আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

অবশেষে বন্ধ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

ডেস্ক রিপোর্ট

অবশেষে বন্ধ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি স্থাপনকারী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবারও বন্ধ হয়ে গেল। সাম্প্রতিক সময়ে দেউলিয়া ঘোষণার পর প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ীভাবে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। লন্ডনে বিলাসপণ্য বিক্রির ব্র্যান্ড হিসেবে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে না পেরে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয় ঐতিহাসিক এ প্রতিষ্ঠানটি।

একসময় বিশ্ববাণিজ্যে প্রভাব বিস্তার করা এ কোম্পানি ভারত ও এশিয়ার নানা অঞ্চলে শোষণ, লুটপাট ও নিপীড়নের জন্য কুখ্যাত হয়ে আছে। ইতিহাসের পাতায় তাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম আজও বিতর্কের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

বিজ্ঞাপন

ইন্ডিয়া টুডে এক প্রতিবেদনে জানায়, প্রায় দেড়শ বছর আগে কোম্পানিটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে ২০১০ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামের স্বত্ব কিনে নিয়ে লন্ডনে এ কোম্পানিকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তিনি এ কোম্পানিকে বিলাসপণ্যের খুচরা ব্র্যান্ড হিসেবে নতুন করে পরিচিত করান।

জানা যায়, ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেনার চেষ্টা শুরু করেন একবিংশ শতকের শুরুর দিকে। ২০১০ সালে মেফেয়ারে একটি দোকানে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পুনরায় শুরু করেন। সেখানে উঁচুমানের চা, চকোলেট, মিষ্টান্ন, মসলা ও অন্যান্য দামি পণ্য বিক্রি করা হতো।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসাটি বন্ধ হয়ে যায়। ব্রিটিশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে কোম্পানিটি লিকুইডেটর নিয়োগ করে। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত মূল প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ছয় লাখ পাউন্ডের বেশি দেনা জমে। পাশাপাশি কর ও কর্মীদের পাওনাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বকেয়া ছিল। ফলে লন্ডনের মেফেয়ারের দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়, ওয়েবসাইটও অচল।

জানা যায়, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে যায়। ১৮৫৮ সালে ভারতবর্ষে সরাসরি ব্রিটিশ রাজের শাসন শুরু হয়।

ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক শাসনামলে এ কোম্পানি বিশ্ববাণিজ্যের ধরন বদলে দিয়েছিল। কিন্তু নিপীড়ন আর দুর্ভিক্ষের ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ভারতীয়দের জন্য নিয়ে আসে এক মহাদুর্ভোগ। সে সময় বাংলার দুর্ভিক্ষে মারা যায় প্রায় তিন কোটি মানুষ।

২০১০ সালে যখন ভারতীয় উদ্যোক্তা এ কোম্পানির স্বত্ব কিনে নেন, তখন অনেকেই একে ঔপনিবেশিক অপশাসনের প্রতিশোধ হিসেবে দেখেছিলেন। যে কোম্পানি একসময় ভারত শাসন করেছিল, সে কোম্পানি এখন একজন ভারতীয়ের মালিকানায় বিষয়টি সে সময় বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছিল।

ব্রিটেনের দ্য সানডে টাইমস জানায়, অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে লিকুইডেটর নিয়োগ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লিমিটেড। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত মূল গ্রুপের কাছে এ কোম্পানির দেনা জমেছিল ছয় লাখ পাউন্ডের বেশি। এছাড়া কর বাবদ এক লাখ ৯৩ হাজার ৭৮৯ পাউন্ড এবং কর্মীদের কাছে দায় দেড় লাখের বেশি পাউন্ড ।

২০১৭ সালে গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেহতা বলেন, ‘একজন ভারতীয় এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিকÑএটাই প্রমাণ করে যে, নেতিবাচক বিষয়টি এখন ইতিবাচক হয়ে গেছে। ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আগ্রাসনের ওপর দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু আজকের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সহমর্মিতার কথা বলে।’

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯ শতকের শুরুর দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল সাফল্যের শিখরে, তখন এ কোম্পানির প্রায় আড়াই লাখ সৈন্যের নিজস্ব বাহিনী ছিল। ভারতের বিশাল অঞ্চল তখন নিয়ন্ত্রণ করত তারা। মসলা, তুলা, রেশম, চা, নীলসহ নানা পণ্যের বাণিজ্যে বিশ্বে তারাই নেতৃত্ব দিত। তবে তাদের এ সাফল্য এসেছিল শোষণ আর বঞ্চনার মধ্য দিয়ে।

১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রানি প্রথম এলিজাবেথের জারিকৃত রাজকীয় সনদের মাধ্যমে এ কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলকে সম্মিলিতভাবে ‘ইস্ট ইন্ডিজ’ বলা হতো। মূলত মসলা, রেশম, তুলা ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্যের বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এটি একটি জয়েন্ট স্টক ট্রেডিং কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে লাভক্ষতিতে অংশ নিতে পারতেন, যা সে যুগে ব্যবসায়িক কাঠামোর ক্ষেত্রে ছিল অত্যন্ত অগ্রগামী ধারণা।

১৬১২-১৩ সালে কোম্পানি ভারতের সুরাটে প্রথম বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। পরবর্তী সময়ে কেপ অব গুড হোপের পূর্বাঞ্চলে ব্রিটিশ বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকার লাভের মাধ্যমে তাদের প্রভাব দ্রুত বিস্তৃত হয়। অষ্টাদশ শতকের শুরুতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। ভারতের বিভিন্ন স্থানে দুর্গ নির্মাণ, স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে জোট এবং ফরাসিদের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে তারা নিজেদের আধিপত্য সুসংহত করে।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ ছিল তাদের ক্ষমতা বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এরপর বাংলাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে কোম্পানি। তারা কর আদায়, বিচারব্যবস্থা পরিচালনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। ফলে কার্যত একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বদলে শাসক শক্তিতে রূপ নেয়। একপর্যায়ে বিশ্ববাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশেষত কিছু নির্দিষ্ট পণ্যে প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যায়।

তবে এ বিস্তারের পেছনে ছিল শোষণ, কৃষকদের নীলসহ অর্থকরি ফসল চাষে বাধ্য করা এবং রপ্তানিনির্ভর কঠোর নীতি, যার ফলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও জনদুর্ভোগ দেখা দেয়। অবশেষে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের হাতে ন্যস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানিটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন