মমতার বিশ্বস্ত সহকর্মী থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী হলেন শুভেন্দু অধিকারী

বিবিসি বাংলা

মমতার বিশ্বস্ত সহকর্মী থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী হলেন শুভেন্দু অধিকারী

শনিবার বেলায় কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেবেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই অনুষ্ঠানে হাজির থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার বিকেলে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম ঘোষণা করার পরে, সন্ধ্যায় তিনি কলকাতায় রাজ্যপাল আরএন রভির হাতে সরকার গড়তে চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠিটি তুলে দিয়েছেন মি. অধিকারী। সঙ্গে ছিলেন দলের রাজ্যের শীর্ষ নেতারা।

মি. অধিকারী বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন, কিন্তু ঘটনাচক্রে কলকাতার ভবানীপুর আসন থেকে জয়ী দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী তিনি।

সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ওই আসন থেকে তিনবার ভোটে লড়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।

মমতা ব্যানার্জীর একসময়ের সতীর্থ বা রাজনৈতিক সহকর্মী থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তার কাছেই পর পর দুটো বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন মিজ. ব্যানার্জী - প্রথমবার ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে, আবার এ বছর তার ঘরের মাঠ বলে পরিচিত ভবানীপুর আসনে।

তাই শুভেন্দু অধিকারীকে 'জায়ান্ট কিলার'ও বলা হচ্ছে ভারতের অনেক গণমাধ্যমে, যিনি মুখ্যমন্ত্রীকে দুবার পরাজিত করেছেন।

সোমবারের ভোট গণনায় বিজেপি রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে, যার ফলে ব্যানার্জীর সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং এই হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটি রাজ্যে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে।

শুক্রবার বিজেপি জানিয়েছে যে অধিকারীই রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হবেন এবং শনিবার তিনি শপথ গ্রহণ করবেন।

সম্ভবত মি. অধিকারীর এই রাজনৈতিক সাফল্যের জন্যই তার নাম ছাড়া অন্য কারো নাম শুক্রবার নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক দলের বৈঠকে আলোচিতই হয় নি।

ওই বৈঠকে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসাবে হাজির ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ।

মি. শাহ জানিয়েছেন, সর্বসম্মতিক্রমে শুভেন্দু অধিকারীকেই বেছে নিয়েছেন উপস্থিত সকলে।

গঙ্গা নদীর গতিপথ জুড়েই এখন গেরুয়া শাসন

বিজেপির রাজনৈতিক পূর্বসূরি জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর জন্ম ও কর্মস্থল যে রাজ্যে, সেই পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করার স্বপ্ন ভারতীয় জনতা পার্টির দীর্ঘদিনের।

বিজেপি ২০২১ সালেই পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়ার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছিল। তবে সেবছরের নির্বাচনে তারা মাত্র ৭৭টি আসনে জয়ী হতে পেরেছিল। পরে আবার তাদের দলের কয়েকজন বিধায়ক তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করেছিলেন।

তার কিছুদিন আগেই বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সে বছরের নির্বাচনেও তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি আক্রমণাত্মক অবস্থানের কারণে দলের কর্মীদের কাছে 'হিরো' হয়ে উঠেছিলেন।

পরবর্তী পাঁচ বছরে তার সেই আক্রমণের ধার যেমন জোরালো হয়েছে, তেমনই হিন্দু ভোট মেরুকরণের জন্য তার কথায় বারে বারে উঠে এসেছে বাংলাদেশ থেকে আসা 'মুসলমান অনুপ্রবেশকারী' ও রোহিঙ্গাদের কথা।

এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে 'পরিবর্তনের' ডাক দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাদের প্রচারের মূল স্লোগানেও ছিল 'পাল্টানো দরকার' ইত্যাদি শব্দ, যা দিয়ে আসলে সরকার বদলেরই ডাক দিয়েছিল দলটি।

'পরিবর্তন' শব্দটার সঙ্গে অবশ্য শুভেন্দু অধিকারীর যোগ আজকের নয়। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের ইতি টেনে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকার, সেই পরিবর্তনেও শুভেন্দু অধিকারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

বামফ্রন্ট সরকারের পতনের সিঁড়ি তৈরি হয়েছিল যে দুটি ঘটনার মাধ্যমে, তারই অন্যতম ছিল নন্দীগ্রামে রাসায়নিক শিল্প তালুক গড়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক কৃষক বিক্ষোভ। ওই কৃষক বিক্ষোভ গড়ে তোলার পিছনে মি. অধিকারীর তৃণমূল স্তরে সাংগঠনিক কৃতিত্ব ছিল বলে অনেকে মনে করেন।

তখন অবশ্য মি. অধিকারী এখনকার মতো নন্দীগ্রামের বিধায়ক ছিলেন না। সেই সময়ে তিনি ছিলেন পাশের এলাকা কাঁথি দক্ষিণ আসনের বিধায়ক।

তিনি অবশ্য নন্দীগ্রাম কৃষক আন্দোলনের 'মুখ' ছিলেন না তখন, সেটা ছিলেন তার নেত্রী, সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী, যাকে হঠিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি

বঙ্গোপসাগরের তীরের জেলা পূর্ব মেদিনীপুরের মানুষ শুভেন্দু অধিকারী। তার বাড়ি, জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র দীঘার কাছে, কাঁথি শহরে।

তার পরিবার আদ্যন্ত রাজনৈতিক - কংগ্রেস ঘরানায় বড়ো হয়েছেন তিনি।

তার বাবা শিশির অধিকারী মেদিনীপুর জেলা দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার অনেক আগে থেকেই সেখানকার অতি পরিচিত কংগ্রেস নেতা ছিলেন।

তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে ওঠার আগে যে দুজনকে মেদিনীপুরের কংগ্রেস নেতা বলে রাজনৈতিক মহল জানত, তাদেরই একজন ছিলেন শিশির অধিকারী। পোশাকেও একেবারে ছিলেন আগেকার কংগ্রেস নেতাদের মতোই - ধুতি-পাঞ্জাবী পরতেন। এখনও তাকে সেই পোশাকেই দেখা যায়।

তবে কংগ্রেস ছেড়ে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন মমতা ব্যানার্জী আলাদা দল করার পরেই।

তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন শিশির অধিকারী।

বাবার পথ ধরেই শুভেন্দু অধিকারীও একসময়ে কংগ্রেসেই ছিলেন। ছাত্র রাজনীতি দিয়ে শুরু করে পরে তার নিজের শহর কাঁথি পৌরসভার কংগ্রেসের ওয়ার্ড কাউন্সিলারও ছিলেন তিনি।

নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সংগঠক

বাবা শিশির অধিকারীর সঙ্গেই তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০০৬ সালে তিনি কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য হিসাবেও নির্বাচিত হন। কাঁথি পৌরসভার চেয়ারম্যানের পদও সামলেছেন।

ওই ২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা এলকার সংলগ্ন নন্দীগ্রামে রাসায়নিক শিল্প হাব গড়ার পরিকল্পনা করেছিল তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। জমি অধিগ্রহনের বিরুদ্ধে সেখানকার কৃষকরা আন্দোলন শুরু করেন।

তৃণমূল স্তরে সেই আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী-ই, যদিও দলনেত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জী ছিলেন আন্দোলনের কাণ্ডারী।

তখন থেকেই মি. অধিকারী হয়ে ওঠেন মমতা ব্যানার্জীর দলের সংগঠন গড়ে তোলার অন্যতম রূপকার।

কয়েক বছর পরে, ২০০৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে সেই সময়ের সিপিআইএমের হেভিওয়েট নেতা লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হন শুভেন্দু অধিকারী। তার বাবা, শিশির অধিকারীও সেবছর এমপি হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন।

পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেস দলে সাংগঠনিক গুরুত্ব বেড়েই চলেছিল শুভেন্দু অধিকারীর। তাকে রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলীয় 'জঙ্গলমহল'এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যে এলাকায় তখন মাওবাদীদের প্রবল প্রতিপত্তি।

প্রায় সাড়ে তিন দশক ক্ষমতায় থাকার পরে যে বছর বামফ্রন্ট সরকারকে হঠিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের ক্ষমতা দখল করল, সেই ২০১১-র নির্বাচনে অবশ্য প্রার্থী হন নি শুভেন্দু অধিকারী। তিনি তখনও এমপি।

বিধানসভায় শুভেন্দু অধিকারী ফিরে আসেন ২০১৬ সালে। জয় লাভ করার পর মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জীর দ্বিতীয় দফায় পরিবহন মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

ততদিনে দলীয় সংগঠনেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন মি. অধিকারী। তাকে দলের যুব সংগঠনের নেতা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জী।

কিন্তু একই সময়ে মিজ. ব্যানার্জী তার ভাইয়ের ছেলে অভিষেক ব্যানার্জীর নেতৃত্বে 'যুব' নামের একটি সংগঠন গড়ে দেন মমতা ব্যানার্জী।

একটিই দলের দুটি যুব সংগঠন গড়ে তিনি তখন বার্তা দিয়েছিলেন যে অভিষেক ব্যানার্জীকেই তিনি রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।

'যুব' নামের সেই সংগঠনের সূচনা এবং অভিষেক ব্যানার্জীকে প্রতিষ্ঠা করার জনসভাটি হয়েছিল কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানেই।

ঘটনাচক্রে, শনিবার ওই ব্রিগেড প্যারেড ময়দানেই মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী।

সেই সময় থেকেই শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে মমতা ব্যানার্জীর দূরত্ব বাড়তে শুরু করে।

অবশেষে ২০২০ সালে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। তারপর থেকে ক্রমাগত তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সরব হয়েছেন তিনি, অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধেও কথা বলতে দেখা গিয়েছে তাকে।

বিজেপিতে যোগ

গেরুয়া শিবিরে যোগ দেওয়ার পরপরই ২০২১ সালে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী হিসাবে দাঁড়ান তিনি। পরাজিতও করেন। নির্বাচনী ফল মানতে চাননি মিজ ব্যানার্জী, বিষয়টা শেষপর্যন্ত আদালত অবধি গড়ায়।

তবে ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় না এলেও বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন তিনি।

বিধানসভা এবং রাজপথ— দুই জায়গাতেই আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দেখা গিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীকে। তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ইস্যু- বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিরোধীদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

তৃণমূল কংগ্রেস, মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে যেমন অতি আক্রমণাত্মক থেকেছেন তিনি, তেমনই বারে বারে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতেও তিনি অতি-সরব হয়েছেন বারে বারেই।

হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উঠে এসেছে তার ভাষণে, বারে বারে।

দুর্নীতির অভিযোগ

নারদা নামের একটি সংবাদ পোর্টাল ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে একটি প্রতিবেদন সামনে আনে, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে দুবছর ধরে তারা একটি স্টিং অপারেশন চালিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকজন শীর্ষ নেতা-মন্ত্রীর ঘুষ নেওয়ার ঘটনা ক্যামেরা বন্দী করেছে।

ওই তালিকায় ছিলেন সেই সময়ের তৃণমূল কংগ্রেসে দু নম্বর নেতা বলে পরিচিত মুকুলা রায়, মন্ত্রী মদন মিত্র, কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। শুভেন্দু অধিকারীর ফুটেজও দেখা যায় ওই স্টিং অপারেশনে।

তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা ওই ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছিলেন। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীকে কখনই গ্রেফতার করা হয় নি।

তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করে যে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কারণেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি।

এসআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন