“আমি ভগবান রামের ভক্ত, কিন্তু আমি আর মন্দিরে দান করব না। আমার বাবা, ঠাকুরদার স্বপ্ন ছিল রামের মন্দির হোক, সেটা পূরণ হয়েছে। তবে রামলালার জন্য ভক্তি আমি আলাদাভাবে প্রকাশ করব।” ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে এভাবে বলছিলেন ভারতের উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা ও রাম ভক্ত প্রাচী খারে।
রামগোপাল গোয়েল নামে আরেক ভক্ত রাম মন্দির দর্শনে এসে বলেন, ভগবানের উদ্দেশ্যে দেওয়া দান এই বেইমানরা পকেটে ভরে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের আবেগের কোনো মূল্য তাদের কাছে নেই।
রাম মন্দিরে আর্থিক তছরুপ ও কেলেঙ্কারির বিভিন্ন রিপোর্ট সামনে আসার পরে প্রাচীর মতো অসন্তুষ্ট হয়েছেন বহু রাম ভক্ত। প্রাচী খারে ও রামগোপাল গোয়েলদের মতই বহু ভক্ত যারা চেয়েছিলেন অযোধ্যায় রাম মন্দির তৈরি হোক, তারা এখন নিজের ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন।
সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে, ভক্তদের দান করা অর্থ, বহুমুল্য গয়না, সোনা, রূপার সামগ্রী তছরুপ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এই মামলা গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের তিন সদস্যের বিশেষ টিম রিপোর্ট পেশ করেছে; যার উপর ভিত্তি করে অযোধ্যা পুলিশ আট জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
যদিও শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট সবরকম অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে ওই আটজনকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে বিবিসি হিন্দিকে জানিয়েছেন সিনিয়র পুলিশ অফিসার গৌরব গ্রোভার।
এই নিয়ে ইতোমধ্যে কড়া অবস্থান গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তিনি বলেছেন, অযোধ্যা সম্পর্কে যা খবর পাওয়া গেছে সেখানে আমরা এসআইটি গঠন করেছি। এসআইটি রিপোর্ট আসার সাথে সাথে আমাদের পূর্ণ তৎপরতায় কাজ শুরু হয়েছে। আমি আশ্বস্ত করতে আপনাকে বলতে পারি, এর শেষ দেখে ছাড়া হবে।
তিনি বলেন, জনগণের ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে খেলা অগ্রহণযোগ্য। যদি কেউ এই বিশ্বাসের সঙ্গে ছিনিমিনি খেলে, তাকে এর ফল ভোগ করতে হবে। কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না।
অভিযোগটি ঠিক কী?
তীর্থযাত্রী সুবিধা কেন্দ্রে দানপাত্রগুলো নিয়ে যাওয়ার পর সেই ৪০টি দানপাত্র খুলে গণনা করার কাজ দেওয়া হয়েছিল একটি টিমকে। এফআইআরে যাদের নাম আছে, তারা সকলেই এই টিমেরই অংশ। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা মন্দিরের আমানত আত্মসাতের অভিযোগে তাদের ভূমিকা তদন্তকারী সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখছে।
শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সদস্য কৃষ্ণ মোহনের অভিযোগের ভিত্তিতে রাম জন্মভূমি থানায় এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়। এই মামলাটি ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অন্তর্গত কর্মচারী কর্তৃক চুরি, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র সম্পর্কিত ধারায় নথিভুক্ত করা হয়েছে।
এফআইআরে নাম থাকা ব্যক্তিরা হলেন টিন্নু যাদব, অনুকল্প মিশ্র, লবকুশ মিশ্র, অবিনাশ শুক্লা, মনীশ যাদব, সুভাষ শ্রীবাস্তব, করুণেশ পান্ডে এবং রামশঙ্কর মিশ্র।
টিন্নু যাদব তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে ছিলেন, আর বাকিরা নগদ টাকা গণনার কাজে জড়িত ছিলেন। দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা ভক্তদের অনুদান আত্মসাৎ এবং ট্রাস্টের তহবিল অপব্যবহারের ষড়যন্ত্র করেছিল।
গত ১৩ জুন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর ট্রাস্টের অনুরোধে এসআইটি গঠন করা হয়। এই কমিটির প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন বিজয় বিশ্বাস পন্থ। প্যানেলে রয়েছেন অর্থ বিভাগের বিশেষ সচিব নীলরত্ন কুমারও।
এই ঘটনায় পদ্ধতিগত ত্রুটি চিহ্নিত করা এবং এর পেছনে কোনো বৃহত্তর ষড়যন্ত্র ছিল কি না, তা তদন্ত করার দায়িত্ব কমিটিকে দেওয়া হয়েছে।
অযোধ্যার মন্দিরে বিপুল দানের খতিয়ান
অযোধ্যার রাম মন্দিরে মূল মন্দির ছাড়াও মোট ছয়টি ছোট মন্দির রয়েছে। সব মিলিয়ে এই কমপ্লেক্সে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ হাজার মানুষ আসেন।
দেশটির সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে রাম মন্দিরে দানের পরিমাণ ছিল, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৩০ কোটি টাকার কাছাকাছি। যা এই মন্দিরকে অর্থের নিরিখে ধনীতম মন্দিরগুলোর মধ্যে অন্যতম করে তুলেছে।
