কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা গভীর জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে: মহিলা পরিষদ

কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা গভীর জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে: মহিলা পরিষদ

নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা একটি গভীর জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। দলবদ্ধ ধর্ষণে ১৪২ জন, আত্মহত্যায় ২০৩ জন এবং ধর্ষণের চেষ্টার ক্ষেত্রে ১১৭ জন কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে।

অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মধ্যে হত্যার শিকার হয়েছেন ৭৫৬ জন, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৭৬ জন এবং যৌন হয়রানির ঘটনায় ১২৫ জন সর্বোচ্চ সংখ্যায় আক্রান্ত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

সোমবার প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন চিত্র-২০২৫ সমীক্ষা প্রতিবেদন’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদে সংরক্ষিত ১৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনার ওপর ভিত্তি করে সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে।

সমীক্ষায় দেখা যায়, ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হয়রানি, হত্যা, আত্মহত্যা, যৌতুক এবং বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পক্ষে সমীক্ষাবিষয়ক তথ্য উপস্থাপন করেন সিনিয়র প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মকর্তা আফরুজা আরমান। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শৈশবে যৌন সহিংসতার ঝুঁকি বেশি থাকলেও বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হত্যাকাণ্ড ও আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে গৃহিণীদের মধ্যে হত্যার ৫৮ শতাংশ, আত্মহত্যার ৬৩ শতাংশ এবং যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতার ৯৪ শতাংশ প্রধান শিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একইভাবে শিক্ষার্থী কন্যাশিশুরা ধর্ষণের চেষ্টা ৮০ শতাংশ, আত্মহত্যা ৬৭ শতাংশ, দলবদ্ধ ধর্ষণ ৩৯ শতাংশ এবং বাল্যবিবাহের ১০০ শতাংশ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

সমীক্ষায় আরও উল্লেখ করা হয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষী ও প্রমাণের দুর্বলতা এবং সামাজিকভাবে ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার প্রবণতা অপরাধীদের দায়মুক্তিকে উৎসাহিত করছে।

সংবাদ সম্মেলনে মডারেটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম।

সমীক্ষায় আরও দেখানো হয়, গৃহ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উভয় স্থানই নারী ও কন্যাশিশুর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে, যা তাদের নিরাপত্তা সংকটকে আরও তীব্র করেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, জবাবদিহি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মডারেটরের বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, সমীক্ষার পর্যবেক্ষণ আমাদের সামনে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সহিংসতার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে নারীর কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। ছয় বছরের শিশু থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব গৃহিণী পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নারী সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে ধর্ষণের ঘটনায় ছয় থেকে নয় বছর বয়সী শিশুকন্যার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হওয়া আমাদের সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বার্তা দেয়।

কন্যাশিশুদের এই বয়স প্রমাণ করে, ধর্ষণের জন্য কখনোই ভুক্তভোগী দায়ী নয়; দায়ী অপরাধী এবং সেই সামাজিক মানসিকতা, যা অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়। আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ধর্ষণের পাশাপাশি হত্যার ঘটনাও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ আজ নারী শুধু যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন না, তার জীবনও ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। এটি কেবল নারীর সংকট নয়; এটি সমগ্র সমাজের নিরাপত্তা ও মানবিকতার সংকটকে তুলে ধরে।

তিনি এ সময় গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে বলেন, এই ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যমকে শুধু ঘটনা প্রকাশ নয়, বরং সেই ঘটনাগুলোর সামাজিক ও কাঠামোগত কারণও তুলে ধরার আহ্বান জানান। অন্যদিকে সহিংসতার ঘটনার পর প্রায়ই ভুক্তভোগীর পরিচয়, জীবন ও পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়; কিন্তু অপরাধী সম্পর্কে খুব কমই জানানো হয়। এই প্রেক্ষাপটে ভুক্তভোগীর প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি অপরাধীকেও দৃশ্যমান করতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ধর্ষণ, হত্যা বা এ ধরনের সহিংসতা ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু প্রায়ই এসব অপরাধের ক্ষেত্রে স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে আপস করার চেষ্টা দেখা যায়। এটি শুধু অন্যায় নয়, আইনগতভাবেও গ্রহণযোগ্য নয়। ফৌজদারি অপরাধের বিচার আদালতেই হতে হবে; সালিশের মাধ্যমে এর নিষ্পত্তির চেষ্টা বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে এবং অপরাধীদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করে।

আজকের এই সমীক্ষা কেবল তথ্য উপস্থাপন করেনি; এটি সকলের সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণও তুলে ধরেছে। নারী নির্যাতনের বিষয়টি কেবল নারীর সমস্যা নয়; এটি সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন। যখন নারীর ওপর সহিংসতা বৃদ্ধি পায়, তখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজই তার ক্ষতি বহন করে।

তাই নারী নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনাকে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি নারী নির্যাতন প্রতিরোধের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে এবং সমাজকে নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক করে তুলতে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং নারী আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ, সম্পাদকমণ্ডলী, কর্মকর্তাগণ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। সঞ্চালনা করেন প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার সম্পাদক রীনা আহমেদ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন