জুলাই বিপ্লবে গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী কাঠামো এখনো বজায় রয়েছে। এর কারণ ফ্যাসিবাদী কাঠামোকে চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে না পারা। তারা মনে করেন, গণঅভ্যুত্থান সফল না হলে দেশের কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল ও শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র বন্ধ করে দিত আওয়ামী লীগ। সেই সঙ্গে জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ হলে বাংলাদেশে ‘শেখরাজ্য’ প্রতিষ্ঠিত হতো বলেও মন্তব্য করেন তারা।
সোমাবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: গণমাধ্যম কর্মীদের দায়িত্ব, ত্যাগ ও দুঃসাহসিক স্মৃতি’ আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আমার বাংলাদেশ (এবি) এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহাদাতুল্লাহ টুটুলের সঞ্চালনায় এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক ও বাংলাদেশে ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহ, ডিআরইউর সভাপতি আবু সালেহ আকন, ডিজিটাল অনুসন্ধানী মিডিয়া দ্য ডিসেন্ট-এর সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশির, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজীব আহাম্মদ, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া, এবিএম খালিদ হাসান ও ব্যারিস্টার নাসরীন সুলতানা মিলি প্রমুখ।
এর আগে হাফেজ মেহেদী হাসানের পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সভা শুরু হয়। শুরুতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ছয়জন সাংবাদিককে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় এবং তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্যে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল না হলে দেশের বেশ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল ও শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হতো। বহু সাংবাদিক গুম, কারাবন্দি ও নির্যাতনের শিকার হতেন। শুধু তাই নয়, আনুষ্ঠানিকভাবে হাসিনা পরিবারের ‘শেখতন্ত্র’ বা ‘শেখরাজ্য’ প্রতিষ্ঠা করা হতো। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করা হলেও তার সুপারিশ কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, সে বিষয়ে জাতি এখনো কোনো স্পষ্ট জবাব পায়নি।
জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য তুলে ধরা সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মঞ্জু বলেন, সংসদে শুধু জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনা করলেই চলবে না; নির্বাচন কমিশনে চুক্তিভিত্তিক অতিরিক্ত সচিব নিয়োগ, রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনগুলোতে দলীয় নিয়োগ এবং সরকারি দল হিসেবে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা থেকে সরে আসার বিষয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফরিদা আখতার বলেন, ‘আপনারা যদি মনে করেন ৫ আগস্টের পর দেশ একরকম ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়েছেÑ তাহলে আমি বলব, আসলে ফ্যাসিস্ট মুক্ত হয়নি। কারণ আমরা রাষ্ট্র গঠন করিনি; ফ্যাসিস্ট কাঠামোকে চিহ্নিত করে সেটাকে আমরা উদ্ঘাটন করিনি এবং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিইনি। যে কারণে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা কিন্তু এখনো বজায় আছে। তিনি বলেন, বিএনপি ফ্যাসিবাদী কাঠামোর ভেতর থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। কাজেই আমরা কী আশা করতে পারি। এই আন্দোলনকে আপনাদের চালিয়ে যেতে হবে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান অন্যতম। আবু সাঈদের ছবি এবং আন্দোলনের বিভিন্ন আলোকচিত্র ও ভিডিও ধারণ করে সাংবাদিকরাই আন্দোলনকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকতা ও করপোরেট মিডিয়াকে এক করে দেখা উচিত নয়। করপোরেট মিডিয়ার একটি বড় অংশ ফ্যাসিবাদী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সংবাদ সেন্সর করেছে। ফরিদা আখতার আরও বলেন, মোবাইল জার্নালিস্টদের ধারণ করা ভিডিও, ছবি ও অন্যান্য আলামত ভবিষ্যতের বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
দৈনিক আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ বলেন, জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘কিল’ করেছে আর তথাকথিত সিনিয়র সাংবাদিকরা অফিসে বসে ফ্যাসিবাদের বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ ‘কিল’ (নষ্ট) করেছে। তবে যেসব সাংবাদিক দূরন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তাদের অবদান অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে এবং তাদের যথাযথ সম্মান জানাতে হবে।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের সাংবাদিকতায় যেমন একটি অন্ধকার ও গ্লানিময় অধ্যায় রয়েছে, তেমনি রয়েছে একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। বিশেষ করে তরুণ সাংবাদিকরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছেন এবং জুলাই আন্দোলনকে সাফল্যের বন্দরে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মোবাইল জার্নালিস্ট, ফটোসাংবাদিক ও মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীরাই সবচেয়ে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন উল্লেখ করে এম আবদুল্লাহ বলেন, আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভিডিওচিত্র ও তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। এ সময় শহীদ সাংবাদিকদের হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানান তিনি।
সরকারের দায়িত্বশীলদের উদ্দেশে আমার দেশের দেশের যুগ্ম সম্পাদক বলেন, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগের নেতাদের মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত অনেক সংবাদপত্র এখনো আগের মতো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। যারা গত ১৭ বছর রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করেছে, তাদেরই আবার পৃষ্ঠপোষকতা করা অত্যন্ত হতাশাজনক।
রিপোটার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সাংবাদিক নির্যাতন ছিল নিয়মিত ঘটনা, যার অন্যতম উদাহরণ সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড। তিনি জুলাই গণহত্যায় নিহত ও নির্যাতিত সাংবাদিকদের ঘটনাগুলোর বিচার পৃথক ট্রাইব্যুনালে করার দাবি জানান।
দ্য ডিসেন্ট-এর সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশির বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাংবাদিকদের আত্মত্যাগের বিষয়টি যথাযথভাবে আলোচিত হয়নি। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের আগে অন্য কোনো গণআন্দোলনে সাংবাদিকদের শহীদ হওয়ার এমন নজির ছিল না এবং এলিট শ্রেণির সাংবাদিকরা তুলনামূলক কম ঝুঁকি নিয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করেন।
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজীব আহাম্মদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কিত অধিকাংশ ভিডিও, ছবি ও নথি মোবাইল জার্নালিস্টদের অবদানে সংরক্ষিত হয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে এখনো গণমাধ্যমের অনীহা রয়ে গেছে এবং ২০২৪ সালের শিক্ষা সাংবাদিক সমাজ পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, মোবাইল জার্নালিজমের স্বীকৃতির দাবি প্রথম তাদের দলই জোরালোভাবে উত্থাপন করেছে। তিনি সব সাংবাদিকের অধিকার, ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন এবং চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে মূলধারার সাংবাদিকদের আত্মসমালোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জাতীয় সংকটে তারা জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে পেরেছেন কি না, সেই প্রশ্ন নিজেদেরই করা উচিত।
আলোচনা সভায় জুলাইয়ের মাঠের গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন আওয়াজ নিউজের সম্পাদক সাইফ আল তুহিন, ঢাকা ডিজিটের আইয়ুব আলী, আরটিভির সংবাদকর্মী জনি মজুমদার, আবুল হোসেন হৃদয়, শীর্ষ নিউজের আল-হেলাল মিয়া, সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল রাজু, সংবাদকর্মী এম আর আমিন, শাহারুল ইসলাম রকি প্রমুখ।
সমাপনী বক্তব্যে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. ওহাব মিনার মোবাইল জার্নালিস্টদের জুলাইয়ের সেই দুঃসাহসিক দিনগুলোর অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, এবিএম খালিদ হাসান, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক সফিউল বাশার, গণশিক্ষা ও পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার ফারুক, যুব পার্টির সদস্যসচিব হাদীউজ্জামান খোকন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব বারকাজ নাসির আহমদ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ ও সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


