কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে বাড়তে থাকা জ্বালানি ও পানির চাহিদা মোকাবিলায় নতুন এক মাইলফলক স্থাপন করেছে চীন। দেশটির সাংহাই উপকূলে বিশ্বের প্রথম বায়ুশক্তিচালিত পানির নিচের ডেটাসেন্টার (আন্ডারওয়াটার ডেটাসেন্টার) আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে।
‘সাংহাই লিংগাং আন্ডারসি ডেটাসেন্টার ডেমনস্ট্রেশন প্রজেক্ট’ নামে পরিচিত এ প্রকল্পটি মে মাসে চালু হয়। ২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই ডেটাসেন্টার নির্মাণে যৌথভাবে কাজ করেছে হাইক্লাউড টেকনোলজি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন।
সাংহাই উপকূল থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ডেটাসেন্টারটি সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ১০ মিটার নিচে স্থাপন করা হয়েছে। এর বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে কাছাকাছি একটি অফশোর উইন্ড ফার্ম থেকে। চীনা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, স্থলভিত্তিক ডেটাসেন্টারের তুলনায় এটি ২০ শতাংশেরও বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেটাসেন্টারটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পরিচালিত হওয়ার পাশাপাশি সমুদ্রের পানির স্বাভাবিক শীতলীকরণ সুবিধা ব্যবহার করায় এর শক্তি চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সাধারণ ডেটাসেন্টারে সার্ভার ঠান্ডা রাখতে মোট বিদ্যুতের ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কেবল কুলিং ব্যবস্থায় ব্যয় হয়।
এআই প্রযুক্তির অবকাঠামো হিসেবে পরিচিত ডেটাসেন্টারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিপুল পানি ব্যবহারের কারণে সমালোচনার মুখে রয়েছে। পানির নিচে ডেটাসেন্টার স্থাপনের ফলে মিঠা পানির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেলথ সতর্ক করে জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ডেটাসেন্টারগুলোর পানি ব্যবহার ৯ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন লিটারে পৌঁছাতে পারে, যা সাব-সাহারান আফ্রিকার ১৩০ কোটি মানুষের এক বছরের গৃহস্থালি পানির চাহিদা পূরণের সমান।
এর আগে ২০২৩ সালে চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় হাইনান দ্বীপে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক পানির নিচের ডেটাসেন্টার চালু করেছিল হাইক্লাউড। তবে সাংহাইয়ের নতুন প্রকল্পটি প্রথম, যা সম্পূর্ণভাবে অফশোর বায়ুশক্তির ওপর নির্ভরশীল।
যদিও পানির নিচের ডেটাসেন্টার প্রযুক্তি নিয়ে প্রথম পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফট। ২০১৮ সালে স্কটল্যান্ডের অর্কনি দ্বীপপুঞ্জের কাছে পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। দুই বছর পর ইতিবাচক ফলাফলের কথা জানালেও পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটির অগ্রগতি থমকে যায়।
হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. হানজিয়াং ডং বলেন, “মাইক্রোসফট ধারণাটির কার্যকারিতা প্রমাণে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। তবে বাজারের চাহিদা, শিল্প সক্ষমতা, সামুদ্রিক প্রকৌশল ও নীতিগত সহায়তার সমন্বয়ে চীন দ্রুত বাণিজ্যিক পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।”
চীন ইতোমধ্যে এআইকে তাদের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করেছে। গত বছর প্রকাশিত জাতীয় এআই কর্মপরিকল্পনায় ডেটাসেন্টার নির্মাণ ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে এআই অবকাঠামোর জন্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দেশটি।
চীনা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সাংহাই লিংগাং ডেটাসেন্টার প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউয়ান।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানির নিচের ডেটাসেন্টার সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য কিছু ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তলদেশের পলিমাটি নড়াচড়া বা সমুদ্রের পানির স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হবে। যদিও সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীরা মনে করছেন, যথাযথ নজরদারি থাকলে এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর কষাকষিতে তেহরানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে
লাল টেলিফোনের তার চুরির পর এবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ল্যাপটপ চুরি