আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

গুলি না করেই যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ বিমান রুখবে চীন

আমার দেশ অনলাইন

গুলি না করেই যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ বিমান রুখবে চীন
ছবি: আমার দেশ

যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শত শত কোটি ডলার ঢালছে আর বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলোতে তেলের দাম এবং ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথের ওপরে নজর, ঠিক তখনই চীন এমন এক কৌশল নিচ্ছে; যা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত নয় ওয়াশিংটন।

চীন একটি নথি প্রকাশ করেছে, যা আগামী কয়েক দশকে বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। গত ৫ মার্চ চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে প্রকাশ করা হয়েছে ১৪১ পৃষ্ঠার ‘১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা’।

বিজ্ঞাপন

এতে পরবর্তী প্রজন্মের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি নির্ধারণকারী প্রযুক্তি, কাঁচামাল এবং শিল্পখাতগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তারের এক উচ্চাভিলাষী রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।

বিনিয়োগ বিষয়ক বিশ্লেষক ও লেখক শানাকা আনসেলম পেরেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, ‘কেউ এদিকে নজর দিচ্ছে না। আর এটাই হলো আসল বিষয়।’

চীনের এই ছক কোনো মামুলি অর্থনৈতিক নীতিমালা নয়, বরং একে একটি জাতীয় প্রযুক্তিগত গতিশীলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নথিজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কথাই বারবার উল্লেখ করা হয়েছে।

বেইজিং সংকেত দিচ্ছে যে, আগামী এক দশকে তারা তাদের অর্থনীতির সিংহভাগ জুড়ে এআইকে গেঁথে দিতে চায়।

হিউম্যানয়েড রোবটিক্সকে একটি ‘স্তম্ভ শিল্প’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে এর উৎপাদন দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তাছাড়া মহাকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে কোয়ান্টাম যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করা, পারমাণবিক ফিউশন গবেষণায় গতি আনা এবং ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে চীন।

চীনের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও চোখে পড়ার মতো। এই পরিকল্পনা মেয়াদে শুধু এআই সংশ্লিষ্ট শিল্পের মূল্য ১০ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার।

এর বিশালতা দেখে মনে হচ্ছে, এটি যুদ্ধের ময়দানে স্বল্পমেয়াদি সুবিধার বদলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার জন্য জাতীয়ভাবে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা।

লেখক শানাকা আনসেলম পেরেরা যুক্তি দেন যে, এই কৌশলের ব্যাপকতাই একে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। তিনি লিখেছেন, ‘এটি কোনো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়। এটি এমন এক যুদ্ধ পরিকল্পনা যা যুক্তরাষ্ট্র লড়ছে না।’

চীনের প্রযুক্তিগত উত্থান মোকাবেলায় ওয়াশিংটনের প্রধান অস্ত্র হলো ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত ‘চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট’। এই আইনের আওতায় অভ্যন্তরীণ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন শক্তিশালী করতে ৫২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে।

এটি যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ বেসরকারি বিনিয়োগ এবং উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। তবে এটি শুধু চিপস এর বিষয় নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা মূলত একটি খাতের ওপর সীমাবদ্ধ: আর তা হলো চিপস।

চীনের কৌশল অনেক বেশি বিস্তৃত। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভারি শিল্প থেকে শুরু করে সেবা খাত পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে দিতে চায়। শিল্প উৎপাদনকে মজবুত করতে রোবটিক্সকে কাজে লাগানো হবে।

এই পরিকল্পনায় কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মহাকাশ অবকাঠামো এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও প্রসেসিং সক্ষমতা, বিশেষ করে বিরল খনিজের ওপর বিনিয়োগে জোর দেওয়া হচ্ছে।

পেরেরা দুই দেশের এই বৈপরীত্যকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘চিপস অ্যাক্ট হলো একটি রাইফেল। আর পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হলো একটি অস্ত্রাগার।’

বিরল খনিজগুলো সেই অস্ত্রাগারের কেন্দ্রে অবস্থিত। বর্তমানে বিশ্বের সিংহভাগ বিরল উপাদান চীন প্রক্রিয়াজাত করে। এগুলো বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমানের গাইডেন্স সিস্টেম এবং অত্যাধুনিক রাডারের জন্য অপরিহার্য।

প্রতিটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন, সেন্সর এবং অস্ত্র ব্যবস্থায় কয়েকশ পাউন্ড বিরল ধাতুর প্রয়োজন হয়। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নিখুঁত নিশানার গোলাবারুদও এগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন এই খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত করেছে। তারা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করেছে এবং লাইসেন্স ও কমপ্লায়েন্সের নতুন নিয়ম চালু করেছে, যা তাদের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ দিয়েছে।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা ক্রয় নীতিমালা বিপরীত দিকে হাঁটছে—২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের চুক্তিতে চীনের বিরল উপাদানের ব্যবহার বন্ধ করার কথা রয়েছে, যা মার্কিন সরবরাহকারীদের বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি বড় ধরনের ঝুঁকির পথ তৈরি করছে, যা পূরণ হতে এক দশক সময় লাগতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরান যুদ্ধের মতো সংঘাতে বিরল খনিজ সমৃদ্ধ গোলাবারুদ খরচ করে ফেলছে, তখন তারা সেই খনিজগুলোর নতুন খনি বা কারখানা তৈরির চেষ্টা করছে যা এখনও বড় আকারে গড়ে ওঠেনি।

পেরেরা লিখেছেন, ‘ইরান যুদ্ধ ইন্টারসেপ্টরগুলো (ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ব্যবস্থা) গ্রাস করছে। আর চীন সেই ইন্টারসেপ্টরগুলো তৈরির সরবরাহ ব্যবস্থা আরো সংকুচিত করছে।’ চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হলো সেই নথি, যা এই সংকোচনকে জাতীয় কৌশলে রূপ দিয়েছে।

শি জিনপিংয়ের ১৪১ পৃষ্ঠার এই রোডম্যাপের লক্ষ্য হলো, আগামী ১৫ বছর অনেক প্রয়োজনীয় কাঁচামালের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে রাখা।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন যদি কাঁচামাল, রোবটিক্স এবং এআইকে একক রাষ্ট্র-পরিচালিত ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে সফল হয়, তবে পরবর্তী বিশ্ব পরাশক্তির লড়াই পারস্য উপসাগরের আকাশে নির্ধারিত হবে না, বরং নির্ধারিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান আকাশে ওড়ার অনেক আগে সরবরাহ ব্যবস্থা আর কারখানার ভেতরেই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...