চীনে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে একটি নতুন মোবাইল অ্যাপ, যার নাম শুনেই অনেকেই চমকে উঠছেন—“তুমি কি মারা গেছো?”। নামটি যেমন অস্বস্তিকর, ধারণাটিও তেমনই ব্যতিক্রমী। একা বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে তৈরি এই অ্যাপটি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে চীনের শহরাঞ্চলে তরুণদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। খবরবিবিসির।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাপটির কার্যপ্রণালী অত্যন্ত সহজ বলে জানা গেছে। ব্যবহারকারীকে প্রতি দুই দিন অন্তর অ্যাপটি খুলে একটি বড় বোতামে চাপ দিয়ে জানাতে হয় যে তিনি নিরাপদ ও জীবিত আছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা না করলে অ্যাপটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহারকারীর মনোনীত জরুরি যোগাযোগের সঙ্গে যোগাযোগ করে সতর্কবার্তা পাঠায়, যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দ্রুত পৌঁছানো যায়।
গত বছরের মে মাসে খুব একটা প্রচার ছাড়াই অ্যাপটি চালু হলেও সম্প্রতি এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর ফলেই এটি এখন চীনের সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া অর্থপ্রদানকারী অ্যাপগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বাভাস বলছে—২০৩০ সালের মধ্যে চীনে একক সদস্যের পরিবারের সংখ্যা ২০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতেই অ্যাপটি মূলত একা বসবাসকারী তরুণ, শিক্ষার্থী, অফিসকর্মী এবং একাকী জীবনযাপনকারী মানুষদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে।
চীনা সামাজিক মাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, একা থাকা মানুষদের মধ্যে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া বা নিঃশব্দে মারা যাওয়ার আশঙ্কা বাস্তব। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “যারা একা থাকেন—বিশেষ করে অন্তর্মুখী, বিষণ্ণতায় ভোগা বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা মানুষদের—এই ধরনের একটি অ্যাপ সত্যিই দরকার।”
৩৮ বছর বয়সী উইলসন হাউ জানান, তিনিও এই আশঙ্কা থেকেই অ্যাপটি ডাউনলোড করেছেন। বেইজিংয়ে কাজ করা উইলসন পরিবার থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে থাকেন এবং কাজের প্রয়োজনে বেশিরভাগ সময় একা থাকেন। “যদি আমার কিছু হয়ে যায় এবং কেউ জানতেই না পারে—এই ভয় থেকেই আমি অ্যাপটি ব্যবহার করছি,” বলেন তিনি। তিনি তার মাকে জরুরি যোগাযোগ হিসেবে যুক্ত করেছেন।
তবে অ্যাপটির নাম নিয়ে বিতর্কও কম নয়। অনেকেই মনে করছেন, এমন নাম দুর্ভাগ্য ডেকে আনতে পারে। কেউ কেউ নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়ে বলেছেন, “তুমি ঠিক আছো?” বা “কেমন আছো?”—এই ধরনের ইতিবাচক নাম আরও উপযুক্ত হতো।
অ্যাপটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মুনস্কেপ টেকনোলজিস জানিয়েছে, তারা সমালোচনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং ভবিষ্যতে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি ভাবছে। আন্তর্জাতিকভাবে ডেমুমু নামে তালিকাভুক্ত এই অ্যাপটি যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ে শীর্ষ দুই এবং অস্ট্রেলিয়া ও স্পেনে শীর্ষ চারটি অ্যাপের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে—যার পেছনে বিদেশে বসবাসকারী চীনা নাগরিকদের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রথমে বিনামূল্যে চালু হলেও বর্তমানে অ্যাপটির মূল্য ৮ ইউয়ানেরও কম। অ্যাপটির প্রতিষ্ঠাতাদের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য না থাকলেও জানা গেছে, তারা ১৯৯৫ সালের পরে জন্ম নেওয়া তিনজন তরুণ, যারা হেনানের ঝেংঝো শহর থেকে একটি ছোট দল নিয়ে এটি তৈরি করেন।
তারা জানিয়েছেন, মাত্র এক হাজার ইউয়ান খরচ করে তৈরি এই অ্যাপের জন্য তারা এখন কোম্পানির ১০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে এক কোটি ইউয়ান বিনিয়োগ তোলার পরিকল্পনা করছেন। পাশাপাশি, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে আলাদা একটি পণ্যের ধারণাও বিবেচনা করা হচ্ছে—যে দেশে জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের বেশি মানুষের বয়স ৬০ বছরের ওপরে।
সম্প্রতি এক পোস্টে কোম্পানিটি লিখেছে, “আমরা চাই আরও মানুষ ঘরে একা থাকা বয়স্কদের প্রতি মনোযোগ দিক। তাদের স্বপ্ন আছে, তারা সম্মান ও সুরক্ষার যোগ্য।”
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

