ১৯৭৯ সালে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান।

পরবর্তীতে জামায়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি জোটে ছিল দলটি।

জামায়াত আর বিএনপি জোটে নেই। তাদের বর্তমান নেতা, ৬৭ বছর বয়সী শফিকুর রহমান, নির্বাচনে দলকে একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

রোববার জামালপুর শহরে এক নির্বাচনি সমাবেশে বক্তৃতাকালে শফিকুর রহমান বলেন, আসন্ন নির্বাচন ‘একটি টার্নিং পয়েন্ট হবে’।

তার দলের এই পুনরুত্থান বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, বাংলাদেশ কোনো ইসলামী শক্তির নেতৃত্বে থাকতে প্রস্তুত কি না। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, জামায়াত জোট বিজয়ী হলে ইসলামী আইন প্রয়োগ এবং নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা সীমিত করার চেষ্টা করতে পারে।

তবে জামায়াত এ ধরনের আশঙ্কা প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের জানানো হয়, তারা তাদের নির্বাচনি শক্তি সম্প্রসারণের দিকে মনোনিবেশ করছে।

ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিসহ বীর মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সঙ্গে জোট ঘোষণা করেছে জামায়াত।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, অমুসলিম ভোটারদের আকৃষ্ট করতে খুলনা থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী করেছে জামায়াত ।

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির রেজওয়ানের মতে, বাংলাদেশের সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিতে জামায়াতের একটি প্রভাব রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিয়ন নির্বাচনে তাদের ছাত্র সংগঠন আক্ষরিক অর্থেই অন্য যেকোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে ছাড়িয়ে গেছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি:

জামায়াত জোটে থাকা এনসিপি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত হয়, যারা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে গণবিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত হাসিনা সরকারকে উৎখাত করে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক সমাবেশে দলটির নেতারা জানান, তারা জুলাই আন্দোলনের চেতনা সমুন্নত রাখার জন্য দল গঠন করেছেন।

২৭ বছর বয়সি নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে এনসিপির ঘোষিত আদর্শ হলো ‘দুর্নীতিমুক্ত শাসন’ নিশ্চিত করা এবং দেশকে ঐক্যবদ্ধ করা। দলটি বলে যে তাদের লক্ষ্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা, সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নত করা।

কিন্তু নির্বাচনে নিজেদের পক্ষে লড়াই করার জন্য পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে দলটি জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছে। তবে, বাংলাদেশে কেউ কেউ এই পদক্ষেপকে ভালোভাবে নেয়নি। আদর্শগত পার্থক্যের কারণে এনসিপির কিছু সদস্য পদত্যাগও করেছেন।

গত মাসে এবিসি নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, ‘এই জোট কৌশলগত, আদর্শগত নয়।’

রেজওয়ান বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক, রাজনৈতিক দলটি এখন একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের জুনিয়র অংশীদার হয়ে উঠছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘নাহিদ কার্যত জামায়াতের অনুগত হয়ে তার রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও ভাবমূর্তি বিক্রি করে দিয়েছেন।’

নির্বাচনে অন্য গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় কারা?

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি, বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও এই নির্বাচনে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।

রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের জন্য প্রচারণা চালাচ্ছে, আর ড. ইউনূস জুলাই সনদের ওপর গণভোটের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন, যা একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে।

সেনাবাহিনী নির্বাচনি ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না, তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশে ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের সময় জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর তাদের মনোযোগ থাকবে।

রেজওয়ানের মতে, একটি সফল নির্বাচনের জন্য ড. ইউনূস ও সেনাপ্রধান উভয়েরই সদিচ্ছার প্রয়োজন হবে।

হাসিনার কি আদৌ কোনো ক্ষমতা আছে:

বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত হাসিনা আসন্ন নির্বাচনের সমালোচনা করেছেন, কারণ তার দল আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

রেজওয়ান বলেন, ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে তিনি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে উসকানি দিতে পারেন।

তিনি বলেন, ‘যদি হাসিনা একজন নগণ্য ব্যক্তিত্ব হতেন, তাহলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার সব বক্তৃতা এবং বিবৃতি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বা সংবাদপত্রে ছাপানো নিষিদ্ধ করত না। তাকে কথা বলতে দেওয়ায় ভারতের বিরুদ্ধে এত কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাত না অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।’

রেজওয়ান বলেন, ‘এর অর্থ হলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরোক্ষভাবে বিশ্বাস করে যে আওয়ামী লীগ জনগণের ওপর প্রভাব ফেলে, যারা এখনো কাকে ভোট দেবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, কারণ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগের নিজস্ব স্পষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং অনুগত কর্মীদের একটি ভিত্তি রয়েছে।’

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন