কোভিড মহামারির পর থেকে ভারত নিজেকে বিশ্বের পরবর্তী উৎপাদন হাব এবং চীনের একটি বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। অ্যাপলের সরবরাহকারীরা দেশটিতে কার্যক্রম বাড়িয়েছে, সেমিকন্ডাক্টর প্ল্যান্টের ঘোষণা এসেছে এবং নতুন শিল্প পার্কের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই প্রচেষ্টার ফলও মিলেছে, ২০১৫ সালে ভারতের ইলেকট্রনিকস রপ্তানি যেখানে ছিল ৮৬০ কোটি ডলার, তা ২০২৫ সালে রেকর্ড ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে।
দেশটির ইলেকট্রনিকস ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (এমইআইটিওয়াই) আশা করছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই রপ্তানি ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাবে।
তবে ভারত যখন উৎপাদন খাতে জোর দিচ্ছে, ঠিক তখনই চীন সেই সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত করেছে, যা ভারতের কারখানাগুলোকে সচল রাখে।
চীনের স্টেট কাউন্সিলের নতুন ‘ডিক্রি ৮৩৪’ এবং ‘ডিক্রি ৮৩৫’-যা রপ্তানি সীমিত করার নীতি নির্ধারণ করেছে, তা ভারতের ইলেকট্রনিকস ও অটোমোবাইল খাতে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
শিল্প খাতের নির্বাহীরা সতর্ক করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ রপ্তানিতে চীনের এই কড়াকড়ি ভারতের সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকে ব্যাহত করতে পারে, বিনিয়োগে বিলম্ব ঘটাতে পারে এবং চীনা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ভারতের অব্যাহত নির্ভরশীলতাকে প্রকাশ করে দিতে পারে।
উদ্বেগটি স্পষ্ট, চীন যদি কারখানা তৈরির মূল যন্ত্রপাতিই নিয়ন্ত্রণ করে, তবে ভারত কীভাবে উৎপাদন খাতে বড় বড় লক্ষ্য অর্জন করবে?
শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহীরা জানিয়েছেন, নতুন এই নিয়মগুলোর কারণে ক্যাপিটাল ইকুইপমেন্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের চালানের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা বুঝতে ইতোমধ্যেই চীনা সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশীয় শিল্প খাত এই সম্ভাব্য সংকটের কথা ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কেও জানিয়েছে।
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি এমন এক সময়ে এলো যখন সময়টা মোটেও অনুকূল নয়। একদিকে ভারত যখন আমদানি কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে জোরালো চেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং এল নিনোর প্রভাবে দেশের কৃষি আয় হুমকির মুখে পড়েছে; ঠিক তখনই চীন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, রেয়ার-আর্থ এলিমেন্ট এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির রপ্তানি সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিল।
ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া
গত শনিবার কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ‘নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক অঞ্চলের’ ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সরকার খাত-ভিত্তিক বিনিয়োগ উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করছে।
এছাড়া কেন্দ্র সরকার শিল্প অবকাঠামো তৈরিতে বড় ধরনের জোর দিচ্ছে। ৩৩ হাজার ৬৬০ কোটি রুপির ‘ভারত শিল্প বিকাশ যোজনা’র অধীনে আগামী তিন বছরে ৫০টি শিল্প পার্ক চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার।
তবে চীনের সর্বশেষ পদক্ষেপটি ভারতের একটি গভীর দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) আধুনিক উৎপাদন খাত এখনো বহুলাংশে চীনা যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। শুধু অটোমোবাইল খাতেই ২০২৫ অর্থবছরে ভারতের আমদানি করা যন্ত্রাংশের প্রায় ২৬ শতাংশ এসেছে চীন থেকে, যার বেশিরভাগই উচ্চ-মূল্যের ইলেকট্রনিকস।
বিভিন্ন খাতে বাড়ছে চাপ
কার্স আনলিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা সিঙ্গাপুরওয়ালা বলেন, ‘ভারতের অটোমোটিভ খাতের গল্পটি এখন শুধু শোরুমে নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার ভেতরে লেখা হচ্ছে।’
তিনি জানান, আজকের গাড়িগুলোতে ৩ হাজার পর্যন্ত চিপ থাকতে পারে। সরবরাহ সংকুচিত হলে শুধু দামই বাড়বে না, বরং গাড়ি বাজারে ছাড়তে দেরি হবে, ক্রেতাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে এবং অনেক ফিচার বাদ দিতে হবে।
সিঙ্গাপুরওয়ালা আরো সতর্ক করেন, বেইজিংয়ের নতুন নিয়মগুলো এখন আর শুধু বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
চীনের নতুন সরবরাহ চেইনের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি যদি উৎপাদন চীন থেকে অন্য দেশে সরিয়ে নেয়, তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সেই কোম্পানি এবং এমনকি তাদের নির্বাহীদের ব্যক্তিগতভাবে শাস্তি দিতে পারবে। এটি কোনো আলোচনার কৌশল নয়, এটি একটি কাঠামোগত হুমকি।’
এই চাপ ইতোমধ্যেই বিভিন্ন খাতে অনুভূত হচ্ছে। এনএক্সটিসিইএল মোবিলিটির সিইও অতুল বিবেক বলেন, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো একটি অনুস্মারক যে ভারতের আরো শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক এবং স্থিতিস্থাপক সরবরাহ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, ইলেকট্রনিকস খাত বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, তাই টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য একটি সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল প্রয়োজন। যদি নীতিগত সহায়তা, লজিস্টিকস এবং গবেষণা সক্ষমতা একসঙ্গে উন্নত হয়, তবে ভারতের সামনে স্থানীয় উৎপাদন আরো গভীর করার সুযোগ রয়েছে।
অন্যরা এটিকে ভারতের উৎপাদন আকাঙ্ক্ষার জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট বা বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। এলইডিএক্স টেকনোলজি এবং এক্সট্রিম মিডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সংকেত রাম্ভিয়া বলেন, ‘উৎপাদনের জন্য একক কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আর টেকসই নয়।’
তিনি মনে করেন, ভারত আর শুধু সংযোজন-ভিত্তিক (অ্যাসেম্বলি) প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না, বরং দেশেই যন্ত্রাংশের ইকোসিস্টেম ও দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
তিনি জানান, ভারতের অভ্যন্তরীণ অ্যাক্টিভ এলইডি ডিসপ্লের বাজার ইতোমধ্যেই প্রায় ২ হাজার কোটি রুপির এবং এটি বার্ষিক ১৫-২০ শতাংশ হারে বাড়ছে।
অন্যদিকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো (ওইএম ও ওডিএম) সক্রিয়ভাবে চীনের বাইরে বিকল্প খুঁজছে। এটি ভারতের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক উৎপাদন অংশীদার হিসেবে গড়ে ওঠার বড় সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে তার কোম্পানি ইতোমধ্যেই গুজরাটে ১০ হাজার বর্গমিটারের একটি প্ল্যান্ট স্থাপন করে অ্যাক্টিভ এলইডি ডিসপ্লের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, এই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করতে সময় লাগবে।
সূত্র: এনডিটিভি
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


