আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সৌদি-আমিরাতের উত্তেজনায় বদলাচ্ছে আঞ্চলিক সমীকরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সৌদি-আমিরাতের উত্তেজনায় বদলাচ্ছে আঞ্চলিক সমীকরণ
ছবি: সংগৃহীত

উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ছিল ঘনিষ্ঠ মিত্র। দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধের চিন্তাও ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু নতুন বছরে ঘনিষ্ঠ মিত্রতার এ সম্পর্ক বদলে গেছে খোলাখুলি শত্রুতায়।

এর আগে তেল উৎপাদন থেকে শুরু করে সুদানে যুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য হলেও তা কখনোই প্রকাশ্য ছিল না। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার দক্ষিণ ইয়েমেনের বন্দর আল-মুকাল্লায় বোমা হামলা চালায় সৌদি আরব। রিয়াদ জানান, তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি অস্ত্রের চালান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

স্বাভাবিক আচরণের বাইরে গিয়ে রিয়াদ বিরলভাবে আবুধাবির কঠোর সমালোচনা করে। সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আবুধাবির ‘প্রচণ্ড বিপজ্জনক’ আচরণ রিয়াদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এর বিপরীতে আমিরাতও ছেড়ে কথা বলেনি। দেশটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, সৌদি আরব ‘মৌলিকভাবে ভুল’ তথ্য প্রচার করছে।

দুই দেশের ভাষ্যকারদের মধ্যে এ নিয়ে বর্তমানে বাকযুদ্ধ চলছে। পরস্পর পরস্পরকে তির্যক বাক্যে বিদ্ধ করছে তারা। আমিরাতি রাজনৈতিক ভাষ্যকার আবদুল খালেক আবদুল্লাহ বলেছেন, দক্ষিণ ইয়েমেনে ‘হীন সামরিক হামলা’ কোনো ধরনের ‘বাহাদুরির কাজ হয়নি’।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সৌদি ভাষ্যকার আবদুল আজিজ আলগাশিয়ান বলেন, সাধারণত আমিরাতের পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেন না, যাতে ‘আলোচনা অস্বস্তিকর হয়ে না ওঠে।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন দিকে যাচ্ছে যেখান থেকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা সম্ভব হবে না।’

আলগাশিয়ান অভিযোগ করেন, আঞ্চলিক নৈরাজ্যবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ভৌগোলিক সীমান্ত ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলানোর চেষ্টা করছে। সৌদি আরবের ক্ষতির বিনিময়ে হলেও এতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য সুবিধা এনে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সৌদি আরব কখনোই তার প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পৃক্ত বাহিনীর ওপর সরাসরি বোমা হামলা করেনি। এমনকি এক দশক আগে কাতার অবরোধের চরম উত্তেজনার মধ্যেও এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। রিয়াদ ও আবুধাবির বর্তমান প্রকাশ্য বৈরিতা কতদূর বাড়বে, তার ওপর ২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নির্ভর করছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বেকার ইনস্টিটিউটের ফেলো ও উপসাগরীয় বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টেইন আলরিকসন মিডল ইস্ট আইকে বলেন, কয়েক বছর ধরেই এ মতপার্থক্য চলে এসেছে। এখন মীমাংসার কোনো ব্যবস্থাই আর কাজ করছে না।

সুদান ও ইয়েমেনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘সশস্ত্র অরাষ্ট্রীয় পক্ষগুলোকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে সৌদি আরব ও মিসরের মতো মৌলিক অংশীদারদের সঙ্গে আঞ্চলিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতায় প্রান্তিক অবস্থানে পৌঁছাতে যাচ্ছে আমিরাত।’

নভেম্বরে মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে জানানো হয়, সুদানে আধা-সামরিক র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সকে (আরএসএফ) আমিরাতের সমর্থনের জেরে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে লবিং করছেন। পরে ট্রাম্প নিজেই তা প্রকাশ করে দেন। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, এ লবিং ইয়েমেনে দুই শক্তির মধ্যে সম্পর্ক বিরূপ হওয়ার বড় একটি কারণ।

সুদানের গৃহযুদ্ধে আমিরাত যেখানে আরএসএফকে সমর্থন দিচ্ছে, সেখানে সৌদি আরব সুদানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করছে। ইয়েমেনে দুই পক্ষই ইরান সমর্থিত হুথি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থনে দাঁড়ালেও, কয়েক বছর থেকেই এসটিসিকে সহায়তা দিয়ে আসছে আমিরাত। ডিসেম্বরে দক্ষিণ-পূর্ব ইয়েমেনের বিশাল এলাকা বিচ্ছিন্নতাবাদী দলটি দখল করে। এর জেরে সৌদি আরব হামলা চালায়।

দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধের আরেকটি ক্ষেত্র সোমালিয়া। ২৬ ডিসেম্বর সোমালিল্যান্ডকে ইসরাইলের স্বীকৃতির পর অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সৌদি আরব এর নিন্দা জানায়। কিন্তু নিন্দা জানানো মুসলিম ও আরব দেশগুলোর লম্বা তালিকায় অনুপস্থিত থাকে আমিরাত। সোমালিল্যান্ডে আমিরাত সামরিক ঘাঁটি নির্মাণসহ বিভিন্ন তৎপরতায় যুক্ত রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে সীমারেখা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। আমিরাত যেখানে আধা-সামরিক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে, সেখানে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব আফ্রিকায় বিদ্যমান সীমানা ও অবস্থা টিকিয়ে রাখতে রাজনৈতিক জোট গড়ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন