হরমুজ প্রণালি চালু রাখতে চীনের সহযোগিতা চেয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে চীন ইতিবাচক সাড়া না দেওয়ায় নির্ধারিত চীন সফর পেছানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। ফলে অনিশ্চয়তায় পড়েছে চলতি মাসের শেষে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক ।
বিশেষ করে রিপাবলিকান এই নেতা ‘হরমুজ প্রণালি’ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন এবং চীনকে চাপে ফেলতে তিনি দেশটিতে তার নির্ধারিত সফরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে বিশ্বে তেল সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এবং বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে ট্রাম্প রোববার ‘ফিন্যানশিয়াল টাইমস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি খোলার জন্য তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তাতে চীনের সাহায্য করা উচিত।
কারণ, তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল চীন। তারা সাহায্য করবে কি না, সফরের আগেই যুক্তরাষ্ট্র তা জানতে চায় বলে জানান ট্রাম্প। তার পরই তিনি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘চীন সফর পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে।’
চীনের সাহায্য চাওয়ার আগের দিন ট্রাম্প একটি বহুজাতিক দলে যোগ দেওয়ার জন্য চীনকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, যারা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনকারী এই প্রণালিতে জাহাজ পাঠাবে।
‘যারা এই প্রণালির সুবিধাভোগী, তাদের পক্ষে এটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত সঙ্গত যে, সেখানে যেন খারাপ কিছু না ঘটে— এমন প্রত্যাশা করেছিলেন ট্রাম্প।
চীন সফর বিষয়ে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, তার বেইজিং সফরটি অনেক ‘দেরি’ হয়ে যাবে। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ মোকাবিলার চেষ্টায় ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান তাগিদ ফুটে উঠেছে।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিলের মধ্যে ট্রাম্পের চীন সফরের কথা বলা হলেও বেইজিং এখনো তাদের চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী এই তারিখ নিশ্চিত করেনি।
কী বলছে চীন
হরমুজ প্রণালি খোলা নিয়ে সাহায্য করার বিষয়ে চীন এখনো কোনো দাপ্তরিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেনি।
তবে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম ‘গ্লোবাল টাইমস’ এই ধারণাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেছে, এটি মূলত ‘ওয়াশিংটনের শুরু করা এবং শেষ করতে না পারা একটি যুদ্ধের ঝুঁকি’ ভাগ করে নেওয়ার জন্য ট্রাম্পের অপচেষ্টা।
ওই সম্পাদকীয়তে বেইজিং কেন এই প্রস্তাবে রাজি হবে না, তার ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, ‘অস্থিতিশীল একটি নৌপথে অনেক দেশের যুদ্ধজাহাজ ভিড় করালে নিরাপত্তা তৈরি হয় না, বরং এটি উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু তৈরি করে।’
যদি কোনো একটি জাহাজেও আঘাত লাগে, তাহলে তার পরিণতি দ্রুতই সবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। নিবন্ধে বিষয়টিকে স্রেফ ‘কৌশলগত ঝুঁকি হস্তান্তর’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ট্রাম্প-শি বৈঠক কি শেষ পর্যন্ত হবে?
শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তুতির জন্য দুই দেশের বাণিজ্যপ্রধানেরা প্যারিসে সমবেত হয়েছেন এবং সোমবার তাদের আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, তারা যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো মিত্রদের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি সচল করার বিষয়ে যোগাযোগ করছে। যদিও এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ দেশই একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর বিষয়ে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করছে।
সোমবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরের বিষয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।’
তবে ন্যাটো মিত্র ও চীনের ওপর হরমুজ প্রণালি নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চাপের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
ওদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, হরমুজ খোলা নিয়ে চীনের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে না। ট্রাম্পের চীন সফর পেছানো হলে তা লজিস্টিকসের কারণে হতে পারে।
চীনা কর্মকর্তারা এ পর্যন্ত ইরানে ট্রাম্পের যুদ্ধের নিন্দা জানিয়েছেন। তেহরান বেইজিংয়ের একটি কূটনৈতিক বন্ধু রাষ্ট্র এবং চীন ওই অঞ্চলে জাহাজ পাঠানোয় আগ্রহী নয়।
কারণ, চীনগামী কিছু কার্গো জাহাজ এখনো প্রণালিটি দিয়ে পার হতে পারছে বলে মনে করা হচ্ছে। চীন এই প্রণালি দিয়ে আসা তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলেও যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের বিশাল তেলের মজুত রয়েছে।
আলোচনার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে চুক্তি বাতিল বা স্থগিতের হুমকি দিয়ে নিজের পাল্লা ভারী করা ট্রাম্পের পুরোনো কৌশল।
এর আগে অক্টোবরে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আগেও তিনি একই হুমকি দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং শুল্ক নিয়ে বড় ধরনের চুক্তিতে পৌঁছেছিল দুই দেশ।
বিশ্লেষকদের মতে, শীর্ষ বৈঠক পিছিয়ে গেলে তা বেইজিংয়ের জন্য সুবিধাজনকও হতে পারে। কারণ, চীন আগে থেকেই প্রস্তুতির জন্য এপ্রিলের শেষ দিকে ট্রাম্পের সফরের প্রস্তাব দিয়েছিল।
সফর পিছিয়ে গেলে তারা নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বিষয়সহ বিশেষ করে তাইওয়ান নিয়ে আলোচনার জন্য বাড়তি সময় পাবে, যা এখন পর্যন্ত পরিকল্পিত আলোচ্যসূচিতে গুরুত্ব পায়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