অযোধ্যার এক সাবেক জনপ্রতিনিধি অভিযোগ করেছেন, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় সাত কোটি টাকার সম্পত্তি নয়ছয় হয়েছে।
যদিও মন্দির কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ফেসবুকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সদ্য ইস্তফা দেওয়া বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতা চম্পত রাই বলেন, অনুদান গণনার প্রক্রিয়া ও গণনা কক্ষসহ ট্রাস্টের যাবতীয় কার্যক্রম নিয়মিতভাবে ট্রাস্টি ও কর্মীদের পাশাপাশি স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার কয়েকজন কর্মী নিরীক্ষণ করে থাকেন।
তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েক দিন ধরে চলে এবং বর্তমানে এভাবেই কাজ চলছে। এখন পর্যন্ত কোনো গরমিল বা অসঙ্গতি নজরে আসেনি।
যদিও সর্বশেষ খবর যা পাওয়া গেছে, তাতে এই তছরুপের জেরে চম্পত রাইকে ৩ দিনের মধ্যে অযোধ্যা ত্যাগ করার হুমকি দিয়েছে বার অ্যাসোসিয়েশন। এছাড়াও অযোধ্যার বার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের পক্ষে কোনো আইনজীবী লড়াই করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে আটজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
যেভাবে সূচনা হলো কেলেঙ্কারির
ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত একটি মন্দিরে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মন্দিরটি এমন এক স্থানে অবস্থিত যা কয়েক দশক ধরে ভারতের অন্যতম প্রধান ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আইনি বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
অনেক হিন্দু বিশ্বাস করেন, অযোধ্যা দেবতা রামের জন্মস্থান। এই ভূমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির নেতৃত্বে দেশজুড়ে চালানো জোরালো প্রচারণার জেরে ১৯৯২ সালে বহু হিন্দু কর্মী সমর্থকরা বাবরি মসজিদটি ভেঙে ফেলেছিল।
ভক্তদের দেওয়া অনুদান ও প্রণামী ব্যবস্থাপনায় কথিত অনিয়মের বিষয়টি প্রথম সামনে আনেন মহিপাল সিং, তিনি আগে ট্রাস্টের হিসাব বিভাগের তদারকি করতেন। তাকেই হুইসেলব্লোয়ার হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
সিং প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, উপহার হিসেবে পাওয়া নগদ অর্থ ও মূল্যবান ধাতু ব্যবস্থাপনার বিষয়ে অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করার পরই তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বিবিসি হিন্দি তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রাণনাশের হুমকির কথা উল্লেখ করে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি বলেন, আমি প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছি। আমি প্রচণ্ড চাপ ও মানসিক উদ্বেগের মধ্যে আছি। এখন কোনো কিছু বলার মতো অবস্থায় আমি নেই। এ পর্যন্ত প্রকাশ্যে আমি যা কিছু বলেছি, দয়া করে সেটুকুকেই আমার বক্তব্য হিসেবে গণ্য করবেন।
সিংহের উত্থাপিত বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হয়নি। তবে গত ৭ জুন বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। সেদিন রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব অনুদানের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং এ বিষয়ে তদন্তের দাবি জানান।
সামাজিক মাধ্যমের একাধিক পোস্ট দিয়ে তিনি অনুদান ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দাবি করেন এবং পুরো বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
তার দলের সহকর্মী ও অযোধ্যার সাংসদ অবধেশ প্রসাদ দাবি করেন, বিষয়টি আদালতের তত্ত্বাবধানে গঠিত কোনো দলের মাধ্যমে তদন্ত করা উচিত। এছাড়া তদন্ত চলাকালীন ট্রাস্টের সদস্যদের তাদের পদ থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে রাখারও আহ্বান জানান তিনি।
বহু হিন্দু মনে করেন, যে জায়গায় রাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন ওই মন্দিরটি ভেঙে ওই জায়গায় বাবরি মসজিদ স্থাপন করেছিলেন প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর। এই নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে ভারতে বহু জলঘোলা হয়েছে। ২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ওই স্থানে হিন্দু পক্ষের দাবিকে মান্যতা দেয়। ২০২৪ সালে ওই স্থানে একটি রাম মন্দির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই মন্দির নির্মাণ বিজেপি সরকারের প্রস্তাবিত কর্মসূচির একটি ছিল।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


